জীবনে ফেরার গল্প: বন থেকে ভয় উঠে গেলে ব্যবসা হবে কী করে?

|

সুন্দরবন বাংলাদেশের প্রাণ। ঝড়-ঝঞ্ঝা থেকে এই ব-দ্বীপ অঞ্চল রক্ষার প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যুহ। শ্বাপদসংকুল এ অরণ্যের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করে লাখ লাখ মানুষ। নিরন্তর সংগ্রাম করে চলা এই বনজীবীদের কাছে আতঙ্কের নাম একেকটি দস্যুবাহিনী। সুখের কথা, এই দস্যুবাহিনীগুলো একে একে আত্মসমর্পণ করছে, আইনের কাছে নিজেদের সোপর্দ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসছে। আর এই আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়াটিতে মধ্যস্থতা করেছেন একজন সাংবাদিক। তিনি মোহসীন-উল হাকিম। ধারাবাহিকভাবে লেখছেন তার বিচিত্র অভিজ্ঞতার গল্প। যমুনা অনলাইনের পাঠকদের জন্য তা তুলে ধরা হলো।

খুলনা থেকে চুকনগর যাওয়ার পথে পড়ে দলিত হাসপাতাল। সেখান থেকে বামের মেঠো পথ ধরে কিছুটা এগিয়ে যে গ্রামটি শুরু, তার প্রথম বাড়িটি সেরাজুলের। বাড়ি ফেরার পর বাবার এই জমিতে আলাদা ঘর তুলেছে সাবেক বনদস্যু সেরাজুল। নিজের একটু জমি আছে। সেই জমিতে এখন নিজেই ফসল ফলায়। দুটি গরু আছে, আর আছে একটি ছাগল। এরই মধ্যে বিয়েও করেছে সে। ছোট্ট ঘরে এই নিয়েই চলছে সেরাজুলের সংসার। চলছে জীবনে ফেরার চেষ্টা…

২০১৩ সালের কথা। ইলিয়াস বাহিনী তখন সুন্দরবনের সবচেয়ে প্রভাশালী দস্যুবাহিনী। তিনটি বড় বড় ট্রলারে অন্তত ৬০ জনের সেই দস্যু বাহিনীর একজন কনিষ্ঠ সদস্য ছিল সেরাজুল। একনলা একটি বন্দুক হাতে টুকটাক কাজ করাই ছিল তার দায়িত্ব। সেই ৫ বছর আগের কথা বলছিলাম। এরপর দল ভেঙ্গে যায়। জাহাঙ্গীর বাহিনীর সঙ্গে সে চলে আসে সুন্দরবনের আরেক এলাকায়। ততদিনে দস্যু হিসেবে তার নাম ছড়িয়ে গেছে। বাড়ি ফেরার উপায় ছিল না আর।

এরই মধ্যে আত্মসমর্পণ শুরু হয়ে যায়। কিন্তু জাহাঙ্গীর আত্মসমর্পণে রাজি ছিল না। সেই নিয়ে মতবিরোধ। তারপর দল ছেড়ে সেখান থেকে অস্ত্র-গুলি নিয়ে পালিয়ে আসে সেরাজুলসহ কয়েকজন। ছোট রাজুর নেতৃত্বে কেরু সুমন, ম্যাজিক বিল্লাল, আমজাদ সরদার, ফরহাদ সরদারসহ কয়েকজন মিলে নতুন বাহিনী গঠন করে। তখনই দলের পক্ষ থেকে এই সেরাজুল আমার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করে।

মাস খানেকের মধ্যেই আত্মসমর্পণের জন্য প্রস্তুত হয় তারা। এরপর পূর্বনির্ধারিত সময়ে পূর্ব সুন্দরবনের চরাপুটিয়ার ভেতর থেকে তারা র‍্যাবের হেফাজতে যায়। সেই অভিযানের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সেই সময়ের র‍্যাব-৮’র অধিনায়ক লে. কর্নেল আনোয়ারুজ্জামান, সঙ্গী ছিলেন উপ-অধিনায়ক মেজর আদনান কবীর। আমার সঙ্গী হিসেবে সেবার গিয়েছিলেন সুফিয়ান ভাই (সাংবাদিক আবু সুফিয়ান), আর সব সময়ের সঙ্গী পলিন (বায়েজীদ ইসলাম পলিন) তো ছিলেনই। মাস্টার বাহিনীর আত্মসমর্পণ করা সদস্য সুমন ভাইও সেবার আমাদের সঙ্গী হয়েছিলেন। সুন্দরবনে আমার চলার পথের সব সময়ের সঙ্গী বেলায়েত ভাইয়ের ট্রলারে চড়েই সেই অভিযানে গিয়েছিলাম আমরা।

