চলচ্চিত্র ও নাটকে কাজী নজরুল

|

সোহেল আহসান

নানা গুণে গুণান্বিত জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তার গল্প কিংবা উপন্যাস নিয়ে একাধিকবার তৈরি হয়েছে নাটক ও চলচ্চিত্র। সেগুলোও দর্শকপ্রিয় হয়েছে। আগামী ২৫ মে বিদ্রোহী কবির জন্মবার্ষিকী।

দিনটিকে স্মরণ করে নাটক ও চলচ্চিত্রে কাজী নজরুলের উপস্থিতি নিয়ে তৈরি হয়েছে এ প্রতিবেদন।

বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগ থেকেই কাজী নজরুল ইসলাম নাটক ও চলচ্চিত্রে সক্রিয় ছিলেন। বিশেষ করে চলচ্চিত্রে নানা ভূমিকায় নজরুল একাধারে কাজ করেছেন।

কখনও গীতিকার, কখনও সঙ্গীত পরিচালক, কাহিনীকার, সুরকার আবার কখনও অভিনেতা ও নির্মাতা হয়ে কাজ করেছেন। সব মাধ্যমেই নজরুলের সৃষ্টিশীল পদচারণা বিনোদন পিয়াসিদের চিত্তে খোরাক জুগিয়েছে। তার পরিচালিত চলচ্চিত্রের নাম ‘ধূপছায়া’। এ ছবিতে নজরুল গুরুত্বপূর্ণ একটি চরিত্রে অভিনয়ও করেছিলেন।

সে সময় সিনেমায় যারা গাইবেন ও অভিনয় করবেন তাদের গান শেখানো ও উচ্চারণ শুদ্ধ করার দায়িত্ব ছিল তার। ১৯৩১ সালে প্রথম বাংলা সবাক চলচ্চিত্র ‘জামাই ষষ্ঠী’তে সুরকারের ভূমিকায় কাজ করেন নজরুল। সে সময় ‘জ্যোৎস্নার রাত’, ‘প্রহল্লাদ’, ‘ঋষির প্রেম’, ‘বিষ্ণুমায়া’, ‘চিরকুমারী’, ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’, ‘কলঙ্ক ভঞ্জন’, ‘রাধাকৃষ্ণ’ এবং ‘জয়দেব’ ছবিগুলোর সঙ্গে তিনি বিভিন্ন ভূমিকায় যুক্ত ছিলেন।

১৯৩৩ সালে পায়োনিয়ার ফিল্মস কোম্পানির প্রযোজনায় ‘ধ্রুব’ নামে একটি চলচ্চিত্রে গীতিকার ও সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন কাজী নজরুল। এরপর তিনি বিভিন্ন চলচ্চিত্রে সঙ্গীত পরিচালনা ও গান লেখার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।

১৯৩৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘পাতালপুরী’ চলচ্চিত্রে সঙ্গীত পরিচালনা করেন নজরুল। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কাহিনী অবলম্বনে নির্মিত ‘গৃহদাহ’ চলচ্চিত্রেও সুরকার ছিলেন নজরুল।

১৯৩৭ সালে ‘গ্রহের ফের’ ছবির সঙ্গীত পরিচালক ও সুরকার ছিলেন তিনি। মধ্যযুগের কবি বিদ্যাপতির বিভিন্ন কবিতায় নজরুলের সুর দানের কাজ ছিল অসাধারণ। বাংলা ‘বিদ্যাপতি’র সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে হিন্দিতেও নির্মিত হয় ‘বিদ্যাপতি’। সে চলচ্চিত্রটিও ব্যবসাসফল হয়।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাস অবলম্বনে ১৯৩৮ সালে নির্মিত হয় চলচ্চিত্র ‘গোরা’। এর সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন নজরুল। ১৯৩৯ সালে মুক্তি পায় ‘সাপুড়ে’। এর কাহিনীকার ও সুরকার ছিলেন তিনি। বেদে সম্প্রদায়ের জীবনভিত্তিক এ চলচ্চিত্রটি দারুণ ব্যবসাসফল হয়েছিল। এরপর ‘রজত জয়ন্তী’, ‘নন্দিনী’, ‘অভিনয়’, ‘দিকশূল’ চলচ্চিত্রের গান লিখেছিলেন নজরুল।

১৯৪১-৪২ সালে ‘মদিনা’ নামে একটি চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্যকার, গীতিকার, সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন নজরুল। এ চলচ্চিত্রের জন্য তিনি ১৫টি গান লেখেন। কিন্তু ১৯৪২ সালে নজরুল অসুস্থ হয়ে পড়ায় সিনেমাটি আর মুক্তি পায়নি। ‘চৌরঙ্গী’ চলচ্চিত্রের গীতিকার, সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন নজরুল।

একই বছর মুক্তিপ্রাপ্ত ‘দিলরুবা’ চলচ্চিত্রের গীতিকার ও সুরকারও ছিলেন তিনি। চৌরঙ্গী হিন্দিতে নির্মিত হলেও সেটার জন্য ৭টি হিন্দি গান লেখেন নজরুল। অসুস্থাবস্থায় ১৯৭৬ সালে জাতীয় কবির মৃত্যু হয়।

তার অসুস্থতার সময় এবং মৃত্যুর পর অনেক সিনেমায় তার গান ব্যবহার করা হয়েছে। তবে অধিকাংশ ছবিতেই নজরুলসঙ্গীতের ব্যবহার দর্শকপ্রিয় হয়েছে। ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’ চলচ্চিত্রে ‘পথহারা পাখি কেঁদে ফেরে একা’ গানটির উল্লেখ করা যায়।

