সেই জজ মিয়ার সাক্ষাৎকার

|

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার বহুল আলোচিত নাম জজ মিয়া। এটা তার আসল নাম নয়। প্রকৃত নাম মো. জালাল। কিন্তু ২০০৫ সালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হওয়ার পর তাকে জজ মিয়া হিসেবে উপস্থাপন করে পুলিশ।

এরপর সারা দেশের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন জজ মিয়া। ২০০৫ সালের জুনে যে জজ মিয়া নাটক মঞ্চস্থ করা হয়, সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৬ সালে তা ফাঁস হয়ে যায়। ২০০৯ সালের ২৬ জুলাই জেল থেকে মুক্তি পান জজ মিয়া।

এরপর থেকে তিনি থাকার চেষ্টা করেছেন একান্ত নিভৃতে, লোক-চক্ষুর অন্তরালে। আজ ভয়াবহ সেই গ্রেনেড হামলার রায় ঘোষণা করা হবে। রায়ের আগেরদিন মঙ্গলবার যুগান্তরের সঙ্গে আলাপচারিতায় তিনি তার ব্যক্তিগত জীবন ও রায়কে ঘিরে প্রত্যাশার কথা ব্যক্ত করেন।

জজ মিয়া বলেন, ‘যারা গ্রেনেড হামলার সঙ্গে জড়িত, কেবল তাদেরই যেন সাজা দেয়া হয়। আমি তাদের মৃত্যুদণ্ড চাই। কেবল দণ্ড দিলেই হবে না, অবিলম্বে তাদের ফাঁসি কার্যকর দেখতে চাই।’ জালাল থেকে কীভাবে জজ মিয়া হলেন- জানতে চাইলে তিনি বলেন, পুলিশের ওই সময়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা যেভাবে মামলা সাজিয়েছে, সেভাবে আমার নামও সাজিয়েছে।

যে কর্মকর্তারা আমাকে মামলায় আসামি করেছিল, তারাই ওই গ্রেনেড হামলার সঙ্গে জড়িত। এর সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক যোগসাজশ আছে কি না, তা আমি বলতে পারব না। তবে ওইসব কর্মকর্তা নিশ্চয়ই বিষয়টি জানেন। সরকারের উচ্চ মহল অবশ্যই তাদের জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে ঘটনার পুরো রহস্য জেনেছে।

জজ মিয়া বলেন, অনেকেই আমাকে অনেক ধরনের আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু ১৩-১৪ বছরে কোনো আশ্বাস বাস্তবায়ন হয়নি। তাই আমাকে এখন রেন্ট-এ-কারের একটি ভাঙাচোরা গাড়ি চালাতে হয়। সরকারের কাছে প্রত্যাশা, আমার যেন পুনর্বাসন করা হয়।

আমি একটি চাকরি চাই। তিনি বলেন, আমার পরিচয় জানার পর (জেল থেকে বের হওয়ার পর) কেউই আমার কাছে মেয়ে বিয়ে দিতে রাজি হয়নি। সবাই মনে করে, সরকার বদল হলে আমাকে ফের জেলে যেতে হবে। দুই বছর আগে পরিচয় গোপন করে চাঁদপুরের এক মেয়েকে বিয়ে করি।

কিন্তু আমি গ্রেনেড হামলা মামলার আসামি ছিলাম, এটা জানার পর বিয়ের ৩-৪ মাস পর স্ত্রী আমাকে ছেড়ে চলে যান। পরে বছরখানেক আগে সুফিয়া নামের একজনকে বিয়ে করি। সে এখন অন্তঃসত্ত্বা। দুইটি কিডনি নষ্ট হয়ে আট মাস আগে আমার মা জোবাদা খাতুন মারা গেছেন।

টাকার জন্য ঠিকমতো মায়ের চিকিৎসা করাতে পারিনি। মামলায় জড়িয়ে পড়ায় মা আমার জন্য গ্রামের ভিটেমাটি বিক্রি করে দেন। অথচ তার জন্য তেমন কিছু করতে পারলাম না। এ কষ্ট আমি কোথায় রাখব?

