খেলাধুলা

দেশের ফুটবল তাহলে পথ হারায়নি!

By Toaha Faroque

August 28, 2018

আহমেদ রাকীব

প্রায় সাড়ে ২০ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার মাঠ নীলফামারীর শেখ কামাল স্টেডিয়াম। এখানেই হবে সাফ ফুটবলের আগে বাংলাদেশের একমাত্র প্রস্তুতি ম্যাচ। প্রতিপক্ষ শ্রীলঙ্কা। বুধবার অনুষ্ঠিতব্য ম্যাচটিকে এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচের স্বীকৃতি দিয়েছে ফুটবলের নিয়ন্তা সংস্থা ফিফা। আগের দিন সৈয়দপুর বিমানবন্দরে পৌঁছে উত্তরবঙ্গের ফুটবলপ্রেমীদের উষ্ণ অভ্যর্থনা পেয়েছে অতিথি শ্রীলঙ্কা। স্থানীয় স্কুলের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের উপস্থিতি নিশ্চয়ই অবাক করেছে খোদ লঙ্কানদেরও। তাদের দলের এমন কোনো তারকা নেই যাকে দেখতে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে হবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা।

সবচেয়ে বড় বিস্ময় অপেক্ষা করছিল বোধকরি বাংলাদেশ দলের জন্য। কোচ জেমি ডে আগেই জানিয়েছিলেন এই প্রীতি ম্যাচের একাদশে থাকবে সিনিয়রদের আধিক্য। তার মানে মামুনুল-ওয়ালী ফয়সালরা খেলছেন তা নিশ্চিত। এশিয়ান গেমসে চমক জাগানিয়া দলের বেশিরভাগই থাকছেন ডাগআউটে। ঘরোয়া ফুটবল আর গণমাধ্যমের কল্যাণে নিশ্চয়ই সিনিয়রদের প্রায় সবাই পরিচিত উত্তরবঙ্গের ফুটবলপ্রেমীদের জন্য। ঘরের ছেলেদের জন্য তাই ভালোবাসাটা একটু বাড়াবাড়ি পর্যায়েরই ছিল।

আমার বিস্ময় অন্যখানে। গেলো একযুগেরও বেশি সময় ধরে গণমাধ্যমে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি দর্শক শূন্য ফুটবল ম্যাচ। একমাত্র সুপার কাপ ফুটবলে আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচ ছাড়া আর কখনো ফুল হাউজ বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম দেখার সৌভাগ্য হয়নি। জায়ান্টদের ম্যাচেও হাতেগোনা দর্শকের উপস্থিতি নিশ্চয়ই মানহীন ফুটবলের মান আরও নিচে নামিয়ে দেয়। তবে, চোখ খুলে দিলো নীলফামারী আর উত্তরবঙ্গের দর্শক। প্রায় সাড়ে ২০ হাজার দর্শক ক্ষমতার শেখ কামাল স্টেডিয়ামে প্রায় দ্বিগুণ দর্শক নিশ্চয়ই মাঠে থাকবে বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা ম্যাচে। ঢাকা ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, উত্তরা ব্যাংকের ১১টি শাখায় বিক্রি হয়েছে ম্যাচের টিকিট। প্রথম দিনের বরাদ্দ ছিলো সাড়ে ১২ হাজার টিকিট। চোখের পলকে শেষ হয়ে গেছে সব টিকিট। মাঠে বসে ম্যাচ দেখার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করেছেন ফুটবলপ্রেমীরা। দ্বিতীয় দিনের জন্য বরাদ্দকৃত ৫ হাজার টিকিট শেষ হতে সময় লেগেছে সর্বোচ্চ ঘণ্টাখানেক।

সাধারণ গ্যালারিতে নারী দর্শকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে সংরক্ষিত রাখা হয়েছে ১ হাজার আসন। ১৯ হাজার পুরুষ দর্শক মাঠে বসে খেলা দেখার সুযোগ পাবেন সাধারণ গ্যালারিতে। সাধারণ গ্যালারির টিকিটের দাম ধরা হয়েছে ১’শ টাকা। তার মানে ২০ হাজার সাধারণ গ্যালারির টিকিট বিক্রি থেকে আয় হবে ২০ লাখ টাকা। ভিআইপি গ্যালারিতে মোট আসন ৩৬৯। প্রতিটি টিকিটের মূল্য ১ হাজার টাকা। তারমানে ভিআইপি আর সাধারণ গ্যালারি মিলিয়ে প্রায় ২৪ লাখ টাকায় টিকিট বিক্রি হবে।

