সকল নৃ-গোষ্ঠীর মাতৃভাষা রক্ষার আহ্বানে শেষ হলো কমলগঞ্জের ভাষা উৎসব

|

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি
পৃথিবীব্যাপি ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বার মাতৃভাষা আজ চরম সংকটে। বাংলাদেশে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগুলোর মাতৃভাষাও রয়েছে বিপন্ন। মাতৃভাষা মানুষের জন্মগত অধিকার কিন্তু পুঁজিবাদী আগ্রাসন, ভূ-রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও নব্য ঔপনিবেশিক শোষণ ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বাগুলোর ভাষাকে করেছে সংকটাপন্ন। এ কারণে ভাষার স্বীকৃতি নিয়ে আজও লড়াই করতে হয় ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বাগুলোকে। মাতৃভাষার মতো একটি মৌলিক সাংস্কৃতিক উপাদানের অস্থিত্বের সংকট রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ছাড়া মোকাবিলা সম্ভব হয়না।

সংকটাপন্ন জাতিগুলোর মাতৃভাষা চর্চায় উৎসাহিত এবং তাদের ভাষা সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখার তাগিদে মৌলভীবাজার জেলার বহু ভাষাভাষীর উপজেলা কমলগঞ্জে অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো ভাষা উৎসব।
শনিবার (০২ মার্চ) দিনব্যাপি উৎসবে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষ তাদের নিজস্ব আচার-সংস্কৃতির নানা বিষয় উপস্থাপন করেন। নাচ গান ভাষাতাত্ত্বিক আলোচনার নান্দনিক এই অনুষ্ঠান উপভোগ করেন হাজারো মানুষ। বহু জাতির মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছিলো প্রথম বারের মতো আয়োজিত বর্ণিল এই উৎসব।

সকালে জেলা পরিষদ মিলনায়তন প্রাঙ্গণে কমলগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন এবং কমলগঞ্জ সাহিত্য ও সংস্কৃতি পরিষদ আয়োজিত উৎসবের উদ্বোধন করেন উপাধ্যক্ষ ড. মো. আব্দুস শহীদ এমপি। পরে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের হয়। শোভাযাত্রাটি উপজেলা সদরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে মিলনায়তনে এসে শেষ হয়।


জাতীয় সঙ্গীতের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে কমলগঞ্জের ’ভাষা বৈচিত্র্য’ এবং ’ভাষাসংগ্রামী মো. ইলিয়াস জীবন ও কর্ম গ্রন্থদ্বয়ের মোড়ক উম্মোচন করা হয়। সাবেক সাংসদ ও বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ভাষাসংগ্রামী জননেতা মো. ইলিয়াস এর সহধর্মিনীকে সম্মাননা প্রদান করা হয়।

কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আশেকুল হকের সভাপতিত্বে ও কবি শাহাজান মানিকের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে কমলগঞ্জ সাহিত্য ও সংস্কৃতি পরিষদের আহবায়ক আহমদ সিরাজের স্বাগত বক্তব্যের পর অনুভূতি প্রকাশ করেন কমলগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ সদস্য অধ্যাপক মো. রফিকুর রহমান, কমলগঞ্জ উপজেলার সাবেক নির্বাহী কর্মকর্তা ও চট্টগ্রাম ওয়াসার প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাহমুদুল হক, কমলগঞ্জ সরকারি গণ মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ কামরুজ্জামান মিয়া, সুজা মেমোরিয়াল কলেজের অধ্যক্ষ ম. মুর্শেদুর রহমান, আব্দুল গফুর চৌধুরী মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ মো. হেলাল উদ্দিন, কবি সনাতন হামোম, অবিনাশ আচার্য।

ভাষাতাত্ত্বিক আলোচনায় অংশ নেন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের উপ-পরিচালক নাজমুন্নাহার বেগম, লেখক ও ভাষাবিজ্ঞানী ড. সেলু বাসিত, কবি ও গবেষক অধ্যাপক নৃপেন্দ্রলাল দাশ, লেখক ও গবেষক রসময় মোহান্ত, শিক্ষাবিদ ও গবেষক ড. আবুল ফতেহ ফাত্তাহ, অধ্যাপক সাইয়্যিদ মুজিবুর রহমান, লেখক ও গবেষক ড. শোয়াইব জিবরান, কবি ও কথা সাহিত্যিক আকমল হোসেন নিপু, লেখক ও গবেষক ড. রণজিত সিংহ।

আলোচনায় বক্তারা বলেন, কমলগঞ্জ উপজেলার মতো বাংলাদেশের আর কোন উপজেলায় এতো জনবৈচিত্র্যের সম্ভার নেই। কিন্তু বিচ্ছিন্নভাবে বসবাস এবং জীবন ও সংস্কৃতি চর্চার অভাবে ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর ভাষা সংস্কৃতি আজ বিপন্ন। যাদের ভাষা-সংস্কৃতি বাংলাদেশকে সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধি দিয়েছে তারা আজ ভালো নেই। এজন্য সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, তাদের ভাষা সংস্কৃতির স্বীকৃতি এবং কমলগঞ্জে ভাষা চর্চা একাডেমি স্থাপনের দাবি জানান তারা।

উৎসবে কমলগঞ্জে বসবাসরত গারো, খাসি, মণিপুরী, সাঁওতাল, মুন্ডা, তেলেগু, উরাং, শব্দকর, ওড়িয়া, ভূমিজ, ত্রিপুরি, ভোজপুরীসহ চা জনগোষ্ঠীর মানুষ তাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করেন।









Leave a reply