রোহিঙ্গা সংকট: পরাশক্তিদের যত হিসাব-নিকাশ


আমরা বেঁচে আছি উদ্বাস্তুদের সময়ে,

নির্বাসনের সময়ে

– এরিয়েল ডর্ফম্যান, আর্জেন্টাইন সাহিত্যিক

মিয়ানমারের রাখাইনে পরিস্থিতির উন্নতি না হলে বছর শেষে বাংলাদেশে শরণার্থী সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর। নতুন-পুরনো মিলে বিপুল উদ্বাস্তুর ভার বহন করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। এত মানুষকে মানবিক সহায়তা দেয়া বড় চ্যালেঞ্জ। সরকারি, বেসরকারি, সামাজিক ও আন্তর্জাতিক উদ্যোগের মাধ্যমে পরিস্থিতি মোকাবেলার চেষ্টা চলছে। মানবিক সহায়তার প্রাথমিক ধাপের পরই আসে প্রত্যাবাসন প্রসঙ্গ। কাজটি যে মোটেই সহজ হবে না, মিয়ানমারের কর্মকাণ্ডে প্রতিনিয়ত তার প্রমাণ রেখে চলেছে। সীমান্তে স্থল মাইন পুঁতে রাখাকে আর কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায়? সবচেয়ে বড় সমস্যা দেশটির কর্তাব্যক্তিরা রোহিঙ্গাদের অস্তিত্বই স্বীকার করতে চায় না। সেনাপ্রধান তো এদের ‘বাঙালি মুসলমান’ অভিহিত করে প্রতিহতের ঘোষণা দিয়েছেন। মঙ্গলবার নেত্রী সু চি বলেই দিয়েছেন, ‘আন্তর্জাতিক তদন্তকে ভয় পায় না মিয়ানমার’।

প্রশ্ন জাগতে পারে কেন এই বেপরোয়া আচরণ? ঔদ্ধত্য প্রদর্শনের অন্তর্নিহিত শক্তির উৎস কোথায়?

এটা বুঝতে হলে, মিয়ানমারের ভৌগলিক, নৃ-তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক ইতিহাস ঘেঁটে দেখতে হবে। দেশটির মোট জনগোষ্ঠির ৬৮ ভাগ বর্মী। সেনাবাহিনী, সরকার, সর্বোপরি রাষ্ট্রকাঠামো গড়ে উঠেছে বর্মী জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে। মূলত ‘বর্মী জাতীয়তাবাদের’ ধ্বজাধারীরাই রোহিঙ্গাদের নাগরিক স্বীকৃতি দিতে নারাজ, অন্য জাতিগোষ্ঠীগুলোকেও রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছে তারা। মিয়ানমারের ১৩৫টি জাতিগোষ্ঠির বড় অংশই এই উগ্র বর্মী জাতীয়তাবাদীদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে সময়ে সময়ে।

মিয়ানমারের জাতীয় বাজেটের প্রায় ২৫ ভাগ খরচ হয় সামরিক বাহিনীর পেছনে। দীর্ঘদিনের ধারাবাহিক বিনিয়োগ দেশটির সেনাবাহিনীকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অন্যতম বৃহৎ শক্তিতে পরিণত করেছে। তাদের নির্যাতনের মাত্রাও যে ভয়াবহ, তা বলাই বাহুল্য। সেনাবাহিনীর নির্যাতন ও উগ্র বর্মী জাতীয়তাবাদের প্রতিক্রিয়া হিসেবে মিয়ানমারের বিভিন্ন অঞ্চলে গড়ে উঠেছে স্বাধীনতাকামী নানা সশস্ত্র বাহিনী।

রোহিঙ্গা সমস্যা বাংলাদেশের ঘাড়ে চেপে বসেছে বলে এর আঁচটা বেশি টের পাচ্ছি আমরা। অথচ, মিয়ানমার প্রতিনিয়তই শরণার্থী উৎপাদন করে চলা একটি রাষ্ট্র। ভারত, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র; কোথায় নেই মিয়ানমার পালানো শরণার্থীর ঢল? এমনকি ঘনিষ্ঠ মিত্র চীনকেও বহন করতে হচ্ছে শরণার্থীর বোঝা!

