পা হারানো রাসেল ও মানবিকতার শেষ স্তর!

|

ইব্রাহিম খলিল

“পা হারানোর পর একটা বছর হয়ে গেল গ্রীন লাইনের কেউ কোন দিন ফোন করে খোঁজও নেয়নি” বড় আক্ষেপ আর চোখে জল নিয়ে আজ আদালত প্রাঙ্গনে কথাগুলো বলছিলেন গ্রীন লাইন বাসের চাপায় পা হারানো প্রাইভেটকার চালক রাসেল।

ঘটনাটা হয়তো অনেকে পুরোপুরি ভুলে যায়নি। তবুও একটু মনে করিয়ে দিতে চাই। গত বছরের ২৮ এপ্রিল গ্রীন লাইন পরিবহনের একটি বাস রাজধানীর ধোলাইপাড় থেকে দ্রুত গতিতে মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ফ্লাইওভারে ওঠার সময় একটি প্রাইভেটকারকে ধাক্কা দেয়। তখন প্রাইভেটকারের চালক রাসেল গাড়ি থেকে নেমে বাসকে থামতে বলেন। কিন্তু বাস চালক কবির গাড়ি চালিয়ে দেন চালক রাসেলের পায়ের ওপর। এতে রাসেলের একটি পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

এরপর পায়ের চিকিৎসার জন্য সর্বস্ব খুইয়ে রাসেলের পকেট থেকে চলে যায় ২০ লক্ষ টাকা। মাথার ওপর বিশাল ঋণের বোঝা। ঘরে স্ত্রী আর কোলের সন্তান। পঙ্গু চালককে আর কেউ চাকরী দেয়নি। এর মধ্যে কেটে গেছে প্রায় একটি বছর।

হতভম্ব হওয়ার মত বিষয় হলো, ক্ষতিপূরণ তো দূরের কথা গত এক বছরে একটি বার ফোন দিয়ে পা হারানো রাসেলের একটু খবরও নেয়নি ঘাতক গ্রীন লাইন কর্তৃপক্ষ। হায়রে মানবিকতা! হায়রে মানবতা! বর্তমান সমাজ বাস্তবতায় এই হচ্ছে মানুষের প্রতি মানুষের নূন্যতম দরদ এর করুণ চিত্র।

মানুষের পা কেড়ে নিয়ে একটু খোঁজও নেবার প্রয়োজন বোধ করেনা আজকের “মানুষ”। এই ঘটনা থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় যাত্রী আর পথচারীদের বা অন্যদের জীবনের কতটা মূল্যায়ন করেন পরিবহন মালিকরা। এরা একদিকে আপনাকে লাক্সারি পরিবহন সেবার অঙ্গিকার করবে আর অন্যদিকে আপনার জীবনের মূল্যকে লাথি মেরে দূরে ঠেলে দিবে! হায় সেলুকাস!

তবে গ্রীন লাইন পরিবহন নূ্ন্যতম খোঁজ না নিলেও রাসেলকে হতাশ করেনি উচ্চ আদালত। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে রাসেলকে ৫০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে গ্রীন লাইন পরিবহনকে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই সাথে গ্রিনলাইন পরিবহনকে রাসেলের চিকিৎসা খরচ ও পা পুনঃস্থাপনের ব্যয় বহন করারও নির্দেশ দেয়া হয়।

টাকা হাতে না আসা পর্যন্ত আশায় বুক বাঁধতে পারছে না রাসেল। হয়তো টাকাটা হাতে পেলে এটাই হবে তার শেষ সম্বল।

লেখা শেষ করবো ভাস্কর চৌধুরির বিখ্যাত কবিতা “আমার বন্ধু নিরঞ্জন” এর প্রসঙ্গ টেনে। কবি কতটা দরদ দিয়ে লিখেছিলেন–

মানুষকে এত ক্ষুদ্রার্থে নেবেন না,
মানুষ এত বড় যে,
আপনি যদি ‘মানুষ’ শব্দটি
একবার উচ্চারণ করেন
যদি অন্তর থেকে করেন উচ্চারণ
যদি বোঝেন এবং উচ্চারণ করেন ‘মানুষ’
তো আপনি কাঁদবেন।
আমি মানুষের পক্ষে,
মানুষের সঙ্গে এবং মানুষের জন্যে।

কবির সেই ‌”মানবিকতার দরদ” কাল্পনিক হয়ে ফিকে হয়ে আসছে আজকের বাস্তবিক দুনিয়ায়।


   লেখক: গণমাধ্যমকর্মী


সম্পর্কিত আরও পড়ুন





Leave a reply