লাগামহীন চাল আমদানীতেই কৃষকের সর্বনাশ

|

শফিক ছোটন,নওগাঁ

নানা প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেই এবার বোরো মওসুমের ধান ঘরে তুলছেন চাষিরা। কয়েক দফায় প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসল নিয়ে কৃষকরা নাজেহাল হয়েছেন। এছাড়া অন্য মওসুমের তুলনায় দুইগুন বেড়েছে কাটা মাড়াই খরচ। অথচ বেচতে গিয়ে উৎপাদন খরচের অর্ধেক দাম মিলছে না। হাটগুলো অনেকটা ক্রেতা শুন্য। ফলে চাষিদের মধ্যে হাহাকার নেমে এসেছে।

কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তরের হিসেবে দেশে এবার বোরো ধানের আবাদ হয়েছে ৪৮.৪২ লাখ হেক্টর। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৯৬.২৩ লাখ মেট্রিক টন। এরইমধ্যে নিম্নাঞ্চলের ধান কৃষকের ঘরে উঠেছে। দেশের মোট আবাদের প্রায় ৬০ শতাংশ ধান কাটা ও মাড়াই শেষ। উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের মাঠগুলোতে এখন ধান কাটার ভর মওসুম।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এবার প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও ধানের ফলন আসছে ভাল। উত্তরাঞ্চরের দিনাজপুর, বগুড়া, গাইবান্ধা, নওগাঁ, রাজশাহীসহ বিভিন্ন জেলায় বিঘা প্রতি ২০ থেকে ২২ মণ করে ধান পাচ্ছেন কৃষক। আগে-ভাগে কাটা-মাড়াই শেষ করে অনেকে হাটে ধান বিক্রি করছেন। কিন্তু নায্য দাম না পেয়ে হতাশ হয়ে পড়ছেন চাষিরা। গাইবান্ধা ও নওগাঁয় চাষিরা নায্য দাম না পেয়ে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করেছেন। ফসলে আগুন ধরিয়ে মাঠেই পাকা ধান পুড়ে ফেলেন টাঙ্গাইলের কৃষক। ধানের দাম নিয়ে সারাদেশেই কৃষকের মধ্যে চলছে হাহাকার।

চাষিরা বলছেন, অনেক আগেই সরকারী ভাবে ২৬ টাকা হিসেবে ধানের দর বেঁধে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেই দরে বিক্রি করতে পারছেন না। বরং স্থানীয় হাট ও আরতে অর্ধেক দরে ধান বেচতে হচ্ছে। মোটা জাতের ধান বিক্রি হচ্ছে ৫২০ টাকা থেকে ৫৩০ টাকা মণ। মাঝাড়ি ধানের বর্তমান বাজার দর ৬০০ টাকা। আর প্রকার ভেদে সরুজাতের প্রতি মণ জিড়া শাইল বিক্রি হচ্ছে ৭০০ টাকা থেকে ৭৫০ টাকা দরে।

নওগাঁর মাতাজি হাটে ধান বিক্রি করতে এসে স্থানীয় চাষি আজিজুল হক জানান, গেল বছর এই সময় জিড়া শাইল ধানের বাজার দর ছিলো ১২শ’ টাকা থেকে সাড়ে ১২শ টাকা পর্যন্ত। মোটা ধানের বাজার ছিলো সাড়ে আটশো টাকা। অথচ এবার সেই ধানের দর অর্ধেকে নেমে এসছে।

বগুড়ার আদমদীঘির বোরো চাষি মনজুর রহমান সরদার জানান- হাল, সেচ ও সার কীটনাশকসহ সব কিছুতেই খরচ বেড়েছে। প্রতি বিঘায় মোট উৎপাদন খরচ হয়েছে সাড়ে ১২ হাজার থেকে ১৩ হাজার টাকা। পাকা ধান ঘরে তুলতে শ্রমিককে দিতে হচ্ছে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত। সরু জাতের ধানের আবাদে আরো বেশী খরচ পড়েছে। সেই হিসেবে বিক্রি করতে গিয়ে প্রতি মণ ধানে লোকসান হচ্ছে সাড়ে তিনশো থেকে চারশো টাকা পর্যন্ত।

