কাজীদার শেষ হাসি, বিদায় রানা!

|

ছবি: সংগৃহীত

স্টার্নে দাঁড়িয়ে থাকা চিরকালের গোমড়ামুখো পাহাড় রডরিকের চেহারা ভুলতে বসেছে রানা। দড়ি ধরে ঝুলতে থাকা স্বর্ণহৃদয় ল্যাম্পনির ঠিকানা হয়েছে ভারত মহাসাগরের অতলে। জেগে নেই নিয়াপলিটান সুরে কথা বলতে বলতে একদিন কে এল সায়গলের ‘সো যা রাজকুমারি’ শোনানোর মাধ্যমে হঠাৎ ঘুম পাড়াতে চাওয়া লুবনা আভান্তি। রাফেলা বার্ডের সত্যিকার নামটা যে আর কোনোদিনও জানা হবে না, সেই ট্র্যাজেডি আজ ছড়িয়ে গেলো যেন দূর অন্তরীক্ষে।

জেগে নেই চিরকালীন প্রেমিকা সোহানা চৌধুরী। ঘনিষ্ঠ বন্ধু সোহেল একনাগাড়ে বলে যেতে পারতো সুলতা রায়, মিত্রা সেন, অনীতা গিলবার্ট, লুইসা পিয়েত্রো, সবিতাদের নাম। আহ, রেবেকা সাউল! বাঁধনে না জড়ানো মানুষটিকে তো এই মেয়েটা তো বেঁধেই ফেলেছিল প্রায়। কেবল কাপু উ সেনের অব্যর্থ নিশানায় হারিয়ে গেল মেয়েটা। এরপরই রানাকে দক্ষিণ মেরু ঘুরিয়ে আনলো ফ্রেডারিখ সাউল। গ্লেসিয়ারের প্রান্তে দাঁড়িয়ে রানা একবার ভেবেছিল, থম্পসন আইল্যান্ডের গল্পটা বুড়োকে বলতে হবে, যদি কোনোদিন বেঁচে ফিরতে পারে লোকালয়ে।

বেঁচে ফিরেছিল রানা; বাঁচাতে পারেনি অনেককেই। তেমনি বেঁচে নেই শিখা শঙ্কর, ভিটো, লরা আভান্তিরা। বা ব্যাকগ্যামনটা চমৎকার খেলা চৌকস সেই ইতালিয়ান পুলিশ অফিসারের নামই তলিয়ে গেছে বিস্মৃতির অতলে। বহুদিন আপাত নিরুত্তাপ কিন্তু প্রচণ্ড উষ্ণ সম্পর্ক বয়ে বেড়ানো ভিনসেন্ট গগলের সাথে কোনো লেনদেন নেই মাসুদ রানার। গোজোর পাবে নেই কোনো কানাকানি। মাল্টা কিংবা বিসিআইয়ের মতিঝিলের অফিস, সর্বত্র কে যেন বাঁশিতে চড়িয়েছে বিষাদী এক সুর; অলক্ষ্যে কে যেন পুড়িয়া ধানেশ্রী ছড়াচ্ছে মাঠে।

বুড়ো রাহাত খানের কক্ষে চুরুটের ঘন মেঘের ওপাড় থেকে নতুন কোনো চ্যালেঞ্জ শুনে সুখ মিশ্রিত ভয়ে কেঁপে উঠবেন না কোমলে-কঠোরে মেশানো অদ্ভুত এক চরিত্র মাসুদ রানা; যে টানে সবাইকে কিন্তু বাঁধনে জড়ায় না। তবে জীবন-মৃত্যুর মতো অদ্ভুত জায়গায় যেন রানাকে বেঁধে ফেলেছিল এক অন্ধকারের বন্ধু; পাঠকরা তাকে চিনবেন পাগল বিজ্ঞানী নামে। একমেবাদ্বিতীয়ম কবির চৌধুরী অনেকবারই ঘোল খাইয়ে ছেড়েছেন রানাকে। রুডলফ গুন্থার বা গুস্তাভ তাতাভস্কিরা হারিয়ে গেছেন, হারিয়ে যেতে হয় বলে।

ধ্বংসপাহাড় সেই বেরিয়েছিল ১৯৬৫ সালের মে মাসে। রানার বয়স আটকে আছে সেই আটাশেই। তবে অগ্নিপুরুষের স্রষ্টা কাজীদা ছাড়িয়ে গেছেন এই পৌনঃপুনিকতা, শুরু করেছেন অনন্ত যাত্রা। যে যাত্রায় তার সঙ্গী হওয়ার জন্য বিশেষভাবে হাঁটা সেই এসপিওনাজ এজেন্টও পারবেন না পথ চিনে নিতে; হাঁটার সময় যার পায়ের বাইরের অংশগুলো আগে ছোঁয় মাটি। কাঁচাপাকা ভুরুর সেই বুড়ো হয়তো আজ কটমট করে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করবেন, কাল রাতটা কোন চুলোয় কাটিয়েছিলে? গিলটি মিয়া হয়তো জিজ্ঞেস করবে, চুরিডা একদম সাইরে দিছি ছ্যার! সোহেল হয়তো তার একহাত দিয়েই ঘুষি মেরে বলবে, কিরে শালা? ট্রিট কই?

অদ্ভুত মায়াময় চোখজোড়াকে কেবল পিরিচ আকৃতির রোদচশমায় লুকোবার ব্যর্থ চেষ্টা করবে রানা। এড়িয়ে যাবে সকল প্রশ্ন, সকল সঙ্গ। শেষ হাসি হেসে কাজীদা ছেড়েছেন এ পৃথিবী। বস শেষবারের মতো অ্যাসাইনমেন্ট দিয়ে বলেছেন, বিদায় রানা। আজ অশ্রু দেখানো মানা!

আরও পড়ুন: সেবা প্রকাশনীর কর্ণধার কাজী আনোয়ার হোসেন আর নেই





সম্পর্কিত আরও পড়ুন





Leave a reply