অতীত অভিজ্ঞতা বলে, ঢাকার বাইরে ফুটবল মানেই ধারণক্ষমতার চেয়েও কয়েকগুণ বেশি দর্শক শেষ পর্যন্ত মাঠে বসে খেলা দেখেন। নিরাপত্তা ব্যবস্থা অতোটা শক্ত না হওয়ার সুবিধা নেন অনেকে। তাতে অবশ্য আমার আপত্তি নেই, বরং খুশি। মাঠে বসে প্রায় ৪০ হাজার দর্শক যখন এক সঙ্গে গগনবিদারী চিৎকারে প্রিয় দলকে সমর্থন জুগাবেন তখন নিশ্চয়ই মনোবলের দিকে অনেকটা এগিয়ে থাকবে বাংলাদেশ দল। মানসিকভাবে সেখানেই হয়তো পিছিয়ে থাকবে অতিথি শ্রীলঙ্কা।

এবার আসল কথায় আসি। মানহীন ফুটবলের সঙ্গে প্রযুক্তি, ইন্টারনেট, স্যাটেলাইট চ্যানেলের দাপটের খেসারত গুনছে ফুটবল। যে কারণে মাঠে বসে খেলা দেখার আগ্রহ হারিয়েছে ঢাকার দর্শকরা। এমন অভিযোগ শুনে অভ্যস্ত আমরা। কিন্তু, প্রকৃত সত্য কেউ খুঁজে দেখার প্রয়োজন মনে করেনি। পেশাদার ফুটবলে অংশ নেয়া ১২ ক্লাবের সবার হোম ভেন্যু বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম। লিগের ১৩২ ম্যাচের হোস্টও বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম। রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে নাম সর্বস্ব লিগ শেষ করতে পারলেই যেনো খুশি সব মহল। কিন্তু, ঢাকার বাইরে কেউ যেতে রাজি নন। খরচ বেশি। শুধুমাত্র টিকিট বিক্রি করে ১ ম্যাচ থেকেই যদি নীলফামারীতে আয় হয় প্রায় ২৪ লাখ টাকা, তাহলে এমন অভিযোগের ভিত্তি কী? কারণ একটাই, ক্ষমতার দাপটে যারা ক্লাবের চেয়ার দখলে রেখেছেন বছরের পর বছর, তাদের আসলে এতো সময় নেই। অথচ, ঢাকায় ম্যাচ হলেও যে তারা মাঠে বসে খেলা দেখেন ব্যাপারটা সেরকম না।

পেশাদার ফুটবলে পা রাখার ১ দশক হয়েছে কিন্তু ক্লাবগুলোকে বিন্দুমাত্র পেশাদার করতে পারেনি বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন। অনুনয়-বিনয় করেও তাদের ঢাকার বাইরে নিতে পারেনি। যদিও বা বিভিন্ন সময় কয়েকটি দল ঢাকার বাইরে খেলতে রাজি হয়েছিল, নানা অজুহাতে ঠিকই ঢাকায় ফিরেছে। দিনের পর দিন বার্সেলোনা-রিয়াল মাদ্রিদ যদি সান্তিয়াগো বার্নাব্যু কিংবা ন্যু ক্যাম্পে ম্যাচ খেলে, তাহলে সেখানেও দর্শক খড়া হতে বাধ্য। রিয়াল মাদ্রিদ কিংবা বার্সেলোনা শহরের মানুষের আসলে ফুটবল দেখা ছাড়াও পেট চালানোর জন্য আরও অনেক কিছু করতে হয়। এই সহজ বিষয় তামাম দুনিয়ার সেরা ক্লাব কিংবা সংস্থা বুঝলেও বুঝি না কেবল আমরা।

লেখক: বিশেষ প্রতিনিধি, যমুনা টেলিভিশন