প্রতিবন্ধী রাশেদুলের দুর্লভ মুদ্রার সংগ্রহশালা

|


জিল্লুর রহমান পলাশ, গাইবান্ধা:

প্রতিবন্ধীতা যে জীবন চলার পথে বাধা হতে পারে না তার উদাহরণ গাইবান্ধার রাশেদুল ইসলাম। দীর্ঘ ১৮ বছরে দেশি-বিদেশি ২৫ হাজারের বেশি প্রচলিত-অপ্রচলিত কয়েন ও কাগজের নোটের দুর্লভ সংগ্রহশালা গড়ে তুলেছেন তিনি। এছাড়া তার সংগ্রহে রয়েছে সোনা-রুপার প্রলেপ যুক্ত ধাতব মুদ্রা আর দেশের বিলুপ্ত অনেক কড়িও। ছেলে বিপ্লবের নামে এই সংগ্রহশালা নামকরণ করেন ‘বিপ্লব পয়সা মহল’।

null

শারীরিক প্রতিবন্ধী রাশেদুল পেশায় সেলুন কর্মচারী (নরসুন্দর) হয়েও নিজ বাড়িতে গড়ে তোলেন সংগ্রহশালা। অনেকে দেখতে দেখে বিস্মিত হন অনেকে। আগামী নতুন প্রজন্মকে বিশ্বের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সম্পর্ক জানাতে বিচিত্র ভান্ডারকে একটি জাদুঘরে প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেন রাশেদুল ইসলাম।

null

গাইবান্ধা শহর থেকে ৪৫ কিলোমিটার দুরে সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের জামাল গ্রামে বাড়ি মুদ্রা সংগ্রাহক রাশেদুল ইসলামের। ওই গ্রামের মৃত্যু জমসের আলী ছেলে রাশেদুল ইসলাম। টিনের ছাপড়ার ছোট ছোট তিনটি ঘরের এই বাড়িটি এখন সবার কাছেই পরিচিত ‘বিপ্লব পয়সা মহল’ হিসেবে। শারীরিক প্রতিবন্ধী ও পারিবারিক দরিদ্রতার কারণে লেখাপড়া করা সম্ভব হয়নি রাশেদুলের। তাই জীবিকার তাগিদে বাপ-দাদার পেশাকেই বেছে নিয়ে সেলুনের (নরসুন্দর) কর্মচারী হিসেবে কাজ করেন রাশেদুল ইসলাম। সংসারে মা, স্ত্রী ও এক সন্তান রয়েছে রাশেদুল ইসলামের।

null

সরেজমিনে তার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, গত ১৮ বছরে রাশেদুলের সংগ্রহশালায় জমা হয়েছে বিশ্বের ৩০টি দেশের প্রচলিত-অপ্রচলিত কাগজের নোট ও মুদ্রা। বিট্রিশ আমলের মুদ্রার পাশাপাশি সোনা-রুপার প্রলেপ যুক্ত ধাতব মুদ্রাও রয়েছে সংগ্রশালায়। আছে বাংলাদেশের এক পয়সা, পাঁচ পয়সাসহ বিভিন্ন সময়ের সকল প্রকার কয়েন ও কাগজের নোটও। এছাড়াও সংগ্রহশালায় রয়েছে প্রাচীনতম বিলুপ্ত বেশ কিছু কড়ি। নিজ বাড়িতে মাটির হাড়ি, মাটির সড়া, পলিথিন ও কাগজ মিলে বড় একটি কাঠের বাক্সে এসব মুদ্রা সংরক্ষণ করেন রাশেদুল।

null

রাশেদুল ইসলাম বলেন, ‘এক সময় হঠাৎ করেই শখের বশেই মুদ্রা সংগ্রহ শুরু করি। সময় গড়ানোর সঙ্গে সে শখটি পরিণত হয় নেশায়। এরপর ২০০০ সাল থেকে পুরোদমে মনোনিবেশ করি মুদ্রা সংগ্রহে। কখনো আত্মীয়স্বজন আবার কখনো দূরদূরান্তে গিয়েও পরিচিতজনদের মাধ্যমে মুদ্রা সংগ্রহ করি।

