কয়েক প্রজন্মের শৈশব-কৈশোরের স্মৃতি নিয়ে নারায়ণ দেবনাথের বিদায়

|

ছবি: সংগৃহীত

হাঁদা-ভোঁদা, বাঁটুল দ্য গ্রেট, নন্টে-ফন্টের সাথী হয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্ম বড় হয়ে গেল, এক জোড়া চোখের সামনে পেরিয়ে গেল অর্ধশতাব্দী কাল। আজ স্থির হয়ে গেছে সেই চোখ জোড়া; কয়েক প্রজন্মের শৈশব-কৈশোর নিয়ে বাংলা শিশুসাহিত্যের কমিকস ধারার একেশ্বর-সম্রাট নারায়ণ দেবনাথ জানিয়েছেন চিরবিদায়। রেখা ও লেখা দিয়ে ‘কাল’কে অতিক্রম করা এই মহাপ্রাণ ত্যাগ করেছে শেষ নিঃশ্বাস। কিন্তু পরিচয়কে বহন করে চলার এই ভারী জীবনে কেবল মলাট উলটেই বয়স-সময়-পরিচয়ের গৎবাঁধা বাস্তবতা ও হিসেবকে ভুলিয়ে দেয়া জগতের হদিস জানিয়ে দেয়া এই মহাপ্রাণ যে দাবি করে অমরত্ব!

অবশ্য অমর তো তিনি হয়ে আছেন বহু আগে থেকেই। হাঁদা-ভোঁদা, নন্টে-ফন্টে, কেল্টু, বাঁটুল দ্য গ্রেট, সুপারিন্টেন্ডেন্ট স্যাররা চিরকালই বাঙালির হৃদয় ও স্মৃতিতে হেঁটে চলে বেড়াবে কমিক্যাল ঢঙে। বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘতম কমিক স্ট্রিপ হাঁদা-ভোঁদা’র সাথে শৈশবের সুপারহিরো হলিউডের টারজানের মতো বডিবিল্ডারের আদলে নারায়ণ দেবনাথ সৃষ্টি করেন বাঁটুল দ্য গ্রেট। সে এমনই এক সুপারহিরো, যার গায়ে গুলি করলে ছিটকে ফিরে আসে বুলেট, যিনি অনায়াসে গিঁট পাকিয়ে দিতে পারেন ভূতের দুই হাতে, যিনি ফুটবলে শট মারলে তা স্ট্রাটোস্ফিয়ারের সীমানা ভেঙে বরফ ছুঁয়ে ফিরে আসে, বাঙালির চির চেনা মধ্যবিত্ত মানসে এমন সুপারহিরো যে বিস্মৃতপ্রায়। তবে বাংলা কমিকসের একচ্ছত্র সম্রাটের দেখানো পথে হেঁটেছেন বাংলা শিল্প ও সাহিত্য নামক মহাবৃক্ষের অন্যান্য বিভিন্ন শাখায় বিচরণ করা অগণিত নারায়ণ-ভক্ত। বাঁটুল দ্য গ্রেটের হাতে দুষ্টের দমন আর শিষ্টের পালনের থিমেটিক বিশ্লেষণের ফলই হয়তো চাচা চৌধুরি-সাবু থেকে শুরু করে অগ্নিপুত্র-অভয়, বিল্লু, পিংকি, রমণের মতো অনেক কমিক সিরিজের বেশ কিছু আনন্দদায়ী গল্প।

ছবি: সংগৃহীত

ছোটবেলা থেকেই আঁকাঝোঁকার দিকে খুব ঝোঁক ছিল নারায়ণ দেবনাথের। তারপর যখন ইচ্ছেমতন ছবি আঁকাটা নেশার মতো হয়ে উঠলো, তখন আত্মীয়স্বজনেরা সব একযোগে বাবা হেমচন্দ্রকে বললেন যে, দাও ছেলেকে আর্ট স্কুলে ভর্তি করে। দ্বিতীয়বার বলতে হল না, হেমচন্দ্র ছেলের মতিগতি বুঝে তাঁদের কথায় গুরুত্ব দিয়ে একে-ওকে ধরে ছেলেকে ভর্তি করে দিলেন আর্ট স্কুলে। সেখানকার পাঠ চুকলে নারায়ণ ভর্তি হলেন ইন্ডিয়ান আর্ট কলেজে। তখন চারদিকে বাজছে যুদ্ধের দামামা। কলকাতার রাস্তা ব্ল্যাক আউট হচ্ছে প্রতি রাতে, গ্রামের দুর্ভিক্ষ শহরে এসে হানা দিচ্ছে, ভাত নয় একটু ফ্যান পাবার আশায় গ্রামের মানুষ শহরে ছুটে আসছে। এই পরিস্থিতিতে কলেজের পাঠ আর শেষ হল না। পেটের চিন্তা আর কাজের সন্ধানে নারায়ণও নামলেন পথে। সিনেমার স্লাইড-বিজ্ঞাপন আঁকা, বিভিন্ন কোম্পানির লোগো, আলতা-সিঁদুরের প্যাকেটের ডিজাইন তৈরির মতো কোনো কাজকেই সামান্য মনে করেননি তিনি। প্রুফ-রিডার এক বন্ধুর সহায়তায় বিখ্যাত প্রকাশন সংস্থা ‘দেব সাহিত্য কুটীর’ এর পত্রিকা ‘শুকতারা’র সম্পাদক ক্ষীরোদচন্দ্র মজুমদার একদিন নারায়ণকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, বিদেশি পত্রিকায় যেমন ছোট্ট কমিক ছবির সাথে গল্পও থাকে, তেমন করে তিনি ছোটদের জন্য লিখতে পারবেন কি না। সেই প্রশ্নমূলক প্রস্তাবে এক কথায় রাজি হয়ে গিয়েই শুরু হয়ে গেল নারায়ণ দেবনাথের রেখক-লেখক জীবন।

