‘বন্যপ্রাণির মা’ তানিয়া খান আর নেই

|

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি
বন্যপ্রাণির সেবায় সপে দিয়েছিলেন নিজের জীবন। জীবনে অর্জিত সকল সম্পদের পাশাপাশি উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সব সম্পদ খরচ করেছেন বন্যপ্রাণির সেবায়। নিজের সন্তানের মতো প্রায় দেড় দশক ধরে সেবা দিয়েছেন অসহায় প্রাণিদের। এভাবে একসময় পরিচিত হয়ে ওঠেন ’বন্যপ্রাণির মা’ হিসেবে। তিনি তানিয়া খান (৪৮) না ফেরার দেশে চলে গেছেন। বুধবার (১৩ মার্চ) দুপুরে মৌলভীবাজারের কালেঙ্গা এলাকায় নিজ বাড়িতে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
বিভিন্ন সময় মানুষের হাতে ধরা পড়া, অসুস্থ, দুর্যোগ-দুর্ঘটনায় আহত পাঁচ হাজারের বেশি পাখি এবং বিভিন্ন প্রজাতির পাঁচ শতাধিক বন্যপ্রাণি তানিয়া খানের সেবায় রক্ষা পেয়েছিলো। যেগুলো পরে মুক্ত হয়ে ফিরেছিলো নীড়ে। বনবিভাগ থেকে যখনই কোনো প্রাণি উদ্ধারের বা সুস্থ করে তোলার খবর পেতেন নির্দ্বিধায় তিনি ছুটে যেতেন বন-জঙ্গলে।

তানিয়া খানের জন্ম ঢাকায়। বাবা মো. ওয়াজেদুল ইসলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে চাকরী-বাকরী না করে বন্যপ্রাণির সেবাকে জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।

২০০৯ সালে চলে আসেন মৌলভীবাজারে। স্থানীয় বর্ষিজোড়া ইকোপার্ক ও লাউয়াছড়া ও হবিগঞ্জের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের এলাকায় কাজ শুরু করেন।

দীর্ঘদিন মৌলভীবাজার শহরতলীর সোনাপুর এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাস করেন কিন্তু ভাড়া বাসায় বন্যপ্রাণিদের সেবা দিতে সমস্যা হওয়ায় উত্তরাধিকার সুত্রে পাওয়া ঢাকার একটি ফ্ল্যাট বিক্রি করে সেই টাকায় মৌলভীবাজার শহরের অদূরে দক্ষিণ কালেঙ্গায় গড়ে তুলেন বন্যপ্রাণি সেবাকেন্দ্র। সেভ আওয়ার আনপ্রোটেকটেড লাইফ (সোল) নামে এই সেবা কেন্দ্রের পরিচালক হিসেবে প্রাণিদের পরিচর্যা করেছেন শেষ দিন পর্যন্ত।

বাংলাদেশে একসময় বন্যপ্রাণির তথ্য ভান্ডার ছিলো সীমিত। তানিয়া খান বন্যপ্রাণির তথ্যভান্ডার সমৃদ্ধ করেন। বন্যপ্রাণি সেবার পাশাপাশি তিনি অনেক নতুন প্রজাতির খোঁজ দিয়ে গেছেন। ২০১৪ সালে হবিগঞ্জের সাতছড়িতে খুঁজে পান ’থ্রি স্টামস বাংকিং’ নামের একটি পাখি। এটি দক্ষিণ এশিয়ায় দ্বিতীয় এবং দেশে প্রথম দেখার রেকর্ড। ২০১৩ সালে সাতছড়িতে ’হিল ব্লু ফ্লাই ক্যাচার’ খুঁজে পান। লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে ‘পাইড ওয়ার্টি ফ্রগ’ নামের একটি ক্ষুদ্র ব্যাঙ আবিষ্কার করেন ২০১২ সালে।

এ ছাড়া ‘বুশ ফ্রগ’ জাতের একটি ব্যাঙের দেখাও পেয়েছিলেন। ২০১২ সালে প্রথম এবং ২০১৬ সালে দ্বিতীয়বার লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে ‘চিকিলা ফুলেরি’ নামের প্রাগৈতিহাসিক প্রাণি মৃত অবস্থায় খুঁজে পান তিনি। মৌলভীবাজারের আদমপুরে ‘ফলস কোবরা’ নামের একটি সাপ এবং লাউয়াছড়ায় ‘হিমালয়ান মোল’ নামের এক প্রাণির খোঁজ দেন তিনি। এ দুটি প্রাণি দেশে প্রথম দেখার রেকর্ড তানিয়া খানের।

তিনি বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের সদস্য ছিলেন। কাজ করেছেন আইইউসিএন (ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব কনজারভেশন ফর ন্যাচার), নিসর্গসহ বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে। তানিয়া খানের অকাল মৃত্যুতে মৌলভীবাজারে শোকের ছায়া নেমেছে। শোক জানিয়েছেন দেশের অনেক পরিবেশবিদ, বন্যপ্রাণি গবেষক, শিক্ষক ও সচেতনজন।









Leave a reply