তাঁতবস্ত্রের চাহিদা কম; বন্ধ হচ্ছে কারখানা

|

সনম রহমান, পাবনা:

দেশে ও বিদেশে তাঁতবস্ত্রের চাহিদা কমে যাওয়ায় পাবনা অঞ্চলের তাঁত মালিকরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। উৎপাদিত তাঁতবস্ত্র বিক্রিতে অব্যাহত লোকসানে মালিকরা তাঁত কারখানা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। পুঁজি হারিয়ে অনেকেই পেশা বদল করে অন্য পেশায় চলে গেছেন। হাজার হাজার তাঁত শ্রমিক বেকার হয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে কষ্টে জীবন যাপন করছেন।

তাঁত কারখানা মালিকরা বলছেন, এভাবে লোকসান অব্যাহত থাকলে তাঁত শিল্প এবং এ শিল্পের সাথে জড়িতরা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিদেশে রফতানি এবং দেশে চাহিদা কমে যাওয়ায় তাঁত বস্ত্রের বাজার দর প্রতিদিনই নিম্নমুখী হচ্ছে। সরকারিভাবে পদক্ষেপ না নেয়া হলে ভবিষ্যতে এ অবস্থা আরও প্রকট আকার ধারণ করবে।

অনেকেই মত প্রকাশ করে বলছেন, এখন সকল শ্রেণী পেশার নারীরা সালোয়ার কামিজ বেশি ব্যবহার করায় শাড়ির ব্যবহার কমে গেছে। আর কারণেই এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

তাঁত কারখানা মালিক ও ব্যবসায়ীদের সূত্রে জানা গেছে, দেশে বিদেশে তাঁতবস্ত্রের চাহিদা কমে যাওয়ায় তাঁতে উৎপাদিত শাড়ি লুঙ্গির বিক্রি প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। উৎপাদিত পণ্য লোকসানে বিক্রি করে তাঁতিরা পুজি হারাচ্ছেন। বিশেষ করে প্রান্তিক তাঁতিরা চরম বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছেন। ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে অনেকেই তাঁত বিক্রি করে পোষাক শিল্পে, কেউ বা মাটি কাটা শ্রমিক আবার কেউ রিক্সা চালকের কাজ নিয়েছেন। কেউ কেউ পুঁজি হারিয়ে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।

বর্তমানে পাবনা অঞ্চলের প্রায় অর্ধেক তাঁত বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে ঋণগ্রহীতরা তাদের ঋণের টাকা পরিশোধ করতে পারছেন না। তাঁত বিক্রি করতে না পেরে অনেকেই তাঁতের কাঠ জ্বালানি হিসেবে, লোহা ভাঙ্গড়ির দোকানে বিক্রি করছেন।

বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের পাবনার সাঁথিয়ার বেসিক সেন্টর সূত্রে জানা গেছে, পাবনা তাঁত সমৃদ্ধ জেলা হিসেবে পরিচিত। জেলার সাঁথিয়া, সুজানগর, বেড়া উপজেলায় তাঁতের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। ২০০৩ সালের তাঁত বোর্ডের জরিপ অনুযায়ী হস্তচালিত তাঁতের সংখ্যা ৫৫ হাজার এবং বিদ্যুৎ চালিত পাওয়ারলুমের সংখ্যা প্রায় ২২ হাজার। এই তাঁত শিল্পের সঙ্গে জড়িত রয়েছে প্রায় দেড় লাখ শিশু, নারী ও পুরুষ। তাঁত শিল্পকে কেন্দ্র করে শাহজাদপুর ও আতাইকুলায় কাপড়ের হাট গড়ে উঠেছে।

স্থানীয় বিভিন্ন প্রাইভেট ব্যাংকে খোঁজ নিয়ে এবং কাপড় ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, আতাইকুলা ও শাহজাদপুর হাটে প্রতি সপ্তাহের চারদিন কাপড় বিক্রি হয়ে থাকে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে কাপড় ব্যবসায়ী ও দোকান মালিকরা এই হাটে এসে শাড়ি, লুঙ্গি ক্রয় করে থাকেন। প্রতিহাটে ভারতে শাড়ি ও লুঙ্গি রফতানি হয়। প্রতি হাটে ব্যাংক ও নগদসহ প্রায় দুই শত কোটি টাকার লেনদেন হতো। বর্তমানে কাপড় ক্রয়-বিক্রয়, রফতানি ও ব্যাংক লেনদেন অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে। সেই সঙ্গে খেলাপী ঋণের সংখ্যা বাড়ছে।

বেড়ার রাকশা গ্রামের নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন তাঁত মালিক জানান, পুঁজি হারিয়ে তাঁত বিক্রি করে দিয়ে রাতের আধারে গ্রাম ছেড়ে চলে এসেছি। এলাকায় এক সময় প্রচুর দাপট ছিলো। অনেক দরিদ্র মানুষকে সহায়তা করেছি। এখন নিঃস্ব হয়ে মানসম্মানের ভয়ে বাধ্য হয়ে এলাকা ছেড়েছি।

বেড়ার হাতিড়াগাড়া গ্রামে ৫টি কারখানায় প্রায় ২০০ শতাধিক তাঁত বন্ধ রয়েছে। তাঁতী শফিকুল ইসলাম জানান, দীর্ঘ ৪০ বছরের ব্যবসা জীবনে এমন ভয়াবহ অবস্থা কোনদিন দেখিনি। কাপড় বিক্রি করে শ্রমিকের মজুরির টাকাই জোগাড় হচ্ছেনা। গুদামে লাখ লাখ টাকার কাপড় মজুদ হয়ে আছে। জমি বিক্রি করে ব্যাংকের সুদের ১৬ লাখ টাকা দিয়েছি। মোট ৩০৪ টি তাঁতের মধ্যে মাত্র ৯৫টি তাঁত চালু রেখেছি।

রফতানিকারক মেসার্স রায় ট্রেডার্স এর স্বত্বাধিকার নিত্য নন্দ রায় বলেন, শুল্কমুক্ত হওয়ায় তিন বছর আগে ছয়টি রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান আতাইকুলা ও শাহজাদপুরের হাট থেকে প্রতি সপ্তাহে চার লাখ পিচ শাড়ি ও লুঙ্গি ভারতে রফতানি করতো। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপেও কাপড় রফতানি হতো। গত ৩ বছর ধরে ভারতের রাজ্য সরকার ছয় শতাংশ শুল্ক আরোপ এবং ভারতে বাংলাদেশে ডলারের মূল্যমানে ব্যবধানের কারণে রফতানির পরিমাণ অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে। সরকারিভাবে পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া না হলে এই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।

আতাইকুলা হাটের একাধিক বাণিজ্যিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপক জানান, গত তিন বছরের অনুপাতে বর্তমানে লেনদেন অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে। বেশিরভাগ তাঁতমালিকরা শুধু লুঙ্গি তৈরি করে থাকেন। অন্য কোন কাপড় তারা তৈরি করেন না। সে কারণে বাজার মন্দা হওয়ায় লোকসান হচ্ছে তাদের। উৎপাদিত কাপড় কমমূল্যে, বাকিতে এবং চেকের মাধ্যমে বিক্রি করায় ব্যাংকে টাকা জমা দিতে পারছেন না তারা। সে কারণে খেলাপী ঋণের সংখ্যাও বাড়ছে।









Leave a reply