রোস্তভের ‘আমুর টাইগার’ হতে পারলো না ব্রাজিল

|

আলমগীর স্বপন,রোস্তভ,রাশিয়া থেকে

হেক্সা জয়ের মিশনে এসে প্রথম ম্যাচেই ড্র। তাই কিছুটা মন খারাপ ব্রাজিলিয়ান ফেলিপোর। ব্রাজিলের সাওপাওলো থেকে রাশিয়ার রোস্তভে এসেছেন নিজ দেশের বিশ্বকাপ মিশনের সাথী হতে। রোস্তভ অন ডন স্টেডিয়ামে পাশেই বসেছিলেন আমাদের। কুতিনহোর গোলের পর ফেলিপোসহ স্টেডিয়াম ভরা ব্রাজিলিয়ানদের উল্লাসে কান পাতাই দায় ছিল। খেলার প্রথম বিশ মিনিট অনিন্দ্য সুন্দর ফুটবল খেলেছে সাম্বার দেশের ফুটবলাররা। কিন্তু খেলার দ্বিতীয়ার্ধের পাচঁ মিনিটে সুইজারল্যান্ডের স্টিভেন জুবেয়ের হেডে সর্বনাশ হয়ে যায় হট ফেভারিটদের। সংখ্যায় কম হলেও এরপর সুইস সমর্থকদের উচ্ছাসে ভাসে পুরো মাঠ। ড্র করেই জয়ের আনন্দে মাঠ ছাড়েন সুইসরা। অন্যদিকে, ব্রাজিলিয়ানরা একরাশ হতাশা নিয়েই বের হয়ে পড়েন রোস্তভ স্টেডিয়াম থেকে। কারণ, ব্রাজিলের কাছে ড্র মানেই নাকি পরাজয়। অন্তত, ফেলিপো তাই জানালেন।

স্থানীয় সময় তখন রাত প্রায় ১১ টা। মাঠে একে অপরের বিপক্ষে গলা ফাটালেও স্টেডিয়ামের পাশ ঘেঁষে ডন নদীর ব্রিজ দিয়ে যখন ৪৫ হাজার দর্শকের মিছিল এগিয়ে যাচ্ছিল শহরের দিকে তখন সবাই মিশে গিয়েছিলো একই স্রোতে।ব্রাজিল জিতলে অবশ্য ঢোলের মাতন আর গানে এই মিছিল রূপ নিতো চলমান কনসার্টে। তবে, প্রথম ম্যাচ ড্র করলেও একে শিক্ষা হিসেবে নিয়ে হেক্সা জয়ের মিশনে আরো সতর্কতার সাথে ব্রাজিল এগোবে বলেই আশাবাদী ষাটোর্ধ জেনিও।

রোস্তভ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত প্রথম ম্যাচ জিতে ব্রাজিল ইতিহাসের অংশ হতে না পারলেও রোস্তভবাসী ইতিহাসের অংশ হয়েছেন ঠিকই। রোস্তভকে বলা হয়ে থাকে ককেশাস অঞ্চলের দরজা। রাশিয়ার দক্ষিণ অঞ্চলের রাজধানীও এটি।এখানেই হয়ে গেল প্রথম কোনো আন্তর্জাতিক ম্যাচ, তাও আবার বিশ্বকাপের মতো ইভেন্ট। যেখানে প্রথম ম্যাচে খেলেছে ব্রাজিল-সুইজারল্যান্ড। এতে গর্বিত রোস্তভবাসী। অত্যন্ত অতিথিপরায়ণ ও বন্ধুবৎসল তারা। ‘বিশ্বকাপ ফুটবল’ যাকে বলা হয় ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’- এমন একটি প্রতিযোগিতার ৫টি ম্যাচ তাদের শহরে হচ্ছে, এটি তাদের জীবনের বড় পাথেয় বলে জানালেন ৬৫ বয়সের বৃদ্ধা ভোলানটিনা। মেয়ে-নাতি নিয়ে ডন নদীর তীরে আসা ভোলানটিনার কথায় জানা গেলো, ১৭৬০-৬১ সালের দিকে ডন নদীর তীরে রোস্তভ শহরের পত্তন। ১ কোটি ১ লাখ ১৫ হাজার মানুষের এই শহরের আড়াইশ বছরের ইতিহাসে বিশ্বকাপ ফুটবলের আয়োজনই উৎসবের সবচেয়ে বড় উপলক্ষ হয়ে এসেছে। নতুন স্টেডিয়াম নির্মিত হয়েছে। হয়েছে বিমানবন্দর। রাশিয়ার দক্ষিণাঞ্চলের অন্য শহরের চেয়ে শিক্ষাদীক্ষা, শিল্প-সংস্কৃতি, কলকারখানায় সমৃদ্ধ শহরটিতে বিশ্বকাপ দিয়েছে নতুন মাত্রা।

