হুমায়ূন: প্রতিষ্ঠিত বর্গ ভেঙে যৌথ জীবনের স্বপ্নদ্রষ্টা

|

ছবি: সংগৃহীত

মঞ্জুরুল ইকরাম:

বাংলা সাহিত্যে হুমায়ূন আহমেদ সর্বাধিক পঠিত ও চর্চিত। অনেক তরুণ সাহিত্যিক তাকে অনুসরণ করেন, অনুকরণ করেন। তাদের কেউ কেউ হুমায়ূনের বলার ভঙ্গি কিছুটা আয়ত্ত করে নিতে পারলেও বহুকিছুর সঙ্গে অনুমিতভাবেই অনুপস্থিত থেকে যায় রসবোধের এক বিপুল জগৎ; ফলত, সরল বাক্যেই বলা চলে, হুমায়ূনের প্রস্থানের ১০ বছরেও তার বিকল্প পায়নি বাংলা সাহিত্য। খুব সাধারণ কোনো ঘটনাকে উপজীব্য করেই হুমায়ূন অনায়াসে বইয়ে দিতে পারতেন রসের চিরন্তন প্রবাহ।

এ ধারায় হুমায়ূনের পরে যেমন কেউ আসেনি; আগের কারও নাম বলতে গেলেও বীরদর্পে খুব বেশি নাম চলে আসছে এমনটি নয়। আরও এক ধারায় হুমায়ূন অনন্য। তার রচনায় সপ্রতিভ ভঙ্গিতে উঠে এসেছে হিন্দু-মুসলমানের যৌথ জীবনের উপস্থাপন। দেশভাগের পর পূর্ব বাংলা ছেড়ে যাওয়া সাহিত্যিকদের অনেকের রচনায় উঠে এসেছে স্মৃতিকথন, এসেছে মুসলমান প্রতিবেশীদের কথা। তার বিপরীতে, অনেকের মতে, এ অংশে চলে আসা মুসলমানদের রচনায় সনাতন প্রতিবেশীরা কমই এসেছেন। পূর্বের কথা ভবিষ্যতের ওপর অমঙ্গলের ছায়া ফেলে কিনা, সে শঙ্কাও কাজ করা অবাস্তব নয়। স্বাধীন বাংলাদেশে সাহিত্যের মূলধারায় বাঙালি মুসলমানের জীবনই প্রাধান্য পেয়েছে। কিন্তু হুমায়ূনের রচনায় বাঙালি হিন্দুর যাপিত জীবনও অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে। হয়তো বাংলা সাহিত্যের আধিপত্যবাদী ধারায় খুব বেশি প্রভাবিত না হওয়ায়, বেশিরভাগ মূলধারার বাঙালি লেখকদের রাজনৈতিক মতাদর্শিক চোখ দিয়ে হাসি ও হাহাকারের গল্প খুঁজতে যাননি বলে এমনটা সম্ভব হয়েছে।

হিন্দু-মুসলমানের যৌথ সংস্কৃতির সাহিত্যিক প্রতিফলন আমরা দেখি নজরুলের সাহিত্যে। স্বাধীন বাংলাদেশে গদ্য লেখার মতো সুযোগ তার হয়নি। এখানে হুমায়ূন অনেকটাই যেন নিঃসঙ্গ শেরপা! দ্বিজাতিতত্ত্ব যেন ছুঁয়ে গিয়েছিল বাংলা সাহিত্যকেও! সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহর ‘একটি তুলসী গাছের আত্মকাহিনী’র কথা অনেকেই বলবেন। তবে দেশভাগের নস্টালজিয়া ছাড়া তাতে ছিল না যৌথ জীবনের প্রতিবেশ। হুমায়ূনের পাঠকের কাছে অনেক লেখকই যেন অর্জিত জ্ঞানের প্রতাপ ও ভঙ্গির কৃত্রিমতার দোষেও দুষ্ট! এই যে গরিমা, ভঙ্গির আস্তরণ মাড়িয়ে পাঠকের সাথে অন্তরঙ্গতা প্রতিষ্ঠা করতে পারা, এটিও হুমায়ূনের বিশেষ গুণ। বর্তমান পটভূমিতে হুমায়ূনের এই কৃতিত্ব রীতিমতো বিস্ময়কর। ঢাকা শহর এবং বাংলাদেশের গ্রামগঞ্জের স্বাভাবিক বাস্তবতার মধ্যে রহস্যের নানা উপাদান তাকে গল্পের প্রয়োজনেই খুঁজতে হয়েছে। বাঙালি মুসলমানের মন ও কৃষ্টির স্বাভাবিক আগমনের সাথে অনায়াসে হুমায়ূনের রচনায় নানাভাবে এসেছে হিন্দু বাড়ির অবকাঠামো, বিলাস, রহস্য ও আচার। ‘নলিনী বাবু B.Sc’ যেমন সুখপাঠ্য রহস্যঘন রচনা। হুমায়ূনের কৃতিত্ব এখানেই যে, বাঙালি হিন্দুর যাপিত জীবনকে বাঙালি হিন্দু-মুসলমান যৌথ জীবনের অংশ হিসাবে আবিষ্কার করতে চেয়েছেন। আর অনেকটাই যে পেরেছেন তার সাক্ষ্য দেয় তার মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বিপুল রচনার সম্ভার।

