যুগান্তর… আহা কত স্মৃতি

|

মুরশিদুজ্জামান হিমু
খুব বড় কোন অফিস ছিল না। মানে আজকাল যেমন হয়, সুউচ্চ ভবন, লিফট, পুরোটা সেন্ট্রাল এসি, এসব। ছিল না তারকা মানের হোটেল টাইপ ক্যান্টিন। তবে কী কী ছিল জানেন? ছিল ভালবাসা, সবাই মিলে কাজ করার চেষ্টা, ছোটদের কাজ শেখানো, হই-হুল্লোড়-আড্ডাবাজি। কমলাপুরের সেই দৈনিক যুগান্তর অফিস আমার মত আরও অনেকেরই সাংবাদিকতার আঁতুড়ঘর।

মনে পড়ে, রাতদিন লিখেছি। পত্রিকার সেই ছোট ছোট লেখার প্যাডগুলো ভরে ভরে লিখেছি। পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা।
মনে পড়ছে আবু হাসান শাহরিয়ার ভাইয়ের কথা। তার রুমে যেতে ভয় লাগত তখন। যদি আজ যে লেখাটি ছাপা হয়েছে, সেটা ‘কিছু হয়নি’ বলে ঝাড়ি দেয়া শুরু করেন! তারপরও যেতাম। যখন দেখতাম শাহরিয়ার ভাই খোশমেজাজে। পত্রিকায় লেখা, পেজ মেকআপসহ সাংবাদিকতার অনেক কিছু শিখেছি তার কাছে। এখন বুঝি, তার সেই ‘রাগারাগি’ ছিল আমার জন্যই, আমাকে কিছু শেখানোর জন্যই।

শিখেছি শূচি সৈয়দ ভাইয়ের কাছে। যার কাছে এখনও আমি গল্প শুনতে যাই। দূর থেকে যে মানুষটিকে দেখলে কেন যেন আমার মন চনমনে হয়ে ওঠে। জানি না কেন।

সোহেলী আপু, আবেদ ভাই আর তরিক ভাইয়ের কাছে আমি ঋণী। এই তিন জন না থাকলে সাংবাদিকতা পেশা আমার কাছে নিশ্চয়ই অনেক কঠিন হত। পত্রিকায় আমার লেখালেখি শুরু ‘যুগান্তর ডটকম’ নামে একটি ফিচার পাতা থেকে। যার সম্পাদনা করতেন তরিক ভাই। যুগান্তরে চাকরি হবার পর আমার সরাসরি ‘বস’ হয়েছিলেন আবেদ ভাই। তবে ‘বস’ যে ‘বড় ভাই’ হয়, আবেদ ভাই তা আমাকে বুঝিয়েছিলেন। আর সোহেলী আপু? সে এক বিরাট গল্প। শুধু এতটুকু বলি, অনেকেই এখনও আমাকে ও সোহেলী আপুকে সহোদর মনে করেন (আমি তা বিশ্বাসও করি)। শুধু সাংবাদিকতাই নয়, ব্যক্তিগত জীবনে এই তিন জন আমার অভিভাবকও বটে।

সেলিম ভাই, সেজান ভাই, রবি ভাই, ইশতিয়াক ভাই, মিলি আপা, লাবন্য দি, নিতু আপু, মৌ আপুর কাছে আমার ঋণ অশেষ। পরে অনুরূপ দা, সোহেল ভাই, লিটন ভাই, নিপু দা’দের সাথে যুগান্তরে কাটানো সময় কি কখনও ভুলতে পারব? কখনই না।

সোহরাব ভাই, হাসান মামুন ভাই বা আসিফ ভাই’র কাছেও শিখেছি অনেক। এখনও দূর থেকে সোহরাব ভাইকে দেখি। মাঝে মাঝে লেখা পড়ি, মাঝে-মধ্যে দেখাও হয়। মামুন ভাইকে দেখে এখনও আমি ভাল মানুষ হওয়া শিখি, মার্জিত হওয়া শিখি। কিভাবে গুছিয়ে লিখতে হয়, তা শিখি। যুগান্তরে চাকরি হবার পর মামুন ভাই আমাকে একটি উপহার দিয়েছিলেন। যেটির কথা আমি আজীবন মনে রাখব।