রাতে চরাপুটিয়া অফিসের সামনে র‍্যাবের লঞ্চটি রেখে আমরা এগিয়ে যাই দক্ষিণের খাল ধরে। শীতের রাত ছিল। কুয়াশায় দেখতে বেশ সমস্যা হচ্ছিল। তারপরও খাল ধরে এগিয়ে যাই ঘণ্টাখানেক। রাতের বেলা সচরাচর টর্চের আলো দিয়ে দস্যুদের সঙ্গে সংকেত আদান প্রদান হয়। কুয়াশার কারণে সে কাজেও অনিশ্চয়তা ছিল। কুয়াশা এতই ঘন ছিল যে একটু দূরত্বের কোনো কিছুই দেখতে পাচ্ছিলাম না আমরা। এসব চিন্তা করতে করতেই আলোর সংকেত পেলাম। পাল্টা সংকেত পাঠালাম। বোঝাপড়া শেষ। তারপর ট্রলার ভিড়িয়ে দিলাম তাদের সামনে।

তারপর মিনিট দুয়েকের কাজ। দ্রুত তাদের ট্রলারে উঠিয়ে ফেরত আসি আমরা। কারণ, চরাপুটিয়ার সেই খালটির অপর পাশ উন্মুক্ত ছিল। রাতের অন্ধকারে সে পথ ধরে যেকোনো ধরনের অঘটন ঘটে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। বন বিভাগ কিংবা কোস্ট গার্ডের হামলার শঙ্কা যতটা না ছিল, তার চেয়ে বেশি দুশ্চিন্তা ছিল প্রতিপক্ষ জাহাঙ্গীর বাহিনীকে নিয়ে। তাই দ্রুত তাদের নিয়ে ফিরে আসি র‍্যাবের লঞ্চের কাছে।

র‍্যাবের মাধ্যমে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে আত্মসমর্পণের পর জেলখানা হয়ে জামিন নিয়ে এলাকায় ফিরে সেরাজুল। গ্রামের আত্মীয় স্বজন আর প্রতিবেশীরা তাকে স্বাগত জানায়। সেরাজুল এখন পুরোদস্তুর গৃহস্ত। চাষাবাদ, গরু-ছাগলের পরিচর্যা করেই কাটছে তার এক একটা দিন।

চাষাবাদ, গরু-ছাগলের পরিচর্যা করেই কাটছে সেরাজুলের এক একটা দিন।

এদিকে, স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা। তাই সব কাজের বাইরে স্ত্রীর যত্নেরও ত্রুটি করছে না সে। সেরাজুলকে সেদিন বললাম, ৫ বছরের দস্যু জীবনে অসংখ্য গরীব জেলেদের অত্যাচার করেছ তুমি। অন্যায় করেছ গরীব জেলেদের সঙ্গে, খারাপ লাগে না? সেরাজুল কোনো উত্তর দিল না। শুধু বললো, অপরাধ করে ফেলেছে।

দস্যুতার টাকা কোথায় এমন প্রশ্নের উত্তরে সেরাজুল বলল, বন থেকে শুধু বনদস্যু নামটি নিয়ে এসেছে। জমানো কোনো টাকা নাই তার। তাহলে দস্যুতার টাকা কোথায় গেল? সেরাজুল আবারও নিরুত্তর।

এই প্রশ্নের উত্তর আমার জানা আছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীরও তা জানা আছে। তবে, তারা সাদা পোশাকের ভদ্রলোক হিসেবে সমাজে পরিচিত। আর তাদের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা না নিলে সুন্দরবন আবারও সন্ত্রস্ত হয়ে পড়বে কয়েক বছরের মধ্যে।

সুন্দরবনে আবারও অস্ত্রের ঝনঝনানি ফিরে আসুক সেটা আমরা চাই না। তবে কেউ কেউ চায়। যাদের কাছে দস্যুতার টাকা যায়, তারাই চায় সুন্দরবন ফিরে যাক আগের সন্ত্রস্ত চেহারায়। কারণ, তারা করে ভয়ের ব্যবসা। বন থেকে ভয় উঠে গেলে তাদের ব্যবসা হবে কী করে?

লেখক: বিশেষ প্রতিনিধি, যমুনা টেলিভিশন
যমুন অনলাইন: এমএইচ/টিএফ









Leave a reply