ছবি: সংগৃহীত

প্রথমে জন্ম হল, কমিক চরিত্র ভোঁদা-র। প্রধান এই এক চরিত্র নিয়েই ছোট্ট ছোট্ট কমিকস চলল কয়েক বছর। তারপর খুদে পাঠকদের চাহিদা এবং সম্পাদকের ইচ্ছায় কমিকসটির পাতার বরাদ্দ বাড়লো, বাড়লো গল্পের আয়তন। জুটলো ভোঁদার দোসর, ‘হাঁদা’। বাংলা ১৩৬৯ (ইংরেজি, ১৯৬২) সালের অগ্রহায়ণ সংখ্যায় প্রকাশিত হল ‘হাঁদা ভোঁদার জয়!’। প্রথম গল্পেই পাঠকমহলে ঘোষিত হল হাঁদা-ভোঁদা জুটির জয়জয়কার!

১৯৬৫-তে ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধের সময় নারায়ণ সৃষ্টি করলেন মজার চরিত্র ‘বাঁটুল’-কে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আমেরিকান কমিকসের জগতে যেমন প্রচুর সুপারহিরোর আবির্ভাব ঘটেছিল, ঠিক সেরকমই যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে অপ্রতিরোধ্য ভারতীয়র প্রতিনিধি হয়ে বাঙালি সুপারহিরো বাঁটুলের ঘটলো আবির্ভাব। বিশাল ছাতিবিশিষ্ট অদ্ভুত চেহারায় বাঁটুলের কিম্ভূত কাণ্ডকারখানা অচিরেই চিত্তহরণ করলো শিশু-কিশোরদের।

ছবি: সংগৃহীত

১৯৬৯-এ যখন ‘নন্টে আর ফন্টে’ প্রকাশিত হল; তখন এই দুই বিচ্ছু দ্রুতই হয়ে উঠলো খুদে পাঠকদের নয়নের মণি। সেই যে শুরু হলো পত্রিকার পাতায় এই জুটির দস্যিপনা, তা আর থামেনি কয়েক পরবর্তী কয়েক দশকে।

এই বড় বয়সে যখন ভিড় করে নানা ময়নাতদন্ত মার্কা প্রশ্ন, নারায়ণ দেবনাথ এই যে সৃষ্টি করে গেলেন একের পর এক চরিত্র, এদের তিনি পেলেন কোথায়! কারণ, পাড়ায় বিচ্ছু বা পালোয়ান মার্কা ছেলের অভাব তখনও ছিল না, এখনও নেই। বাবার গয়নার দোকানে মাঝেসাঝে এসে যখন বসতেন বালক নারায়ণ, তখন পাড়ার বিচ্ছু ছেলেরা উল্টোদিকের একটি মিষ্টির দোকানে আড্ডা জমাতো, আর ঘটিয়ে ফেলতো নানা কাণ্ডকারখানা। সে সব দেখে বালক নারায়ণ মজা তো পেতেনই, তাছাড়া তার নিজেরও বিচ্ছু বন্ধুবান্ধব কিছু কম ছিল না, আর অদ্ভুত কর্মকাণ্ডে তারাও কম যেত না। ফলে কখন যে নারায়ণের পাড়া হয়ে গেল বাঙালির মনোজগতের ইউনিভার্সাল পাড়া, আর সেই বিচ্ছু আর মুগুর ভাজা পালোয়ানরা হয়ে পড়লো শৈশব-কৈশোরের অকৃত্রিম সঙ্গী, সে হিসেব বোধহয় রাখেননি খোদ বাংলা শিশুসাহিত্যের কমিকস ধারার এই সম্রাটও। তিনি যে রেখা-লেখার জগতের বাইরে অন্যান্য অনেক কিছুই নিয়েই মাথা ঘামান না, তেমনটি জানিয়েছিলেন নারায়ণ দেবনাথ। বলেছিলেন, ৯৬ বছর পর্যন্ত মানুষ সাধারণত বাঁচে না। সেখানে দাঁড়িয়ে তিনি হিসেব রাখেন না তিনি, কী পেলেন জীবনে। যে কাজটা করবো, সেটা সেরা কাজই হবে। আর তাতে কী পেলাম, আই ডোন্ট কেয়ার!

এম ই/





সম্পর্কিত আরও পড়ুন





Leave a reply