নজরুলসঙ্গীত অত্যন্ত সার্থকভাবে ব্যবহৃত হয়েছিল সেখানে।

একইভাবে ‘জীবন থেকে নেয়া’ চলচ্চিত্রে ‘কারার ঐ লৌহকপাট’ গানটির ব্যবহার ছিল অসাধারণ। ‘লায়লি-মজনু’ চলচ্চিত্রে ‘লাইলি তোমার এসেছে ফিরিয়া, মজনু গো আঁখি খোলো’ গানটির সার্থক ব্যবহার দর্শকপ্রিয়তা অর্জন করেছিল।

নজরুলের ‘মেহের নেগার’ গল্প অবলম্বনে ২০০৬ সালে একটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। এটি যৌথভাবে পরিচালনা করেন মুশফিকুর রহমান গুলজার ও চিত্রনায়িকা মৌসুমী। নজরুলের গল্প নিয়ে মতিন রহমান নির্মাণ করে ‘রাক্ষুসী’ চলচ্চিত্রটি।

এ ছবিতে অভিনয় করেন রোজিনা ও ফেরদৌস। এর আগে নজরুলের গল্প ‘জিনের বাদশাহ’ নিয়েও চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয়। এ কবির উপন্যাস ‘মৃত্যুক্ষুধা’ এবং গল্প ‘ব্যথার দান’ ও ‘পদ্মগোখরা’ অবলম্বনেও চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে।

তার দুটি কবিতা ‘লিচুচোর’ এবং ‘খুকি ও কাঠবিড়ালি’ অবলম্বনে শিশুদের জন্য দুটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি থেকে। এছাড়া কবি নজরুলের জীবনীভিত্তিক কয়েকটি তথ্যচিত্র নির্মিত হয়েছে।

কবির হাতের নাটক লেখা হলে নাটকের ভাষা ও চরিত্র বদলে যায়। কাজী নজরুল ইসলাম যেসব নাটক রচনা করেছেন, তাতে জীবনের হুবহু অনুকরণ ঘটেনি, তা হয়েছে জীবনের ব্যাখ্যা। আর এই ব্যাখ্যা কাব্যের অনুপম ব্যঞ্জনায় সমৃদ্ধ হয়ে জীবনকে প্রতীকায়িত করেছে।

কাজী নজরুল লেটো গানে পালা রচনার মধ্যদিয়ে নজরুলের নাট্য প্রতিভার যাত্রা শুরু হয়। গীত ও নাটের যুগল বন্ধনে দীর্ঘকাল ধরে চর্চিত হয়েছে বাংলা নাটক। এই ধারার আধুনিক রূপায়ন ঘটিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আর নজরুলের নাটকে তারই প্রতিফলন ঘটেছে।

রবীন্দ্রনাথের মতোই সুর ও কাব্যময়তাকে বাঙালির শিল্পভাবনার উৎসের কাছে নিয়ে গেছেন নজরুল। তাই বলা যায়, বালক কবির হাতে রচিত লেটো গানের পালার আধুনিক রূপায়ন ঘটেছে ‘সেতুবন্ধ’, ‘মধুমালা’ প্রভৃতি নাটক।

কাজী নজরুল ইসলামের পূর্ণাঙ্গ নাট্য নিদর্শন হিসেবে আলেয়া, ঝিলিমিলি, সেতুবন্ধ, শিল্পী, ভূতের ভয়, মধুমালা নাটকের নাম উল্লেখ্য। আলেয়া নাটকের গল্পটি প্রেমমূলক আখ্যানকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। এ নাটকের নায়িকা জয়ন্তীর প্রেম ব্যাকুলতা, সিদ্ধান্তহীনতা এবং আবেগের তীব্রতা শেষ পর্যন্ত ঘটনায় ট্রাজিক আবহ তৈরি করেছে।

বাস্তবতা ও কল্পনার মিশেলে লেখা নজরুলের আরেকটি নাটক ‘ঝিলিমিলি’। বাস্তবজীবনের প্রেম ও বিরহকে কেন্দ্র করে এই নাটকটি লেখা হয়েছে। বাস্তবতার মধ্যদিয়ে গড়ে ওঠা ঝিলিমিলি নাটকের কাহিনীতে যন্ত্রণা ও চেয়ে না পাওয়ার একটি তীব্র বেদনাবোধের বাণীচিত্র দেখা গেছে। নজরুলের মধুমালা দৃশ্য ও কাব্যের সংমিশ্রণে গঠিত বলে এটি সত্যিকার অর্থেই দৃশ্যকাব্য।

অন্যদিকে চলচ্চিত্রের পাশাপাশি ‘রাক্ষুসী’ গল্প নিয়ে নাটকও নির্মিত হয়েছে। এতে অভিনয় করেন ফজলুর রহমান বাবু ও প্রসূন আজাদ।

বাংলা নাট্যধারায় কাজী নজরুল ইসলাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উত্তরসূরি হিসেবেই আবির্ভূত হয়েছিলেন। নজরুল হাজার বছরের আখ্যানধর্মী বাংলা নাট্যের সুর ও কাব্যভাষাকেই সমৃদ্ধ করেছেন ঐতিহ্যের অনুপ্রেরণায়। আর এভাবেই তিনি হয়ে উঠেছেন আধুনিক নাট্যকার, যার শিল্পের শেকড় প্রোথিত বাঙালির গীত ও নাটের কোমল জমিনে।









Leave a reply