যুগান্তরের ফিচার থেকে নিউজে গিয়ে কাজ শুরু করাটা আমার জন্য অনেক চ্যালেঞ্জের ছিল। আমার সৌভাগ্য, সেই চ্যালেঞ্জকে কঠিন কিছু মনে হয়নি সহকর্মীদের কারণেই। সেই বার্তাকক্ষ ছিল আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ পাঠশালা। সেই পাঠশালার শিক্ষক ছিলেন সাইফুল ভাই, ফারুক ভাই, বাবু ভাই, রতন ভাই, রফিকুল হক দাদু ভাই, আনোয়ার ভাই, রহমান ভাইরা। মাথার ওপর ছায়া হয়ে ছিলেন মহিউদ্দিন ভাই আর গোর্কি ভাই। এখনও যাদের আদর-শাসন-উপদেশ-আদেশ ছাড়া আমি অসম্পূর্ণ। রাজু ভাইকে আমি মিস করি ভীষণ। কেন জানি উনি আমাকে খুব আকৃষ্ট করতেন। কমলেশ দা, তারিক ভাই, জোহা ভাই, সবার কাছেই ঋণী আমি।

দূর থেকে দেখতাম মিজান মালিক ভাই, এনাম ভাই, তপু ভাই, জাহাঙ্গীর ভাইদের। ছোটদের কিভাবে আপন করে নিতে হয়, তা বোধহয় আবদুল্লাহ আল মামুন ভাইয়ের মতো কেউ জানেন না। যুগান্তরে মামুন ভাইয়ের সাথে একদিনের ফোনালাপ, আমি কখনও ভুলব না। সেদিন তার অনুপ্রেরণামূলক কয়েকটি কথা আমার ক্যারিয়ারে আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে। পারভেজ ভাইয়ের মতো জানাশোনা মানুষ আজকাল পত্রিকাতেও কম দেখা যায়। যে কোন খেলা নিয়ে তার বিশ্লেষণ অসাধারণ। মাসুদ করিম ভাই, আর মুজিব মাসুদ ভাইকে নিয়েও বলার আছে অনেক কিছু। আর ফজলু ভাই? তাকে আমি ‘কবি রুদ্রাক্ষ রহমান’ নামে ডাকতেই পছন্দ করি। তৌহিদ ভাই, হাবিব ভাই, দীপক দেব, মীর রাকিবকেও মনে পড়ছে খুব। মনে পড়ছে সদা হাসিমুখ জাকির ভাই আর ফারুক ভাইয়ের কথাও। মনে পড়ছে জাকির ভাইয়ের ‘১০ টাকায় বাঘের খাঁচা’র গল্প। পরপারে নিশ্চয়ই ভাল আছেন দু’জন।

ফটোগ্রাফার নজরুল ভাই, শামীম ভাই, পেস্টিংয়ের আজাদ ভাই, কম্পিউটারের শাহাদত ভাই, মানি ভাই, রাজা ভাই, প্রুফের আতিক ভাই, আরও কত মানুষ! প্রতিদিন বিকেল থেকে মধ্যরাত অবদি একসাথে দৌঁড়াতাম আমরা!

আমি জানি অনেকের নাম বলা হল না। লিখতে গেলে কয়েক পৃষ্ঠা শুধু নামই হবে। তবু শেষ হবে না। প্রতিজনের কাছেই আমার কোন না কোন ঋণ আছে। জানি, তা পরিশোধ করা সম্ভব নয় কখনও।
যুগান্তরে দুটি জায়গার কথা না বললে একেবারেই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। মানিক ভাই আর মফিজ ভাইয়ের দোকান। কত মধুর সময় যে সেখানে কেটেছে, তা এখনও স্মৃতি হয়ে ভাসে।

দেখতে দেখতে বছর পেরিয়েছে অনেক। আমি নিজেই যুগান্তর ছেড়েছি ৮-৯ বছর হতে চলল। যাদের নাম বললাম, তাদের অনেকেই যুগান্তরে নেই। কেউ কেউ পৃথিবীকেই বিদায় বলেছেন।
সত্যি বলছি, আমি যেখানেই যাই, যতদূরেই যাই, যুগান্তরকে আমি বুকের ভেতর রাখি। বের করে মাঝে মাঝে দেখি। অতীত হাতড়ে আবার ঢুকিয়ে ফেলি ভেতরে।

সবার ভালবাসায় কাগজটি ২০ বছরে পদার্পন করল। শুভকামনা যুগান্তর। এগিয়ে যাও আরও। বাঁচো মানুষের ভালবাসায়, পাঠকের ভালবাসায়।


লেখক: সাংবাদিক, যমুনা টেলিভিশন









Leave a reply