মিয়ানমারের কোকাং রাজ্যের অধিবাসীদের সাথে চীনের ইউনান প্রদেশের মানুষের ভাষা ও সংস্কৃতির মিল আছে। যেমনটা রয়েছে রোহিঙ্গাদের সাথে চট্টগ্রাম অঞ্চলের মানুষের। বর্মীদের নির্যাতনে অতিষ্ঠ কোকাংরা প্রথমে স্বায়ত্তশাসন ও পরে স্বাধীনতার আন্দোলনে ঝুঁকেছে। গত মার্চে মিয়ানমার পুলিশ ও সেনাবাহিনীর ওপর সশস্ত্র কোকাং বিদ্রোহীরা (এমএনডিএএ) হামলা করে, বেশ কয়েকজনকে মেরেও ফেলে। তারপর থেকে সেখানে সেনাবাহিনী কঠোর অবস্থানে আছে। ফলশ্রুতিতে চীনে আশ্রয় নিয়েছে হাজার হাজার কোকাং। আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সমাধানে চীন চাপ দিয়ে আসলেও মিয়ানমার তাতে বিশেষ কান দিচ্ছে না। তবুও মিয়ানমারের প্রতি কঠোর হচ্ছে না চীন। রোহিঙ্গা ইস্যুতেও চীন তার বড় বাজার বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ানোর বদলে মিয়ানমারের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে!

থাইল্যান্ডের ঘটনা আরও চমকপ্রদ। বাংলাদেশের জন্য লক্ষণীয়ও বটে। মিয়ানমারে নিপীড়িত হয়ে ১৯৮৪ সালে যখন প্রথমবারের মতো শরণার্থীরা থাইল্যান্ডে আশ্রয় নেয় তখন হয়ত কেউই ধারণা করেনি ৩০ বছরেরও বেশি সময় সেখানে থাকতে হবে তাদের। থাইল্যান্ডের শরণার্থী ক্যাম্পগুলোয়  বসবাসরত জাতিগোষ্ঠীগুলোর ৭৯ ভাগেরও বেশি হলো কারেন, যারা বর্মী সেনাবাহিনীর নিপীড়নের শিকার।

এই বর্মী জাতীয়তাবাদের নেতা ছিলেন অং সান, আজকের নিন্দিত নেত্রী সু চির পিতা। অবশ্য, দেশটিতে বর্মী জাতীয়তাবাদের উগ্র ও রক্তাক্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে সামরিক জান্তারা। গণতন্ত্রপন্থী সু চি’কে দীর্ঘদিন বন্দি করে রাখে তারা। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এখনও সুযোগ পেলে সরিয়ে দেবে ক্ষমতা থেকে।

প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য, সম্ভাবনাময় বাজার এবং ভৌগলিক অবস্থানের কারণে মিয়ানমার বৈশ্বিক আগ্রহের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। এই পরিস্থিতি পরাশক্তি চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং রাশিয়াকে ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ করেছে। মনে রাখা দরকার, ভারত সাগরের দিকে মুখ করা মিয়ানমার ভূমিপথে একমাত্র ‘যোগাযোগ হাব’ যেটি কিনা পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং দক্ষিণ এশিয়াকে যুক্ত করেছে।

সব মিলিয়ে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বৃহৎশক্তির রাষ্ট্রগুলোর অবস্থান অনেকটাই ধরি মাছ না ছুঁই পানি। অবশ্য রাশিয়া কিছুটা ব্যতিক্রম। দেশটি সরাসরি জানিয়ে দিয়েছে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অন্য দেশগুলোর হস্তক্ষেপ করাটা ঠিক না। তারা মিয়ানমারের প্রতি তাদের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে। রোহিঙ্গা সংকটকে আন্তঃধর্মীয় বিরোধ আখ্যা দিয়ে রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা বলেছেন ‘এটা মনে রাখা দরকার যে একটি সার্বভৌম দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার ইচ্ছা কেবল আন্তঃধর্মীয় বিরোধ বাড়িয়ে দিতে পারে’।

পেছনের কারণ বোঝা গেলে মিলতে পারে বেশ কিছু সমীকরণ। সম্প্রতি, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বেশি আলোচিত হচ্ছে অস্ত্র ব্যবসার কথা। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর কাছে অস্ত্র বিক্রিতে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে রাশিয়া। স্টকহোম আন্তর্জাতিক শান্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (এসআইপিআরপি) বরাত দিয়ে আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৯০ সালের পর থেকে মিয়ানমারের কাছে ৬৪টি যুদ্ধবিমান, ১০০টি কামান, ২৯৭১টি মিসাইলসহ অন্যান্য সমরাস্ত্র বিক্রি করেছে রাশিয়া। মিয়ানমারের সামরিক জান্তার সাথে রাশিয়ার সম্পর্ক বুঝতে এই তথ্যই যথেষ্ট।

দক্ষিণ এশিয়ায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হলে যে মিয়ানমারের সহায়তা লাগবে এ হিসেব অনেক আগেই কষেছে রাশিয়া। মিয়ানমারের সাথে তাদের সম্পর্কও অনেক পুরনো ও গভীর। জার্মানির রস্টক বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ড. লুডমিলা লুৎস-অরাস রাশিয়া-মিয়ানমার সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা করেছেন। গবেষণা পত্রের নাম দেখেই তার ফলাফল অনুমান করা যায়, ‘রাশিয়া ও মিয়ানমার- বিপদের বন্ধু?’ (Russia and Myanmar – Friends in Need?)