জজ মিয়া বলেন, ছোট বোন খোরশেদা (২০), স্ত্রী সুফিয়াকে নিয়ে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে দুই রুমের একটি বাসায় থাকি। আমার পরিচয় জানার কারণে কেউ আমার বোনকে বিয়ে করতে চায় না। তিনি বলেন, গ্রেফতারের পর পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ- সিআইডির তিন কর্মকর্তা আমাকে বলেছিল, ‘আমরা তোকে রাজসাক্ষী বানাব।

যেসব কথা শিখিয়ে দেব, আদালতে তা-ই বলবি। যাদের নাম বলতে বলব তারা বড় সন্ত্রাসী। জেল থেকে বের হলে তারা তোকে মেরে ফেলতে পারে। তাই জেল থেকে বের হওয়ার পর তোকে সপরিবারে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেব। সেখানে তুই আরাম-আয়েশে থাকবি।’ সিআইডি কর্মকর্তাদের চাপে পড়ে আদালতে ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে তাদের শিখিয়ে বক্তব্য উপস্থাপন করেছিলাম।

সাক্ষাৎকারে জজ মিয়া বলেন, বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকেও আমাকে অনেক আশ্বাস দেয়া হয়। একাধিক মন্ত্রী আমাকে চাকরি দেয়ার আশ্বাস দেন। সব শেষ মাসছয়েক আগে এক মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করি। তিনি বলেন, গ্রেনেড হামলা মামলার রায়ের পর তিনি তার দফতরে চাকরি দেবেন। কাল (বুধবার) যেহেতু রায়, দেখি কী হয়।

ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার পর ঘটনা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে ২০০৫ সালের ৯ জুন গ্রামের বাড়ি থেকে গ্রেফতার করা হয় জজ মিয়াকে। ১৭ দিন রিমান্ডে রেখে জজ মিয়াকে দিয়েই গ্রেনেড হামলার ঘটনায় ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি আদায় করা হয়।

জবানবন্দিতে জজ মিয়া বলেছিলেন, ‘পাঁচ হাজার টাকার বিনিময়ে বড় ভাইদের নির্দেশে আমি অন্যদের সঙ্গে গ্রেনেড হামলায় অংশ নেই। বড় ভাইয়েরা হচ্ছেন সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন, জয়, মোল্লা মাসুদ ও মুকুল।’ ২০০৬ সালে নাটক ফাঁস করে দেন জজ মিয়ার বোন খোরশেদা ও মা জোবেদা।

নাটকের কারিগর হিসেবে সিআইডির তৎকালীন বিশেষ পুলিশ সুপার রুহুল আমিন, সহকারী পুলিশ সুপার মুন্সি আতিক ও আবদুর রশীদের নাম বলেন তারা। স্মৃতিচারণ করে জজ মিয়া বলেন, ‘আমি শাপলা চত্বর এলাকায় ফলের ব্যবসা করতাম। ২-৩ মাস পর পর বাড়িতে যেতাম। আমাকে গ্রামের বাড়ি নোয়াখালীর সেনবাগ থেকে গ্রেফতার করা হয়। প্রথমে নেয়া হয় সেনবাগ থানায়।

একটা নতুন গামছা কিনে এনে আমার চোখ বেঁধে ফেলা হয়। পুলিশ আমাকে বলে, আমাদের কথা শুনলে তুই প্রাণে বাঁচতে পারবি। না হলে তোকে ক্রসফায়ারে দেব। থানায় নির্যাতন শেষে ওই রাতেই সেনবাগ থানা থেকে আমাকে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়।’

তিনি বলেন, ‘আমাকে গ্রেফতারের পর প্রতিমাসে আমার মাকে সিআইডি কর্মকর্তারা ৪-৫ হাজার করে টাকা দিতেন। মা ও বোন সেটি ফাঁস করে দেয়ার পর সিআইডির তিন কর্মকর্তা জেলখানায় গিয়ে আমার সঙ্গে দেখা করেন। তারা বলেন, আমরা তোমাকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম।

তোমার মা ও বোন আসল কথা বলে দিয়েছে। এখন দেখি তোমাকে বাঁচায় কে?’ এরপর থেকে সিআইডির পক্ষ থেকে আমার পরিবারকে টাকা দেয়া বন্ধ হয়ে যায়।

প্রসঙ্গত, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বিকালে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের জনসভায় ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার ঘটনা ঘটে।

(সূত্র: দৈনিক যুগান্তর)


সম্পর্কিত আরও পড়ুন





Leave a reply