একা মেসি পারবেন না

|

লিওনেল মেসি। ফুটবলের এক ছান্দসিক জাদুকর। একাই বিশ্বকাপ জেতাবেন আর্জেন্টিনাকে। আলবিসেলেস্তে সমর্থকদের প্রত্যাশাটা যেন এমনই। আসলেই কি একক কৃতিত্বে বিশ্বকাপ ট্রফি উচিয়ে দীর্ঘ শিরোপা বন্ধ্যাত্ব ঘোচাতে পারবেন মেসি? অনেক ফুটবল বোদ্ধা বলছেন, না, কারণ মেসি ম্যারাডোনা নয়। তবে কি ম্যারাডোনা একাই বিশ্বকাপ জিতিয়েছিলেন আর্জেন্টিনাকে?

অনুশীলনে মেসিকে উদ্দেশ্য করে স্লোগান দেন ভক্তরা, ‘লিও ব্রিং ব্যাক দ্যা কাপ’। কেউ কেউ গানও বাঁধেন যার মূল কথা- মেসির হাত ধরে আমরা ভিক্টরি ল্যাপ দিবো। ক্রোয়েশিয়া ম্যাচের আগে অনেক সমর্থককে মেসিকে নিয়ে বাঁধা গান গাইতে শোনা গেছে।

১৯৮৬ সালে মেসির জন্মের আগে, কিংবদন্তী ডিয়েগো ম্যারাডোনার হাত ধরে আর্জেন্টিনার ঘরে সবশেষ কাপ আসে। সেই বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে হাতের স্পর্শে করা ম্যারাডোনার একটি গোল নিয়ে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা হয়েছিল। স্বয়ং ম্যারাডোনা নিজের হাতকে ‘হ্যান্ড অব গড’ ঘোষণা করেন। বলাই বাহুল্য, একই ম্যাচে ম্যারাডোনা আরেকটি গোল করেন যেটিকে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সেরা গোল বলে বিবেচনা করা হয়।

এরপর সেমিফাইনালে বেলজিয়ামের বিপক্ষে দুটি গোল করেন ডিয়েগো। ফাইনালে জর্জ বুরুচাগাকে দিয়ে করান জয়সূচক গোল। তবু বলা যায় না, ম্যারাডোনা একাই বিশ্বকাপ জিতিয়েছেন আর্জেন্টিনাকে। বিশ্বকাপজয়ী আর্জেন্টিনা দলে ছিলেন জর্জ ভালদানো, অস্কার রুগেরি এবং বুরুচাগার মতো সুপার খেলোয়াড়। কোচ কার্লোস বিলার্দো তিন জন সেন্টার ব্যাকের সমন্বয়ে সাজিয়েছিলেন সৃষ্টিশীল রক্ষণ পরিকল্পনা। প্রয়োজন অনুযায়ী ৫ জনের জমাট রক্ষণে রূপ নিত সেটি। আর্জেন্টিনার কোচ হোর্হে সাম্পাওলি এই পরিকল্পনার প্রয়োগ ঘটানোর চেষ্টা করছেন। ম্যারাডোনার ভূমিকায় থাকছেন মেসি। কিন্তু, বুরুচাগার ভূমিকায় কে থাকবেন? কোথায় মিলবে একজন লুইস ব্রাউন, একজন ভালদানো?

মেসির আর্জেন্টিনা তো ২০১৪ সালে কাপ হাতে নিয়েই ফেলেছিল। দলের বাকি খোলোয়াড়দের ব্যর্থতা সেবার চেখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছিল- এক মেসিতে হয় না। এই যুগে তো আরও না। এখন সবাই সবার সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। ম্যারাডোনা যুগে প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের এভাবে ব্যবচ্ছেদ করার সুযোগ থাকতো না কোচিং স্টাফদের সামনে। কিন্তু মেসির সব খেলাই টিভিতে দেখানো হয়। অনলাইনে সার্চ করলেই পাওয়া যায় তার শক্তিমত্তা আর দুর্বলতা ব্যবচ্ছেদের প্রয়োজনীয় উপাত্ত। ফলে, মেসিকে আরও কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয় তাতে কোনো সংশয় নেই। পাশাপাশি, এই সময়ে ফুটবল খেলার ট্যাকটিসেও ঘটেছে অনেক রূপান্তর। এখন প্রতিটি দল পজিশন ও রণকৌশল অনুযায়ী খেলোয়াড় খুঁজে নেয়। একক ব্যক্তির সোনার হরিণ শিকার অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে।

বার্সেলোনায় যে মেসিকে দেখে ফুটবল বিশ্ব প্রতিনিয়ত বিস্মিত হয়, সেই মেসিকে সমর্থন যোগানোর জন্য আছেন একপাল দক্ষ ও চৌকস খেলোয়াড়। সাম্পাওলি চেয়েছিলেন, আর্জেন্টিনা দলে মেসির জন্য এমন পরিবেশ সৃষ্টি করতে। কিন্তু আদতে কী হচ্ছে? ডি মারিয়ারা অনেক নির্জীব ফুটবল খেলছেন। মাঝমাঠে বল জোগানোর কাজটা করতে পারছেন না মিডফিল্ডাররা। সে চাপটা তো মেসিকেই নিতে হচ্ছে।

কিছুদিন আগে ম্যারাডোনা বলেছিলেন, আমি একাধারে ৫টা পেনাল্টিও মিস করেছিলাম, কিন্তু ডিয়েগো ম্যারাডোনাই ছিলাম। মেসির তার সামর্থ আনুযায়ী চেষ্টা করছে। তার দায়িত্ব পালন করেছে।

সাবেক আর্জেন্টাইন খেলোয়াড় হার্নান ক্রেসপো মেসিকে ১০-এর মধ্যে ৫ দিয়ে বলেছেন, আমরা তার কাছে আরও বেশি কিছু চাই। এটাও সত্য সে ম্যারডোনা নয়। তাছাড়া, বার্সেলোনায় সে যেমন জায়গায় ছিল, তেমন সঠিক জায়গা পেলে মেসি তার সেরাটা দিতে পারবে। অন্যথায়, সে স্ট্রাগল করবে।

তবে আশ্চর্যজনকভাবে মেসি সবচেয়ে বড় সমর্থন পেয়েছেন তার ক্লাব প্রতিদ্বন্দ্বী সার্জিও রামোসের কাছ থেকে। রিয়াল মাদ্রিদ তারকা রামোস বলেন, সর্বকালের সেরা আর্জেন্টাইন খেলোয়াড় হওয়ার দৌড়ে লিওনেল মেসির থেকে ম্যারাডোনা অনেক পিছিয়ে থাকবেন। কারও পক্ষে একা বিশ্বকাপ জয় সম্ভব না। ম্যারাডোনাও একা বিশ্বকাপ জেতেননি।

সব কথার শেষ কথা, দলগত ফুটবলে একক নৈপুণ্যে ম্যাচ জয় সম্ভব। কিন্তু বিশ্বকাপ জয়ের জন্য দলগত পারফরম্যান্সের কোনো বিকল্প নেই। ফুটবলের আধুনিক যুগে এসে একা মেসি বিশ্বকাপ জেতাবেন এমন আশা করাই ঠিক না।

যমুনা অনলাইন: টিএফ









Leave a reply