১৯৪৮ সালে মিয়ানমারজুড়ে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম শুরু হলে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন সেখানকার কমিউনিস্ট পার্টিকে সমর্থন দিয়েছিল। এর অনিবার্য ফল হিসেবে মিয়ানমার রাষ্ট্রের দণ্ডমুণ্ডের কর্তাদের সাথে তাদের দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছিল। ১৯৫১ সাল পর্যন্ত দু’দেশের মধ্যে কোনো দূতাবাস ছিল না। ১৯৫৫ সালে মিয়ানমারের প্রধানমন্ত্রী উ ন্যু’র সোভিয়েত সফরের মধ্য দিয়ে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সূচনা হয়। এর ধারাবাহিকতায় সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট নিকিতা ক্রুশ্চেভ মিয়ানমার সফর করেন। ক্রুশ্চেভকে দেয়া আতিথেয়তা দু’দেশের পলিটিকাল হিস্ট্রিতে এখনও আলোচিত। ক্রুশ্চেভ যেখানেই গিয়েছেন,  স্বাগত জানাতে রাস্তার দু’পাশেই দাঁড়িয়েছিল সারি সারি মানুষ। তখন থেকেই মিয়ানমারের বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করে আসছে রাশিয়া। ‘নিউক্লিয়ার টেকনোলজি’ নিয়ে দু’দেশের বেশকিছু প্রকল্প প্রক্রিয়াধীন। ২০১৭ সালের মধ্যে দু’দেশের বার্ষিক বাণিজ্য ৫০০ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। যা ২০১৪ তে ছিল ১১৪ মিলিয়ন ডলারে।

১৯৯০ সাল থেকে এ পর্যন্ত মিয়ানমারে সবচেয়ে বেশি অস্ত্র বিক্রি করেছে কে? উত্তরটা সহজেই অনুমেয়- চীন। এ সময়ে ১২০টি যুদ্ধবিমান, ৬৯৬টি সাঁজোয়া যান, ১২৫টি কামান, ১০২৯টি মিসাইল, ২১টি নৌ-জাহাজসহ অন্যান্য সমরাস্ত্র কেনে নেপেইদো। দেশটির সাথে চীনের বছরে ১০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য হয়। দু’দেশের সম্পর্ক পরীক্ষিত ও পুরনো। মিয়ানমার থেকে পাপলাইনে গ্যাস আমদানি করে চীন। অপরিশোধিত তেল আনার আরেকটি প্রকল্প প্রক্রিয়াধীন। মিয়ানমারের গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ প্রকল্পের সাথে তারা যুক্ত। ফলে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বাংলাদেশের পাশে থাকার চেয়ে বরং মিয়ানমারকেই সমর্থন দিচ্ছে তারা। এমনকি নিজেরা মিয়ানমারের কোকাং শরণার্থীর বোঝা বহন করা সত্ত্বেও এ বিষয়ে শক্ত অবস্থান নিচ্ছে না তারা। কেবলমাত্র শরণার্থী ইস্যুতে দেশটির সেনাবাহিনীর সাথে ঘনিষ্ট সম্পর্ক নষ্ট করতে চায় না চীন।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সম্প্রতি মিয়ানমার সফরে গিয়ে নিরাপত্তা চৌকিতে সন্ত্রাসী হামলার নিন্দা করলেও রোহিঙ্গাদের ওপর বর্বরতা নিয়ে কোনো কথা বলেননি। দেশটির সেনাবাহিনীর সাথে তাদের যোগাযোগ দিন দিন ঘনিষ্ঠ হচ্ছে। মিয়ানমারের কাছে অস্ত্র বিক্রিতে ভারত এখন তৃতীয় অবস্থানে আছে। মিয়ানমারের সাথে ভারতের ‘সেভেন সিস্টার্সের’ ৪টি রাজ্যের সীমান্ত রয়েছে। ভূ-রাজনৈতিক কারণে ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বী চীন মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। একই কারণে ভারতও চায় না মিয়ানমারকে চটাতে যেন অন্য পরাশক্তিগুলো তাদের বিরুদ্ধে মিয়ানমারকে ‘তুরুপের তাস’ হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।

