একটি স্বরচিত ‘দুর্ঘটনা’

|

মুরশিদুজ্জামান হিমু

২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিলের কথা নিশ্চয়ই অনেকের স্মৃতিতে পেছনে পড়ে গেছে। কেউ কেউ হয়ত ভুলেই গেছেন। হঠাৎ মনে পড়ছে না, কী হয়েছিল সেদিন। তা ভুলে যাবারই কথা। এত এত ঘটনার ভিড়ে কে মনে রাখে এসব? স্মৃতি কিছুটা বিস্মৃত হলেও আদতেই কিন্তু সেই ২৪ এপ্রিলের কথা ভুলে যাওয়া যায় না। কীভাবেই বা ভুলবেন? কারণ সেটা যে ‘দুঃসহ স্মৃতি’। চিরতরে কালো দাগ এটে দিয়ে গেছে আমাদের মনে। কেড়ে নিয়েছে এক হাজারেরও বেশি মানুষের প্রাণ। সাভারে সেদিন ধসে পড়েছিল বহুতল রানা প্লাজা।

আরেকটু পেছনে ফিরি। রানা প্লাজা ধসের কথাই যখন মনে নেই, এ ঘটনা তো রীতিমত স্মৃতি থেকে হাতড়ে বের করতে হবে। ২০১২ সালে আশুলিয়ার তাজরীন ফ্যাশনস নামের একটি পোশাক কারখানায় আগুনে ১১৩ জন শ্রমিক মারা যাবার কথা মনে আছে? ওই ঘটনায় দায়ী কে বা কারা, তা নিয়ে বেশ সরগরম ছিল বেশ কিছুদিন। মামলা হয়েছে, হয়েছে কয়েকটা তদন্ত কমিটিও। পরে কী হয়েছে ওই ঘটনার? কে জানে?

এবার যে ঘটনাটির কথা বলব, তা সবাই ভুলে গিয়েছিলেন, এটা নিশ্চিত। ২০১০ সালের ৫ জুন রাজধানীর পুরান ঢাকার নিমতলীতে ভয়াবহ আগুনে পুড়ে অঙ্গার হয় ১১৯টি মানবদেহ। ভুলে যাবার কথা নয় কি? সেই কবেকার কথা! ৯ বছর আগের ওই ঘটনা মনে রাখার আদতেই কি কোন কারণ আছে!

তবে, ভোলার খুব যথোপযুক্ত কারণ আছে বলে মনে হয়। যদি না-ই ভুলতাম, তাহলে আজ চকবাজার ট্র্যাজেডি আমাদের কাঁদাত না। বুক খালি করত না অসংখ্য মায়ের-বাবা’র। অনেকেই নিশ্চয়ই ভাই হারাত না। দেখতে হত না প্রিয়জনের আগুনে পোড়া নিথর দেহ।

এসব দেখে একটা প্রশ্ন জাগে। এই যে নিত্যদিন এত এত মানুষ মরে, আমাদের কার তাতে কী? কোথাও ভবন ধসে বা দেয়ালচাপা পড়ে, কোথাও আগুনে পুড়ে। সড়কে মৃত্যুর মিছিল তো দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে দিনদিন। গণমাধ্যমে অস্বাভাবিক মৃত্যুর খবর আর আহত করে না কারও হৃদয়। কারো কিছু যায় আসে না। যদি কিছু যেত-আসত, তাহলে আজ নিশ্চয়ই ঢাকার বাতাসে ভাসত না লাশের গন্ধ।

যে সকাল শুরু হবার কথা ছিল সালাম-বরকত-রফিক-জব্বার দিয়ে, সেই সকাল শুরু হয়েছে ফায়ার সার্ভিসের শঙ্কা জাগানিয়া সাইরেন আর ঢাকা মেডিকেলের বার্ণ ইউনিটের করুণ আর্তনাদে। যে সকাল শুরু হবার কথা ছিল শহীদ বেদিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পনের মধ্য দিয়ে, সেই সকালের সূর্য উঠেছে দগ্ধ মানুষের আত্মচিৎকারে। যে সকালে প্রাণ ভরে শ্বাস নেয়ার কথা ছিল, সেই সকাল দেখেছে শ্বাসনালী পুড়ে যাওয়া অনেক মানুষকে।

কে দেখবে এসব? আদতেই কি কেউ দেখার আছে? নাকি নেই?

চকবাজার ট্র্যাজেডি আমাদের কিছু ভাবনারও খোরাক জোগায়। সামনে আসে বেশকিছু প্রশ্ন। যেমন, যে ভবনটিতে রাসায়নিকের গুদাম ছিল, সে ভবনটি কিভাবে আবাসিক হিসেবে ব্যবহার হতে পারে? ভবনের মালিক কিভাবে সেখানে দাহ্য পদার্থ গুদামজাত করার জন্য ভাড়া দিলেন? ভবনের বাসিন্দারাই বা কিভাবে তা মেনে নিয়ে এতদিন বসবাস করছিলেন সেখানে? এত অনিয়ম হচ্ছিল, কেউ কোন প্রতিবাদ করেনি? তারপরও কি আমরা বলব এখানে দায় শুধু সরকার বা সিটি করপোরেশনের? আপনার-আমার ওপরও কি কিছুটা বর্তায় না? কবে আমরা সচেতন হব? নিজেকে নিরাপদ যদি নিজেই না করতে পারি, তাহলে কে রক্ষা করবে আমাকে?

এটা ভেবে আবার সরকার বা সিটি করপোরেশন বা দেখভালের দায়িত্বে থাকা অন্য কোন সংস্থা’র দায়মুক্তির সুযোগ নেই। মূল দায়িত্ব আসলে তাদেরই। একটি এলাকার বিশাল অংশজুড়ে এভাবে দিনের পর দিন রাসায়নিক দাহ্য পদার্থ মজুত করে ব্যবসা চালানো হচ্ছে। তাও একেবারেই অরক্ষিতভাবে। আর কর্তৃপক্ষ চুপচাপ? কেন? নাকি মানুষের জীবনের মূল্য নেই তাদের কাছে? আর কত মানুষ প্রাণ হারালে টনক নড়বে তাদের?

এসব দুর্ঘটনার প্রেক্ষাপট আসলে তৈরি করেছি আমরাই। তা না হলে ২০১০’র নিমতলী ট্র্র্যাজেডির পর কেন আবারও তা ২০১৯-এ ফিরল চকবাজারে? এখনই যদি সচেতন না হই আমরা, তাহলে হয়ত এমন দুর্ঘটনা আবারও ঘটতে পারে অন্য কোন জায়গায়। তা কি কাম্য কারও?

লেখক: সাংবাদিক









Leave a reply