কৃষকের এমন দুরাবস্থায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন সচেতন মহল। কৃষক স্বার্থ সংরক্ষণ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য জয়নাল আবেদীন জানান, সরকারের একটি কৃষিনীতি আছে। কিন্তু সেটি কৃষক বান্ধব নয়। দ্বিতীয়ত, ধানের দাম বেঁধে দিলেও সরকারী ভাবে এখনও সংগ্রহ শুরু না হওয়ায় বাজারে কোন প্রভাব পড়ছে না। এছাড়া ব্যবসায়ী সিন্ডেকেট,পুঁজিপতি মওসুমী মজুদদার ও মহাজনি দৌড়াত্বে চাষিরা অসহায় হয়ে কম দামেই ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে।

নওগাঁর নাগরিক প্রতিনিধি এ্যাডিভোকেট ডিএম আব্দুল বারি বলেন, ধানের নায্য দাম না পাওয়ায় কৃষকরা অসহায় হয়ে পড়েছেন। ধান উৎপাদন করতে গিয়ে অনেকে ঋণ খেলাপী হয়ে নি:স্ব হয়ে যাচ্ছেন।

তবে বাজারে ধানের দর পতনের প্রধান কারণ হিসেবে লাগামহীন চাল আমদানীকে দায়ী করছেন ব্যবসায়ীরা নেতারা। তারা বলছেন- বাজার সমন্বয়ের নামে ইতোপূর্বে চাহিদার অতিরিক্ত চাল আমদানী করায় বর্তমান অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এজন্য সরকারী সিদ্ধান্তকেই দায়ী করছেন অনেকে।

নওগাঁ জেলা ধান চাউল আরতদার সমিতির সভাপতি নিরোদ বরন সাহা চন্দন জানান, ২০১৭ সালে বোরো মওসুমে দেশের নিম্নাঞ্চল হাওরে আগাম বন্যা ও আমন মওসুমে সারাদেশে ব্লাষ্ট রোগের আক্রমণে প্রায় ২২ লাখ মেট্রিক টন খাদ্যের ঘাটটি হয়েছিলো। অথচ সরকারী ভাবে তখন বলা হয়েছে সর্বোচ্চ ১২ টন। ফলে পরবর্তীতে দেশে চালের ঘাটতি দেখা দেয়। অস্থির হয়ে উঠে বাজার দর।

সেই অস্থিরতা ঠেকাতে তখন সরকার আমদানীতে মার্জিন তুলে দেয়। জিরো পার্সেন্ট মার্জিনে আমদানী হয়েছে কিন্তু নিয়ন্ত্রণ করা হয়নি, ঘাটতির সাথে আমদানীর সমন্বয় করা হয়নি। সেই সুযোগে আমদানী কারকরা প্রায় ৪০ লাখ মেট্রিক টন চাল আমদানী করে। যা ছিলো চাহিদার প্রায় দ্বিগুন। এই বাড়তি চালই আমাদের দেশের কৃষকের জন্য কাল হয়ে দাড়িয়েছে।

কারণ সমন্বয়হীন আমদানী হওয়ায় পরবর্তী মওসুমের ধান-চাল আটকে যায় কৃষক-মিলার ও চাল ব্যবসায়ীর কাছে। সেই ধান ও চাল এখনও পর্যাপ্ত রয়েছে। তারপরও আমন মওসুমের শেষ পর্যন্ত চাষি পর্যায়ে তেমন সংকট তৈরী হয়নি। কিন্তু উঠতি নতুন বোরো ধান উঠার সাথে সাথেই ২০১৮ সালের লাগামহীন সেই চাল আমদানীর প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

বর্তমান অবস্থা থেকে উত্তরনের পথ কি? এমন প্রশ্নের উত্তরে পরামর্শকরা বলেন- ঘোষণা অনুযায়ী সরকারী ভাবে ধান ও চাল সংগ্রহ কার্যক্রম দ্রুত শুরু করতে হবে। এছাড়া খাদ্য গুদামগুলোতে যাতে অসাধু উপায়ে ধান-চাল মজুত না হয়, সেদিকে সরকার তথা খাদ্য মন্ত্রণালয়কে সজাগ দৃষ্টি রাখতে পরামর্শ দেন তারা।









Leave a reply