অধিনায়ক, কোচ- এক ম্যাচে দুই ভূমিকায়ই মেসি!

|

সব জল্পনা কল্পনার অবসান হল শেষ পর্যন্ত। আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপে টিকে থাকলো এ যাত্রায়। এবং এর পুরো কৃতিত্বটা পাচ্ছেন লিওনেল মেসিই। নাইজেরিয়ার বিরুদ্ধে বাঁচা-মরার ম্যাচে ১৪ মিনিটেই অসাধারণ গোল করে চাপমুক্ত করেন দলকে। এরপর নিজেদের স্বাভাবিক খেলাই উপহার দেয় আকাশী রঙা জার্সিধারীরা।

যদিও হাভিয়ের মাসচারেনোর এক ফাউল থেকে পেনাল্টি হজম করে আবারও চাপে পড়ে যায় আলবিসেলেস্তরা। বিরতির পর খেলায় কিছুটা ছন্দ পতন ঘটে। আসলে এটা মাত্রাতিরিক্ত চাপের ফল। জিততেই হবে। কোনো বিকল্প নেই। ওদিকে গ্রুপের অন্য খেলাও চলছিলো তখন। ওখানে আইসল্যান্ড জিতে গেলে মেসিদের জয়ে গোলের ব্যবধানও হতে হবে বেশি। এসব নানা হিসেব নিকেশ। এতকিছু মাথায় রেখে স্বাভাবিক খেলা সম্ভব হয় না।

এমন সময় প্রয়োজন টিমমেটদের চাপমুক্ত রাখা, উৎসাহ দেয়া। মাঠে এই কাজটি করতে হয় সিনিয়র খেলোয়াড়দের। অধিনায়ককে তখন সত্যিকারের  নেতার পরিচয় দিতে হয়। আর্জেন্টিনা টিমে বেশিরভাগই এবার জুনিয়র খেলোয়াড়। চাপের মুখে এদেরকে আগলে রেখে সেরা খেলাটা বের করে আনা কঠিন।

কিন্তু লিও প্রমাণ করলেন টিমমেট হিসেবে নিজের সেরাটা খেলার সাথে সাথে সতীর্থদের সেরাটাও বের করে আনতে সক্ষম তিনি। প্রথমে গোল করে এগিয়ে রেখেছিলেন দলকে। কিন্তু এই ব্যবধান নিরাপদ নয়। যেকোনো মুর্হর্তে গোল পরিশোধ করে দিতে পারে মুসারা। (শেষ পর্যন্ত সেটাই হলো পেনাল্টিতে যখন সমতা ফেরানোর মাধ্যমে।) মেসি দলের তাই নতুন গোলের জন্য মরিয়া। বিরতির পর মাঠে নামার আগে আগে সব সতীর্থকে ডাকলেন কাছে। কথা বললেন মিনিট খানেক। অন্যরা মাথা নিচু করে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে শুনলেন সেই ব্রিফিং।

জয়সূচক গোলদাতা মার্কোস রোহো জানিয়েছেন অধিনায়ক তাদেরকে কী বলেছিলেন সেই সময়টাতে। ‘দ্বিতীয়ার্ধে মাঠে নামার আগে মেসি আমাদের সবাইকে সতর্ক করে দিয়েছিল। বলেছিল, গোল করা শুধু স্ট্রাইকারদের নয়, সবারই দায়িত্ব। সুতরাং আমরা যে যখনই সুযোগ পাবে, শট নিবে। কার পজিশন কি ওটা নিয়ে ভাববে না।’

রোহোকে উপরে ওঠে খেলতে বলেছিলেন মেসি। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের এই ডিফেন্ডার বলেন, ‘সে আমাকে ফরওয়ার্ডে উঠে আসতে বললো, এমনকি মাসচেরানোকেও। (অধিনায়ক) সবাইকে বলেছে এটা বাঁচা মরার লড়াই। আমাদেরকে গোল করতেই হবে। সুযোগ পেলেই কাজে লাগাতে হবে।’

অধিনায়কের কথা মতো কাজও করলেন ডিফেন্ডার রোহো। বল পেয়ে আর কোনো স্ট্রাইকারকে এগিয়ে দেয়ার অপেক্ষা করলেন না। ‘ যখন আমি দেখলাম বল আমার দিকে আসছে, আমার মাঝে যা আছে সবটুকু দিয়ে শট নিলাম। এবং সেটি পোস্টে ঢুকে গেল!’

নিজের নেতার প্রতি মুগ্ধতা ঝরে পড়লো রোহোর মন্তব্যে। ‘সে সত্যিকার অর্থে ম্যাচের মেজাজ আর ঝুঁকিটা বুঝতে পেরেছিলো। সে আসলেই নেতা, সেরা নেতা।’

অবশ্য মেসির নেতৃত্ব শুধু অধিনায়কত্বেই সীমাবদ্ধ ছিল না। গতকালের ম্যাচে কার্যত দলের কোচও ছিলেন তিনি-ই। ক্রোয়েশিয়ার সাথে ৩-০ তে হারার পরপরই গুঞ্জন উঠেছিল কোচ সাম্পাওলির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছেন মেসিরা। তার পরিকল্পনা ও খেলার ধরণ সিনিয়রদের পছন্দ নয়। নাইজেরিয়ার বিরুদ্ধে ম্যাচের আগে জানা গিয়েছিল, এই ম্যাচের সব পরিকল্পনা হবে মেসির মতো করে। বলতে গেলে ম্যানেজারের আপাতত দায়িত্ব তিনিই পালন করবেন!

আর্জেন্টাইন সংবাদমাধ্যম ডেইলি ওলে জানাচ্ছে, সুপার ঈগলদের বিরুদ্ধে আসলেই ‘ম্যানেজার’ ছিলেন লিও। পত্রিকাটির মতে, ৮০ মিনিটের সময় যখন ড্রয়ের শঙ্কায় রয়েছে  আলবিসেলেস্তরা, তখন সাম্পাওলি মাঠের কোণায় মেসির কাছে এসে জিজ্ঞেস করেন, ‘এখন কী করবো? আগুয়ারোকে কি নামাবো?’ মেসি তাৎক্ষণিকভাবে মাথা নেড়ে সম্মতি জানান। এর দুই মিনিটের মধ্যেই বদলি খেলোয়াড় হিসেবে নামেন সার্জিও আগুয়ারো।

মেসির কাছে কোচের অনুমতি চাওয়ার একটি ভিডিও টুইটারে ভাইরাল হয়েছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, মাঠে দাঁড়িয়ে থাকা মেসিকে ডেকে কিছু জিজ্ঞেস করছেন সাম্পাওলি। তখন মাথার ইশারায় ‘হ্যাঁ’ বাচক সম্মতি দিয়েছেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।

খেলোয়াড় হিসেবে অসাধারণ গোল দিয়েছেন। মাঠজুড়ে চষে বেড়িয়েছেন পুরো ম্যাচ। অধিনায়ক হিসেবে জুনিয়র সতীর্থকে গোল করতে অনুপ্রাণিত করেছেন। এমন উদাহরণ অবশ্য অন্য সেরা খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রে ইতিহাসে আরও অনেক পাওয়া যাবে। কিন্তু এগুলোর সাথে সাথে একই ম্যাচে ‘কোচ’ এর দায়িত্বও যে পরোক্ষভাবে পালন করেছেন মেসি! এমনটি নিশ্চয়ই ইতিহাসে বিরল। হয়তো আর কখনোও ঘটেনি!









Leave a reply