null

রাশেদুলের এমন প্রচেষ্টায় সহায়তা করেন এলাকার প্রবাসীরাও। সংগ্রহশালার জন্য জোগার করে দেন বিভিন্ন দেশের মুদ্রা। সেলুন থেকে প্রতিদিন রোজগারের টাকা দিয়ে সংসার চালানোর পর মুদ্রা সংগ্রহের পিছনে টাকা খরচ করেন রাশেদুল। অনেক সাধনা ও পরিশ্রমের পর একে একে সংগ্রহশালায় জমা হতে থাকে মুদ্রা।

রাশেদুল বলেন, ‘সংগ্রহশালায় বিশ্বের ৩০ দেশ ছাড়া বাংলাদেশের প্রচলিত-অপ্রচলিত মিলে অন্তত ২৫ হাজারের বেশি ধাতব মুদ্রা, ব্যাংক নোট ও কয়েন রয়েছে। এছাড়া প্রাচীন বিলুপ্ত হওয়া বেশ কিছু কড়িও রয়েছে। এসব মুদ্রা দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির পরিচয় বহন করে। তাই নিজ বাড়ি ছাড়াও বিভিন্ন স্কুল-কলেজ ও সরকারি-বেসরকারি অনুষ্ঠানে গিয়ে এসব মুদ্রার প্রদর্শনী করি। আগামী প্রজন্মের জন্য তিলেতিলে গড়া সংগ্রহশালাকে একটি মুদ্রার জাদুঘর গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেন রাশেদুল। এজন্য স্থানীয় প্রশাসন, সরকারসহ সকলের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি’।

null

এদিকে, রাশেদুলের প্রাচীন ও দুর্লভ সংগ্রহশালার গল্প ছড়িয়ে পড়ায় প্রতিদিন বাড়ীতে আসেন শিক্ষার্থীসহ নানা বয়সের দর্শনার্থী। তবে অবকাঠামো সমস্যার পাশপাশি সংরক্ষণ ব্যবস্থা না থাকায় সকল মুদ্রাগুলো দেখতে না পেরে ফিরে যেতে হয় অনেককে।

রাশেদুল ইসলামের স্ত্রী বেলী বেগম বলেন, ‘অভাবের সংসার তাদের। সামান্য রোজগারে খেয়ে না খেয়ে দিন কাটে তাদের। কিন্তু মুদ্রা সংগ্রহে তার স্বামীর নেশাকে কোন ভাবেই থামাতে পারিনি। তার স্বপ্ন নিজ বাড়িতে জাদুঘর প্রতিষ্ঠার। কিন্তু সেই স্বপ্নপূরণ হবে কিনা জানিনা। তবে স্বামীর স্বপ্ন পূরণে সকলের সহযোগিতা চাই’।

null

রাশেদুলের সংগ্রহশালার বিষয়ে সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) এসএম গোলাম কিবরিয়া বলেন, ‘রাশেদুল ইসলাম দুর্লভ সংগ্রহশালার অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয়টি জেলা প্রশাসককে জানানো হয়েছে’।

এ বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘রাশেদুলের এমন সংগ্রহশালা একটি দৃষ্টান্ত। জেলা প্রশাসকের সাথে আলোচনা করে রাশেদুল ইসলামের সংগ্রহশালা সংরক্ষণ ও অবকাঠামো উন্নয়নে উদ্যোগ নেয়া হবে’।

null

রাশেদুল ইসলামের প্রতিবেশী অবসরপ্রাপ্ত সৈনিক আসাদুজ্জামান বলেন, ‘রাশেদুলের এমন সংগ্রহশালা একটি দৃষ্টান্ত। কিন্তু অর্থের অভাবে মুদ্রাগুলো সংরক্ষণ ও সংগ্রহশালার অবকাঠামো করতে পারছেনা। তার সংগ্রহশালাকে একটি জাদুঘরে রুপান্তর করতে স্থানীয় প্রশাসন ও সরকারকে এগিয়ে আসার দাবি জানান তিনি’।









Leave a reply