যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ট মিত্ররা কেন রাশিয়ার দিকে ঝুঁকছে?

|

মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের পর যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ঘনিষ্ট মিত্র সৌদি আরব। মিত্রতার সম্পর্ক চলছে দশকের পর দশ ধরে। ওবামা প্রশাসনের শেষ দিকে এসে ওয়াশিংটন-রিয়াদ কিছুটা দূরত্ব তৈরি হলেও ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর তা কমতে থাকে। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথম বিদেশ সফরেই যান সৌদিতে।

আর তুরস্ক হলো যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাটো-মিত্র। প্রথাগত সামরিক শক্তির দিক থেকে ন্যাটোতে যুক্তরাষ্ট্রের পরেই অবস্থান তুরস্কের। ইউরোপের নিরাপত্তা ও বাণিজ্যের জন্য তুরস্ক পশ্চিমাদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ দেশ। সার্বিক বিবেচনায় ওয়াশিংটন-আংকারা পরস্পরের খুবই ঘনিষ্ট মিত্র।

অন্যদিকে রাশিয়াকে যুক্তরাষ্ট্র মনে করে তার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী, বলা যায় ‘চিরশত্রু’ও। আর এই চিরশত্রুর সাথে কিনা মাখামাখি শুরু করলো মার্কিন ঘনিষ্ট মিত্ররা! তুরস্ক আর সৌদি আরব রাশিয়ার সাথে করছে একের পর এক সামরিক-অস্ত্র চুক্তি।

মজার বিষয় হল, রাশিয়ার সাথে আংকারা ও রিয়াদের সম্পর্কও নিকট অতীতে মধুর ছিল না। গত ২৫ বছরে কোনো সৌদি বাদশাহ রাশিয়া সফর করেননি। রাশিয়ার সরকার প্রধানদের কেউও আসেননি সৌদিতে। তেল বাণিজ্য নিয়ে দুদেশের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বহু পুরোনো। তুরস্ক তো বছর দুয়েক আগে সিরিয়া রুশ যুদ্ধবিমান গুলি করে ভূপাতিত করেছিল। যার স্বাভাবিক ফল, দুই দেশের সম্পর্কে চুড়ান্ত অবনতি। কথাযুদ্ধ শুরু হয় উভয়পক্ষে। অর্থনৈতিক অবরোধও চলেছে অনেক দিন।

বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় সংকট সিরিয়া যুদ্ধ। এ ক্ষেত্রেও তুরস্ক ও সৌদি রাশিয়ার বিপরীত অবস্থানে আছে। রাশিয়া সিরীয় প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদকে টিকিয়ে রাখতে মরিয়া; পতনের মুখে থাকা বাশারকে আবার শক্ত অবস্থানে নিতে সক্ষম হয়েছে। অন্যদিকে সৌদি-তুরস্ক চায় বাশারকে সরাতে। যদিও সম্প্রতি আংকারা নিজেদের অবস্থান কিছুটা নরম করেছে এ ক্ষেত্রে।

পরস্পরের প্রতি এত বিরোধ থাকার পরও গত কয়েক মাসে তুরস্ক ও সৌদি আরব ক্রেমলিনের সাথে একাধিক সামরিক চুক্তি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের দেয়া অত্যাধুনিক ক্ষেপনাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (থাড) থাকার পরও রাশিয়ার তৈরি এস-৪০০ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কিনেছে দুটি দেশই। গত বৃহস্পতিবার এই সমরাস্ত্র কেনার ঘোষণা দেয় সৌদি আরব। তার আগে গত সেপ্টেম্বরে তুরস্কও জানায় তারা এস-৪০০ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার জন্য চুক্তি করেছে।

সৌদি ও তুরস্কের এমন পদক্ষেপে যুক্তরাষ্ট্র উদ্বিগ্ন। পেন্টাগনের মূখপাত্র মিশেল বলডেনজা গত ৬ অক্টোবর এক ব্রিফিংয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে কিছু মিত্র দেশ যেভাবে রাশিয়ার সমরাস্ত্রের দিকে ঝুঁকছে তাতে ওয়াশিংটন উদ্বিগ্ন।

কিন্তু এভাবে মিত্ররা কেন ‘ভরসা’ হারাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর? এর কারণ বহুবিদ।

