ধর্ষণের শিকার হাজারও রোহিঙ্গা নারীর কোলে আসবে ‘অপ্রত্যাশিত শিশু’

|

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নিযার্তনের মুখে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ঢল নামে বাংলাদেশে। সেই রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারে নির্লিপ্ততা নিয়ে যখন চলছে সমালোচনা তখন আরেকটি সংকট সামনে চলে এসেছে। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর পরিকল্পিত ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতার শিকার হওয়া রোহিঙ্গা নারীরা সন্তান জন্ম দিতে শুরু করেছেন। সেসব অবর্ণনীয় যন্ত্রণার বিবরণও দিয়েছেন রোহিঙ্গা নারীরা। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমেও উঠে আসছে এ বিষয়টি।

ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্যা গার্ডিয়ান যৌন সহিংসতার শিকার রোহিঙ্গা নারীদের ওপর সম্প্রতি একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে পালিয়ে আসার সময়কাল বিবেচনায় নিয়েছে তারা। পহেলা মে রোহিঙ্গা ঢল নামার ৯ মাস পার হতে চলছে। ফলে ধর্ষণের শিকার নারীদের গর্ভের সন্তান জন্ম নেয়া শুরু করেছে। সময়ের সাথে সাথে সন্তান জন্মদানের এই হার আরও বাড়বে।

আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেন জানাচ্ছে, আগামী কয়েক মাসে মায়েদের পরিত্যক্ত সন্তানদের সংখ্যা বেড়ে যাবে।

চিকিৎসকদের সংস্থা মেডিসিনস স্যানস ফ্রন্টিয়ার্স (এমএসএফ) কক্সবাজারে বিভিন্ন হাসপাতাল পরিচালনা করছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, তারাও আক্রান্ত মায়েদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

ধর্ষণের ফলাফল হিসেবে জন্ম নেয়া এসব শিশুর ভবিষ্যত নিয়ে যথেষ্ট ঝুঁকি আছে। একে তো রোহিঙ্গা নারীদের এরা লোমহর্ষক নির্যাতনের সেই দিনগুলো মনে করিয়ে দেবে। পাশাপাশি, পরিচয় সংকটের কারণেও এরা ঝুঁকিতে পড়বে। ইতিমধ্যে, ধর্ষণের শিকার হয়ে গর্ভধারণ করা অনেক নারী গর্ভপাত ঘটিয়ে সন্তান নষ্ট করেছেন।

মেডিসিনস স্যানস ফ্রন্টিয়ার্স বলেছে, এসব মায়েদের অধিকাংশের বয়স ১৮ বছরের নিচে। অবাঞ্ছিতভাবে সন্তান গর্ভধারণের ক্ষেত্রে সামজিক কলঙ্কের চিন্তা তাদের মানসিক পীড়ন বাড়িয়ে দিয়েছে।

আয়েশা আকতার নামের এক রোহিঙ্গা নারী কথা উঠে এসেছে দ্যা গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে। তিনি জানান, মংডু শহরে সহিংসতার সময় মিয়ানমারের তিন সেনা তাদের ঘরে প্রবেশ করে তার পাঁচ সন্তানকে মেরে ফেলার হুমকি দেয় ও তাকে ধর্ষণ করে।

আয়েশার স্বামীর মৃত্যু হয়েছে ২০১২ সালে। তিনি বলেন, এ নোংরা ঘটনার শিকার হওয়ার পর প্রায়ই তিনি বিচলিত হয়ে পড়েন। তিনি এটা প্রতিবেশীদের কাছ থেকে গোপন রাখার চেষ্টা করেন। কিন্তু শারীরিক পরিবর্তন দেখে তারা বুঝতে পারে।

বালুখালির পাহাড়ের ঢালে স্থাপন করা ত্রিপলের ভেতর বসে এই রোহিঙ্গা নারী বলেন, সেনারা যখন গ্রামে হানা দেয়, তখন তারা নারীদের ধর্ষণ করে এটা সবাই জানে।

২০১৬ সালের নভেম্বর থেকে রাখাইন রাজ্যে এমন ঘটনা অহরহ ঘটে আসছে। মিয়ানমারে গর্ভপাত ছাড়া রোহিঙ্গাদের স্বাস্থ্যসেবা নেয়ার কোনো সুযোগ নেই। ৩৪ বছর বয়সী আয়েশা বলেন, গ্রামের চিকিৎসকের কাছ থেকে তিনি ওষুধ কিনেছিলেন। কিন্তু তা খাওয়ার পরেও তার গর্ভপাত হয়নি।

আয়েশা বলেন, একজন বিধবা হিসেবে আমাদের সমাজে গর্ভপাতের জন্য সাহায্য চাওয়াও অনেক কঠিন। কাজেই গর্ভধারণ থেকে মুক্ত হওয়ার অন্য উপায় খোঁজাও আমি বন্ধ করে দেই। আমি সবকিছুই আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিয়েছি।

২০১৭ সালের আগস্টে তিনি যখন পাঁচ মাসের গর্ভবতী, তখন তার গ্রামে নতুন করে সামরিক অভিযান শুরু হয়। এতে প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হন।

বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়ার পর তিনি আরেকবার গর্ভপাতের চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু এতদিনে অনেক বেশি দেরি হয়ে গেছে। তাছাড়া, বাংলাদেশের আইনে প্রথম তিন মাস পর গর্ভপাত নিষিদ্ধ। গর্ভপাতের এই অবৈধ প্রক্রিয়ায় তার জীবন হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে চিকিৎসকরা তাকে হুশিয়ারি করে দেন।

আয়েশা বলেন, আমার ঘরে আরও ছোট ছোট সন্তান আছে, কাজেই আমি আর ঝুঁকি নিতে চাইনি।

আয়েশার মতো এমন আরও কত নারী আশ্রয়শিবিরে আছেন, তার সঠিক পরিসংখ্যান কারও জানা নেই। এমএসএফ জানিয়েছে, ২৫ ফেব্রয়ারি পর্যন্ত যৌন সহিংসতার শিকার ২২৪ নারীকে তারা চিকিৎসা দিয়েছে। এমন বহু নারী আছেন, যারা সহিংসতার শিকার হয়ে সামাজিক কলঙ্কের ভয়ে সাহায্য চাইতে আসেননি।

জানুয়ারিতে এমএসএফের হাসপাতালে বহু নারীকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখা গেছে। ধাত্রীদের ধারণা, এসব নারীরা বাসায় গর্ভপাতের চেষ্টা চালিয়েছেন।

জাতিসংঘের যৌন সহিংসতা বিষয়ক বিশেষ দূত প্রমিলা পাতেন বলেন, রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা চালানোর সময় মিয়ানমার সেনাবাহিনী ধর্ষণকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে। রোহিঙ্গাদের সমূলে উৎপাটন করতে দিতে সেনাবাহিনী পরিকল্পিতভাবে এটাকে হাতিয়ার হিসেবে কাজে লাগিয়েছে।

আবার আসা যাক আয়েশার কথায়। গত ২৬ জানুয়ারি আয়েশা একটি পুত্র সন্তানের জন্ম দেন, যার নাম রাখা হয়েছে ফয়েজ। তার মায়ের ওপর দিয়ে অনেক যন্ত্রণা ও নিপীড়নের ঝড় বয়ে যাওয়ার পরও শিশুটি দেখতে চনমনে হয়েছে।

আয়েশা বলেন, তার সন্তানটি খুব ফুটফুটে ও উচ্ছল। সবসময় সে খুব হাসিখুশি থাকে।
কিন্তু ফয়েজ দুনিয়াতে আসার পর তাদের পরিবার ও সমাজে বিভক্তি দেখা গেছে।আয়েশার দুই মেয়ে বলল, এই নবজাতকটি তাদের ভাই হতে পারে না। তাকে কোনো এতিমখানায় দিয়ে আসা উচিত।

কিন্তু আয়েশা তার মেয়েদের বোঝাতে চেষ্টা করলেন, সে আমাদের মতোই অন্যায়ের শিকার। তাকে আমরা ফেলে দিতে পারি না।

আয়েশা তার মেয়েদেরও বিষয়টি বোঝাতে চেষ্টা করছেন।মেয়েদের তিনি বলেন, এই গর্ভাবস্থা আমার ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। এখানে আমার কোনো হাত নেই। কাজেই আমার লজ্জিত হওয়ারও কিছু নেই।

শেষ পর্যন্ত তিনি তার মেয়েদের বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন। তারা এখন ফয়েজের সঙ্গে খেলাধুলা করছে। তাকে ভালোবাসা শুরু করে দিয়েছে।

আয়েশা নিজেও যে তাকে ভালোবাসেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এক নৃশংসতার প্রতিফলন হিসেবে শিশুটি পৃথিবীতে এসেছে। তাকে তিনি কোথায় ফেলে দিবেন।

আয়েশার ভাষ্য, সে তো শিশু। তার কোনো দোষ নেই। সে নিরপরাধ। আমার অন্য সন্তানদের মতো তাকেও ভালোবাসি। তাকে নিয়ে আমার ভেতরে ভিন্ন কোনো অনুভূতি হচ্ছে না।

রোহিঙ্গা অ্যাকটিভিস্ট কো কো লিন বলেন, যৌন সহিংসতার শিকার হয়ে গর্ভবতী হওয়ার ১৫টি ঘটনা তিনি স্বচক্ষে দেখেছেন। কিন্তু তিনি নিশ্চিত, এরকম আরও বহু ঘটনা অজানা রয়ে গেছে।

মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের জরিপ বলছে, দুই তৃতীয়াংশ নারী যৌন সহিংসতার শিকার হলেও তারা কর্তৃপক্ষ কিংবা দাতব্য সংস্থার কাছে তা জানাননি। লজ্জা ও কলঙ্কের কথা মাথায় রেখে তারা এমনটা করছেন।

যমুনা অনলাইন: টিএফ





সম্পর্কিত আরও পড়ুন





Leave a reply