যুদ্ধকালীন বাস্তবতায় বাংলাদেশের হিন্দু জনগোষ্ঠীকে বলির পাঠা কিংবা ‘নন্দ ঘোষ’ সাজানোর যে বিশাল আয়োজন হয়েছিল মঞ্চস্থ, যে মর্মান্তিক ভীতির আবহ তৈরি হয়েছিল দেশব্যাপী, হুমায়ূনের দেখা মুক্তিযুদ্ধে আর রচনায় রয়েছে তার প্রামাণ্য স্বীকৃতি। ‘জোছনা ও জননীর গল্প’তে গৌরাঙ্গের মনোবিকার হয়তো তারই প্রতীকী প্রকাশ। অস্তিত্ব ভীতির এ আখ্যানের সাথে ওই সময়ের মুসলমান জনগোষ্ঠীর বিপর্যয়ের যে তুলনা চলে না, তার সম্যক প্রকাশ ঘটেছে ‘অনিল বাগচীর একদিন’ উপন্যাসে। পক্ষপাতদুষ্ট ও সাম্প্রদায়িক মতাদর্শিক নির্মাণের খপ্পড়ে পড়েননি হুমায়ূন। সে কারণেই, প্রতিষ্ঠিত বর্গের অনুকরণে আঁকেননি মাওলানা ইরতাজউদ্দিন কাশেমপুরির চরিত্র। ‘শান্তি বাহিনী’ নাম শুনে শান্তি প্রতিষ্ঠার সংগঠনে প্রধান হিসেবে যোগ দেন গৌরাঙ্গের বন্ধু শাহেদের বড়ভাই ইরতাজউদ্দিন কাশেমপুরি। সাহসিকতার চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে মাওলানার নিয়তি আঁকলেন হুমায়ূন; যেন মাওলানার লাশের মতোই পানিতে ভেসে গেল একপাক্ষিক দেখার চোখ। তবে বর্তমান প্রসঙ্গের জন্য অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ রচনা ‘শ্যামল ছায়া’ যেটি চলচ্চিত্রেও রূপ পায়। এ সিনেমায় নৌকার আরোহী পরিবারগুলো বাংলাদেশের প্রতিমূর্তি হয়ে উঠলে সেখানে হিন্দু ও মুসলমান জনগোষ্ঠীর গভীর পারস্পরিকতা প্রতিষ্ঠিত হয়। মাতৃহারা হিন্দু সন্তানকে বুকের দুধ পান করিয়ে জীবন রক্ষা করলেন মুসলমান নারী। মুহূর্তেই ঘুচে গেল জাতপাতের সীমানা!

মিথস্ক্রিয়ার একই ধরনের সাফল্য হুমায়ূন লাভ করেছেন ‘মধ্যাহ্ন’ উপন্যাসেও। ময়মনসিংহ জেলার হিন্দুপ্রধান ‘বান্ধবপুর’ গ্রামের জীবন ও রসায়নের চিত্রায়নে। সত্য বদলের জন্য কোনো বিপ্লবের স্বপ্ন দেখেননি হুমায়ূন, কেবল রেখেছেন যৌথ জীবনের প্রস্তাবনা। আর কথাসাহিত্যের ইতিহাসে এমন স্পর্ধার জোরেই ‘জোছনা ও জননীর গল্প’, ‘মধ্যাহ্ন’র সাথে এসবের স্রষ্টা হুমায়ূনও দাবি করতে পারেন অমরত্ব।





সম্পর্কিত আরও পড়ুন







Leave a reply