‘সেনারা বাচ্চাকে কেড়ে নিয়ে আগুনে ফেলে দেয়, তারপর…’

|

রোহিঙ্গা নিপীড়ন নিয়ে প্রতিদিন সারা বিশ্বের সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে। দুনিয়ার বাঘা বাঘা সাংবাদিকরা কক্সবাজারে আসছেন সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ শরণার্থী সংকট নিজ চোখে প্রত্যক্ষ করতে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী দৈনিক পত্রিকা নিউ ইয়র্ক টাইমসের সাংবাদিক জেফরি গেটলেম্যানও সম্প্রতি রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করে গেছেন। সাংবাদিকতার জন্য ২০১২ সালে পুলিৎজার পুরস্কার পাওয়া গেটলেম্যান তার রিপোর্টে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন হৃদয়গ্রাহী ভাষায়।

বুধবার নিউইয়র্ক টাইমস-এ ‌’রোহিঙ্গা রিকাউন্ট অ্যাট্রসিটিজ: ‘দে থ্রিউ মাই বেবি ইনটু এ ফায়ার’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনের কিছু অংশ তুলে ধরা হল-

বন্দুকের মুখে নদীতে কয়েকশ নারী। তাদেরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে নড়াচড়া না করতে। সেনাদের একটি দল এগিয়ে এলো এক তরুণীর দিকে। নদীতে বুক সমান পানিতে দাঁড়িয়ে থাকা ওই তরুণীর নাম রাজুমা। বুকের একটু ওপরে সন্তানকে কোনোমতে ধরে রেখেছেন। মিয়ানমারের রাখাইনে সেনাবাহিনী ও স্থানীয় বৌদ্ধরা গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়ায় পালিয়ে এসেছেন তিনি।

‘তুমি,’ রাজুমা’র দিকে ইঙ্গিত করে বলে ওঠে এক সেনা।

রাজুমা নিশ্চল হয়ে পড়ে।

‘তুমি!’

নিজের সন্তানকে আরও জোরে আঁকড়ে ধরেন রাজুমা।

এরপর মুহূর্তের সহিংসতায় অন্ধকার হয়ে ওঠে তার চারপাশ। সেনারা লাঠি দিয়ে রাজুমার মুখে আঘাত করে। কান্নারত সন্তানকে কেড়ে নেয় একটানে। ছুড়ে মারে আগুনে। তারপর রাজুমাকে জোর করে টেনে-হিঁচড়ে নেওয়া হয় একটি ঘরে। সেখানে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হন সদ্য সন্তান হারানো রাজুমা।

দিনের সূর্য তখন প্রায় অস্তমিত। নগ্ন ও রক্তাক্ত শরীর নিয়ে একটি ধানের ক্ষেত দিয়ে দৌড়ে পালাচ্ছিলেন রাজুমা। সন্তান হারিয়েছেন তিনি; হারিয়েছেন মা, দুই বোন ও দুই ছোট ভাইকে। সবাইকে তার চোখের সামনেই হত্যা করা হয়েছে।

মিয়ানমারে রাখাইনে রোহিঙ্গারা এক অবর্ণনীয় নিপীড়ন ও হত্যাযজ্ঞের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের একটি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আশ্রয় নেওয়া রাজুমার কথায় সেই নির্যাতনেরই প্রতিচ্ছবি। রাজুমা একজন রোহিঙ্গা মুসলিম, যাদেরকে বিশ্বের সবচেয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত জাতিগোষ্ঠী হিসেবে মনে করা হয়।

পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা জানান, সরকারি সেনা সদস্যরা শিশুদের কুপিয়ে হত্যা করছে, ছেলেদের দেহ থেকে মাথা কেটে বিচ্ছিন্ন করছে, ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে পুরো পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করছে, গ্রামের নিরস্ত্র ব্যক্তিকে বেশ কয়েকজন ঘিরে ধরছে এবং পরে হত্যা করছে। এইসব সহিংসতার ঘটনা নৃশংসতম নিষ্ঠুরতা; যা নতুন কোনও উদাহরণ নয়। ইতিহাসে জাতিগত বিদ্বেষের ক্ষেত্রে এমন ঘটনাগুলোই ঘটে থাকে।
রাজুমার ভাষায়, ‘লোকজন সেনাদের পায়ে ধরে কান্নাকাটি জীবন ভিক্ষা চেয়েছে। কিন্তু তারা থামেনি। লাথি মেরে দূরে সরিয়ে দিয়েছে, হত্যা করেছে। তারা মানুষকে কুপিয়ে, গুলি করে হত্যা করেছে। তারা আমাদের ধর্ষণ করেছে, অচেতন অবস্থায় ফেলে চলে গেছে।’

মানবাধিকার লঙ্ঘনের তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, রাখাইনে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী অন্তত এক হাজার বেসামরিক নাগরিককে হত্যা করেছে। এই সংখ্যা পাঁচ হাজার ছাড়াতে পারে বলে ধারণা করা হয়। মিয়ানমার সরকার রাখাইনে জাতিসংঘসহ কোনও সংস্থা বা কাউকে প্রবেশের অনুমতি দিচ্ছে না। ফলে সত্যিকার অর্থে নিহতের সংখ্যা জানতে পারা কঠিন হয়ে পড়েছে।

বুধবার জাতিসংঘ জানিয়েছে, মিয়ানমার সেনাবাহিনী বেঁচে থাকা রোহিঙ্গাদের তাড়িয়ে দিতে ধর্ষণ ও অন্যান্য মানসিক আঘাত করার মতো কৌশল অবলম্বন করছে। সহিংসতার মাত্রা ছাড়াতে তারা বাড়িঘর, ক্ষেত ও গৃহপালিত পশু পর্যন্ত পুড়িয়ে দিচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গারা যেন পুনরায় রাখাইনে ফিরে আসতে না পারে এবং পারলেও যেনও নিজেদের ঘরবাড়ি শনাক্ত করতে না পারে, সেটা নিশ্চিত করতেই সেনাবাহিনী এসব কাণ্ড ঘটাচ্ছে বলে উল্লেখ করেছে জাতিসংঘ।




Leave a reply