সুইজারল্যান্ড-ব্রাজিল ম্যাচে জমজমাট রোস্তভ স্টেডিয়াম

রাতে ড্র নিয়ে রুমে ফিরে পরদিন সাত সকালে বেশিরভাগ ব্রাজিলিয়ান ও সুইস রোস্তভ ছেড়েছেন। তবে যারা ঘুরতে ভালোবাসেন তাদের অনেকেরই দেখা মিললো ডন নদীর তীরের পার্কে। এখানে ফুরফুরে মেজাজে ঘুরতে থাকা সুইজারল্যান্ডের বার্ন শহর থেকে আসা সুইস ফ্রিটজ ডিকের সাথে কথা হয়। আগের রাতে শক্তিশালী ব্রাজিলের সাথে ড্র করায় নিজের উচ্ছ্বাস লুকিয়ে রাখলেন না। বললেন, রোস্তভে আসা অনেকটা স্বার্থক হয়েছে। জিতলে অবশ্য ষোলকলা পূর্ণ হতো। সুইস ডিক রোস্তভ শহর ও এখানকার মানুষদের নিয়েও তার ভালো লাগার কথা জানালেন।বললেন,সকাল থেকেই শহরটা এক চক্কর ঘুরে দেখার চেষ্টা করেছি। পরিস্কার পরিচ্ছন্ন শহর। এর সমৃদ্ধ ইতিহাস জানতে পেরেছি জাদুঘরে গিয়ে। তবে সময় স্বল্পতার কারণে এখানকার বোটানিকাল গার্ডেনে যেতে পারিনি। একাডেমিক থিয়েটারও দেখার ইচ্ছা ছিল। অবশ্য ডন নদীর তীরে এসে মন জুড়িয়ে গেছে। চমৎকার সাজানো গোছানো। এই কথার মাঝে হোটেল ভাড়া নিয়ে আক্ষেপের কথা জানালেন ডিক। জানালেন, যে হোটেলর রুমে থেকেছেন এর ভাড়া ২ হাজার রুবেল হলেও বিশ্বকাপ উপলক্ষে তার কাছ থেকে নেয়া হয়েছে ১২ হাজার রুবেল।

এরকম অভিজ্ঞতা অবশ্য রোস্তভে খেলা দেখতে আসা কম বেশি সবার হয়েছে। ডন নদীর তীরেই দেখা ব্রাজিলিয়ান ব্রুনো লিমার সাথে। তারও একই অভিজ্ঞতা। তবে এতে কিছুটা অখুশি হলেও তার মন খারাপ ছিল খেলার ফল নিয়ে।কুতিনহোর অমন সুন্দর গোলের পর এই ম্যাচ ড্র করা তার কাছে অবিশ্বাস্য ঠেকেছে। এতে ষষ্ঠ শিরোপা বা হেক্সা জয়ের বিশ্বাসও কিছুটা নড়বড়ে হয়েছে বলেই জানালেন। তবুও তার আশা, সামনের ম্যাচ জিতে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে এগিয়ে যাবে সেলেসাওরা। ম্যাচ নিয়ে আলাপের ফাঁকেই জানালেন, এখানকার চিড়িয়াখানায় গিয়েছিলাম। দেখলাম চিতাবাঘ,তুষার ভল্লুক। বিশেষ প্রজাতির বিরল আমুর টাইগার দেখলাম। ৯৮ হেক্টরের চিড়িয়াখানাটায় মনে হয় দুনিয়ার সব পশুপাখিই আছ। আশাকরি সামনের ম্যাচগুলোতে ফুটবলের এমন সম্ভার নিয়েই ব্রাজিল ‘আমুর টাইগার’ বা বাঘের শক্তিতে দুমরে মুচরে দিবে প্রতিপক্ষকে।

ব্রাজিলের পতাকার রংয়ের জার্সি,টিশার্ট, ক্যাপ পড়ে ঘুরতে থাকা অনেক রোস্তভবাসীর এমন চাওয়া। সুন্দর ফুটবলের দেশ ব্রাজিল যেন ফাইনালের আগে বাদ না পরে। যদিও তারা মনেপ্রাণে চান স্বাগতিক হিসেবে রাশিয়ান ফুটবল দল যেন তাদের মান রাখেন। ২০০২ এর স্বাগতিক দক্ষিণ কোরিয়ার মতোই অন্তত সেমিফাইনাল পর্যন্ত যায়। অবশ্য প্রথম ম্যাচে সৌদি আরবকে ৫-০ গোলে হারিয়ে সেই আশার সলতে জ্বালিয়ে রেখেছে চেরোশেভ,গোলভিনের রাশান টিম।

যমুনা অনলাইন: এএস/টিএফ









Leave a reply