প্রতিবেশি মিত্রদেশ বাংলাদেশের সাথে এ ইস্যুতে সম্পর্কে টান পড়লে সেটাও ভারতে জন্য স্বস্তিদায়ক হবে না। তাই বাংলাদেশকেও পুরোপুরি অখুশি করতে চায় না তারা। পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ এরই মধ্যে বাংলাদেশকে সমর্থনের কথা জানিয়েছেন। ‘অপারেশন ইনসানিয়াত’- এর আওতায় কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবিরে ত্রাণও পাঠিয়েছে তারা। ভারতের প্রায় ৪০ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী আছে। তাদেরকে ‘জাতীয় নিরাপত্তার’ জন্য হুমকির হিসেবে দেখছে দেশটি। এদেরকে বিতাড়িত করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিজেপি সরকার। এতে, উদ্বেগ জানিয়েছে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থা। বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় চলমান সংকটে বাংলাদেশ বা মিয়ানমার, সরাসরি কারো পক্ষ নেয়া দিল্লির জন্য অস্বস্তির।

রোহিঙ্গা সংকটে বাংলাদেশ জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নৈতিক সমর্থন পেয়েছে। জাতিসংঘ মিয়ানমারের ঘটনাকে ‘জাতিগত নিধন’ উল্লেখ করে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস পরিস্থিতি উন্নয়নে সু চি’কে শেষ সুযোগ দেয়ার কথাও উল্লেখ করেছেন। বিশ্বমোড়ল যুক্তরাষ্ট্র রোহিঙ্গা নির্যাতনের ঘটনায় উদ্বেগ জানালেও তারা কঠোর অবস্থান নিচ্ছে না। কারণ হিসেবে অনেক বিশ্লেষক বলছেন, উত্তর কোরিয়া সংকটের কারণে যুক্তরাষ্ট্র এই মুহূর্তে এশিয়ায় নতুন কোনো জটিল পরিস্থিতি চায় না।

দীর্ঘদিন মিয়ানমারে সরাসরি সেনাশাসন চলে। এসময় দেশটির সামরিক জান্তার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের দূরত্ব ছিল চরমে। অন্যদিকে, প্রতিদ্বন্দ্বী পরাশক্তি চীন ও রাশিয়ার সাথে মিয়ানমারের অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক তার জন্য অস্বস্তির কারণ। এনএলডি সভাপতি সু চি’কে মুক্ত করা ও নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আনতে যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিকভাবে তৎপরতা চালিয়ে আসছিলো। এখন, সেখানে তথাকথিত গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় এসেছে। ফলে সরাসরি সে সরকারের নিন্দা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের অনুকূলে কাজ করবে না। রিপাবলিকান সিনেটর মিচ ম্যাককনেলের সু চি’র পক্ষে ওকালতি করাটাও এক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ। নানা ঘটনা বিশ্লেষণে এটা মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে যে, যুক্তরাষ্ট্র চায় না সু চি সরকার রোহিঙ্গা ইস্যুতে কোণঠাসা হোক।

তুরস্কের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডে এটা মনে হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে যে, মুসলিম বিশ্বের নেতা হওয়ার এক ধরনের বাসনা তাদের মধ্যে কাজ করছে। প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগানকে অনেকে এ যুগের অটোমান সুলতানও ডেকে থাকেন। চলমান রোহিঙ্গা সংকটে তুরস্ক দ্রুত সাড়া দিয়েছে। দেশটির ফার্স্ট লেডি এমিনে এরদোগান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত কাভুসোগলু কক্সবাজারের কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করে গেছেন। সাথে নিয়ে এসেছিলেন বিপুল পরিমাণ ত্রাণ।

রোহিঙ্গারা মূলত মুসলিম, এটা যেমন বড় বাস্তবতা, তেমনি এটাও সত্য, তাদের এই পরিচয় সামনে এনে আন্তর্জাতিকভাবে বিষয়টা মোকাবেলা বাংলাদেশের জন্য কঠিন। বরং রোহিঙ্গাদের নাগরিক পরিচয় ও অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য চাপ অব্যাহত রাখার মধ্য দিয়েই হয়তো সংকট সমাধানের রাস্তা বের হয়ে আসতে পারে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কূটনৈতিক সাফল্য ও দেন-দরবারের ওপর সমস্যার সমাধান নির্ভর করছে। সেক্ষেত্রে মানবিকতার বাইরে গিয়ে সংশ্লিষ্ট  দেশগুলোর ভূ-রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক স্বার্থ যে বড় নিয়ামক হয়ে উঠবে সেটি বলার অপেক্ষা রাখে না। এই জটিল হিসাবের মধ্যে বাংলাদেশ কত দ্রুত নিজের অংকটা মিলিয়ে আনতে পারবে তার ওপর নির্ভর করছে রোহিঙ্গা সমস্যার আপাত সমাধান।

তোয়াহা ফারুক: সাংবাদিক









Leave a reply