তুরস্কের বর্তমান ক্ষমতাসীন দল রাজনৈতিক ইসলামের সাথে সংশ্লিষ্ট। মধ্যপ্রাচ্যেও তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক এজেন্ডা রয়েছে, যা মার্কিন স্বার্থের সাথে সাংঘর্ষিক। গত দেড় দশক ধরে পশ্চিমামুখী পররাষ্ট্রনীতির চেয়ে রাজনৈতিক ইসলামের ভিত্তিতে গড়া প্রাচ্যমূখী নীতিকে প্রাধান্য দিচ্ছে দেশটির সরকার। এতে দীর্ঘ মেয়াদে ওয়াশিংটনের সাথে এক ধরনের দূরত্ব তৈরি হচ্ছে।

তবে তুরস্ক-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক খুব বেশি শীতল হওয়ার পেছনে রয়েছে ২০১৬ সালের ১৫ জুলাইয়ের ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থান। রিসেপ তায়েপ এরদোগানের সরকার মনে করে অভ্যুত্থানচেষ্টাকারীদের সাথে মার্কিনীদের সংযোগ ছিল। কারণ, বিদ্রোহী সেনা কর্মকর্তাদের বেশিরভাগ নিয়োজিত ছিলেন তুরস্কে মার্কিন বিমান ঘাঁটি ইনজিরিলিকে। এরপর যখন অভ্যুত্থানের নেপথ্য কারিগর হিসেবে অভিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত আধ্যাত্মিক নেতা ফেতহুল্লাহ গুলেনকে প্রত্যাবাসনে মার্কিন কর্তৃপক্ষ রাজি হচ্ছে না, তখন ওয়াশিংটনের প্রতি আংকারার আস্থার সংকট ‍চুড়ান্ত রূপ ধারণ করে।

অন্যদিকে ব্যর্থ অভ্যুত্থানের সময় এরদোগানের পাশে রাশিয়ার দাঁড়ানো ক্রেমলিনের প্রতি আংকারাকে ঝুঁকতে উৎসাহ জুগিয়েছে। এছাড়া সিরিয়ায় কুর্দিদেরকে পেন্টাগনের অব্যাহত অস্ত্র সরবরাহ তুরস্ককে ক্ষুব্ধ করছে। স্বাধীনতাকামী কুর্দিদের সাথে এরদোগান সরকার দেশের ভেতরে রীতিমতো যুদ্ধে লিপ্ত। সীমান্তবর্তী সিরীয় কুর্দিদের প্রতি মার্কিন সমর্থন তুরস্কের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি হয়ে উঠছে। তাই সিরিয়ায় মার্কিন নীতির বিপরীতে অবস্থান করা রাশিয়াকে বেছে নিতে হচ্ছে আংকারার।

সৌদি আরবের রাশিয়ার প্রতি আগ্রহী হওয়ার প্রধান কারণ আঞ্চলিক রাজনীতিতে ইরানের উত্থান এবং তেহরানের সাথে মার্কিনীদের সম্প্রতিক ‘নরম’ নীতি। এমনটাই মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ গ্রিগোরি কোসাক। গত সপ্তাহে নিউইয়র্ক টাইমসকে গ্রিগোরি বলেন, ওয়াশিংটন যেমন তেহরানের কাছে ঘেঁষছে, রিয়াদ চাচ্ছে ক্রেমলিনের নৈকট্য পেতে। এর মাধ্যমে আঞ্চলিক রাজনীতিতে ভারসাম্য আনতে চায় সৌদিরা। রিয়াদের ঘোর বিরোধিতা সত্ত্বেও ইরানের সাথে পরমাণু চুক্তি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এতে নানা নিষেধাজ্ঞা-অবরোধ থেকে মুক্ত হওয়া ইরান নতুনভাবে শক্তি সঞ্চয় করতে শুরু করবে বলে শঙ্কা সৌদি আরবের।

আর রাশিয়া সিরিয়াতে বাশারকে শঙ্কাহীন রাখতে যুদ্ধ পরিস্থিতির সমাপ্তি চায়। এজন্য সৌদিসহ অন্যান্য শক্তিগুলোকে সাথে পাওয়া প্রয়োজন। ফলে দুই পক্ষই নিজেদের স্বার্থে ঝুঁকছে একে অন্যের প্রতি।

বাণিজ্যও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে দেশ দুটিকে কাছে আনতে। সৌদি ও রাশিয়া বিশ্বের শীর্ষ দুই তেল উৎপাদনকারী দেশ। গত কয়েক বছরে তেলের দাম পড়তির কারণে দুই দেশই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উৎপাদন সীমিত করে তেলের বাজার স্থিতিশীল রাখতে ২০১৪ সালে সৌদি ও রাশিয়া উদ্যোগে একটি চুক্তি হয়েছিল। সফল সেই চুক্তি দেশ দুটিকে আরো কাছাকাছি করেছে।

/কিউএস




Leave a reply