শিক্ষক-ছাত্র দম্পতি চেয়েছিলেন তাদের প্রেমকাহিনি সবাই জানুক

|

সিনিয়র করেসপনডেন্ট, নাটোর:

গত ৩০ জুলাই ফেসবুকে ৪২ বছর বয়সী কলেজ শিক্ষক খাইরুন নাহারকে বিয়ে করা নিয়ে আবেগঘন পোস্ট দেন কলেজছাত্র ২০ বছরের মামুন হোসেন। ১৩ মাসের গল্প শিরোনামে মামুন লেখেন ফেসবুকের মাধ্যমে পরিচয়। তারপর দুজনের মনের লেনদেন। তারপর বিয়ের সিদ্ধান্ত। দু’জন সুখে থাকলেও নানা মানুষের বিরূপ কথা শুনতে হচ্ছে, এমন পোস্ট নজরে আসে স্থানীয় সাংবাদিক মেহেদী হাসান তানিম ও নাজমুল হাসান নাহিদের। পরে তানিম মোবাইল ফোনে খাইরুন-মামুন দম্পতির সাথে যোগাযোগ করলে তাদের ভালোবাসার বিয়ের খবরটি সুন্দরভাবে উপস্থাপনের আগ্রহ প্রকাশ করেন।

পরের দিন ৩১ জুলাই সকাল ১১টার দিকে নাটোর শহরের বলারিপাড়া এলাকায় যান ওই দুই গণমাধ্যমকর্মী। আগে থেকেই বাসার নিচে অপেক্ষারত মামুন হাজী নান্নু ম্যানশনের তিনতলার একটি ফ্লাটে মামুন তাদের নিয়ে যান। গণমাধ্যমে কথা বলার জন্য দু’জনই পরিপাটি হয়ে ঘর গোছগাছ করে রেখেছিলেন।

এ সময় খাইরুন নাহার বলেন, ১১ মাস থেকে আমাদের রিলেশন। রিলেশন বলতে পরিচয়। ছয় মাস, সাত মাস আগে বিয়ে করছি। এটা অনেকে পজেটিভলি নিচ্ছে, অনেকে নেগেটিভলি নিচ্ছে। মামুনের ফ্যামিলি আমাকে মেনে নিছে, ওদের পরিবারই না মেনে নেবার কথা। কারণ মামুনের বয়সের সাথে আমার বয়সের পার্থক্য অনেক। তারপরেও ওর দুই বোন, বাবা মা আমি বলতে অজ্ঞান। ঈদের মধ্যে আমাকে নিয়ে গেছে। তারা আমাকে অনেক ভালোবাসে। কিন্তু আমার ফ্যামিলিতেই অনেক প্রবলেম। অনেকের ধারণা মামুন আমাকে বিয়ে করেছে টাকার লোভে, আমি চাকরি করি এ জন্য। একসময় ও আমাকে ছেড়ে যাবে এমন কথাও শুনতে হচ্ছে। এগুলো শুনলে মনটা খারাপ হয়ে যায়। আমার কথা হলো কে কী বললো সেদিকে কান না দিয়ে আমরা আমাদের ভালোবাসাকে জয় করেছি। চিরদিন এভাবেই দু’জন পাশাপাশি থাকবো। সবাই আমাদের জন্য দোয়া করবেন।

কতদিন আগে আগের স্বামীর সাথে বিচ্ছেদ হয়েছে এমন প্রশ্নে খাইরুন নাহার সময়কাল উল্লেখ না করেই বলেন, দীর্ঘদিন হলো। প্রথম স্বামীর সাথে বিচ্ছেদ হওয়ার পর মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েছিলাম। প্রতিটা দিন প্রতিটা সময় খারাপ কাটতো। আত্মহত্যা করারও সিদ্ধান্ত নিই। ঠিক সেই সময় ফেসবুকে পরিচয় হয় মামুনের সাথে। মামুন তার খারাপ সময় পাশে থেকে উৎসাহ দিয়েছে এবং নতুন করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখিয়েছে। মামুন মন প্রাণ দিয়ে আমাকে ভালোবাসে। সামাজিকভাবে বিভিন্ন মহলে নানা কুৎসিত মন্তব্য থাকলেও তোয়াক্কা না করে নতুন করে সংসার শুরু করেছি। আজীবন মামুনের সাথে সংসার করে যেতে চাই।

ওই সময় মামুন হোসেন বলেন, প্রথমে আমার পরিবার থেকে এই বিয়েটা মেনে নিতে চায়নি। এ নিয়ে আমরা অনেক ডিপ্রেশনে ছিলাম। আমি যেটা বুঝি সেটা হলো বয়সটা কোনো ব্যাপার না। যদি মানসিকভাবে দুটি মন এক হয়। অনেকেই অনেক ধরনের বাজে মন্তব্য করে। আমি এটা বিশ্বাস করি যে ‘মন্তব্য কখনো গন্তব্য ঠেকাতে পারে না’। কে কী বললো সেগুলো মাথায় না নিয়ে নিজেদের মতো সংসার গুছিয়ে নিয়ে জীবন শুরু করেছি। সকলের কাছে দোয়া প্রার্থী।

পরদিন বিষয়টি ওই সাংবাদিকদের আইপি টিভিতে আপলোড করলে তা দেখে খুশি হন মামুন ও খাইরুন নাহার। পরবর্তীতে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচার হলে পজেটিভভাবে বিষয়টি উপস্থাপনের জন্য সবার প্রতি কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করেন। ফেসবুকে কয়েকটি গণমাধ্যমের নাম উল্লেখ করে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে পোস্টও দেন তারা।

উল্লেখ্য, প্রায় ৬ মাস আগে নাটোর নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী মামুন হোসেন ও গুরুদাসপুর উপজেলার খুবজিপুর এম হক ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক খায়রুন নাহার ফেসবুকে পরিচয়ের মাধ্যমে ভালোবেসে করে বিয়ে করেন। তারা নাটোর শহরের বলারিপাড়া মহল্লায় একটি ভাড়া বাসায় বেশ সুখের সংসার পাতে। এ সংবাদটি ভাইরাল হয়। এরই মাঝে গত রোববার সকালে সেই ভাড়া বাসা থেকে খাইরুন নাহারের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এই মৃত্যু নিয়ে রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। ইতোমধ্যে পুলিশ মামুনকে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়েছে। সোমবার বিকেল সাড়ে পাঁচটায় মামুনকে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. মোসলেম উদ্দীনের আদালতে তোলা হয়। এ সময় মামুনের জামিন আবেদন করেন অ্যাডভোকেট গোলাম সারোয়ার স্বপন। তবে এই আবেদন নাকচ করে মামুনকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন বিচারক।

ইউএইচ/





সম্পর্কিত আরও পড়ুন







Leave a reply