ইরাককে হিরোশিমার চেয়েও বিষাক্ত করেছে যুক্তরাষ্ট্র

|

সময়টা ছিলো সকাল ৮টা। শিল্প সমৃদ্ধ শহর হিরোশিমার কর্মনিষ্ঠ জাপানিরা ছুটছে যার যার কর্মস্থলে। তখনই মার্কিনিরা ফেলেছিলো ‘লিটল বয়’-কে। ঠিক তিন দিন পর আরেক প্রাণচঞ্চল শহর নাগাসাকিতে ফেলা হয়েছিল ‘ফ্যাট ম্যান’-কে। দুটো আণবিক বোমাই মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়েছিল ওই দুই শহর। ওই বোমা দু’টির তেজস্ক্রিয়তা এখনও জাপানের জলে, স্থলে ও আকাশে রয়েছে গেছে। এর প্রভাবে জন্ম নিচ্ছে বিকলাঙ্গ, মানসিক প্রতিবন্ধী শিশু। মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে নানাবিধ মরণঘাতী রোগসহ আরও বিভিন্ন রকমের শারীরিক সমস্যায়।

ইরাকে ২০০৩ সালে শুরু হওয়া সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধে কোনো আণবিক বোমা ব্যবহার করা হয়নি। তাই হয়তো হিরোশিমা ও নাগাসাকির মতো তেজস্ক্রিয়তা আর তা থেকে সৃষ্ট অমানবিক সব পরিস্থিতি অনেকটাই রয়ে যাচ্ছে চোখের আড়ালে।

কিন্তু বিভিন্ন মাধ্যমের তথ্য ও গবেষণা চিত্র বলছে, ইরাকের জল, স্থল ও আকাশে তেজস্ক্রিয়তার পরিমাণ কোনো ক্ষেত্রে জাপানের ওই দুই শহরকে হার মানিয়েছে। অর্থাৎ হিরোশিমা-নাগাসাকির থেকে বিষাক্ত ইরাক।

দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্টে ২০১০ সালে ককবার্ন-এর লেখা ‘ফালুজায় মার্কিন আক্রমনের ফলাফল হিরোশিমার থেকে বিষাক্ত’ শীর্ষক এক প্রবন্ধে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী ক্রিস বাসবি, এবং মালাক হামদান ও ইনতেসার আরিয়াবি’র একটি গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরেছিলেন। এতে মার্কিন আক্রমনের ফলে ওই শহরটিতে ক্যান্সার, বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম, শিশু মৃত্যুর হার এবং বিভিন্ন ধরনের শারীরিক সমস্যা বৃদ্ধির বিষয়টি জানানো হয়।

এটি যে তাদের সেনাদের জন্যও ক্ষতিকর সে বিষয়টিও আমলে নেয়নি বিশ্বের সেরা দূষণ সৃষ্টিকারী মার্কিন সেনাবাহিনী। তারা কোনো নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করেই যেখানে-সেখানে ফেলে বিষাক্ত সব জিনিস, যা পরিবেশ ও মানব স্বাস্থ্য উভয়ের জন্য ক্ষতিকর। এমনকি ভিয়েতনাম ও পারস্য উপসাগরীয় যুদ্ধের ক্ষতিকর বিষয়গুলোও তারা বিন্দুমাত্র গুরুত্ব দেয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রে মিশিগান রাজ্যের স্বনামধন্য বিষ বিশারদ মোঝগান সাবাবিয়েস্ফাহানি’র মতে, “২০০২ থেকে ২০০৫ সালে মধ্যে প্রায় ছয় শত কোটি বুলেট ইরাকে ব্যবহার করা হয়েছে। এর পাশাপাশি ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের বোমায় দেশটির জনগণ ধাতব দূষণে আক্রান্ত।”

ক্ষয় হতে থাকা ইউরেনিয়াম: দীর্ঘকালীন আপদ

দক্ষিণ ইরাকের বাবিল ক্যান্সার সেন্টারের শরিফ আল-আলওয়াসি’র বরাত দিয়ে ২০১৩ সালে আল জাজিরা জানিয়েছিল, ২০০৩ সাল থেকে মার্কিন সেনাদের ব্যবহৃত ক্ষয়ে যাওয়া ইউরেনিয়াম (ডিপ্লেটেড ইউরেনিয়াম) নির্ভর অস্ত্র ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা বাড়িয়ে দিয়েছে।

গণমাধ্যমটি আরও জানিয়েছিল, “ডিপ্লেটেড ইউরেনিয়ামের অবশিষ্টাংশ ইরাকের জন্য দীর্ঘ মেয়াদি পরিবেশগত ঝুঁকির কারণ হয়েছে দাঁড়াবে। কেননা এ ধরনের ইউরেনিয়ামের তেজস্ক্রিয়তা সাড়ে চার শত কোটি বছর অবধি রয়ে যায়।

ওয়াশিংটন ডিসি ভিত্তিক সাংবাদিক বারবারা কোয়েপেল ২০১৬ সালে “তেজস্ক্রিয় ইরাক” শীর্ষক একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন। এতে তিনি তুলে ধরেন, ওই ডিপ্লেটেড ইউরেনিয়াম ভিত্তিক অস্ত্রগুলোকে ‘প্রচলিত’ বলা হলেও বস্তুতপক্ষে ওগুলো তেজস্ক্রিয় ও বিষাক্ত।

জাতিসংঘের অস্ত্র পরিদর্শক স্কট রিটারের পর্যবেক্ষক উদ্ধৃত করে কোয়েপেল লিখেছিলেন: “সবচেয়ে পরিহাসের বিষয় হচ্ছে গণ বিধ্বংসী অস্ত্র ধ্বংসে আমরা ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমন করেছিলাম। সেটা করতে গিয়ে আমরাই নতুন অস্ত্র (ডিপ্লেটেড ইউরেনিয়াম) ছুঁড়েছি। প্রকৃতপক্ষে এটাই হলো গণবিধ্বংসি অস্ত্র।”

হিরোশিমা-নাগাসাকিতে আণবিক বোমা, ভিয়েতনামে এজেন্ট অরেঞ্জ, আফগানিস্তানে বাঙ্কার বিধ্বংসী ডেইজি কার্টার ও ক্লাস্টার বোমা, এবং ইরাকে ডিপ্লেটেড ইউরেনিয়াম ব্যবহার করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে মার্কিনিদের ব্যবহার করা গুলি-বোমা অনেক জায়গাতেই অবিস্ফোরিত অবস্থায় রয়ে গেছে এবং সেগুলো পরিবেশ ও মানব স্বাস্থ্যের জন্য সব সময় হুমকি হয়ে থাকবে।

ইরাক আক্রমণের দেড় দশক পার হয়েছে। এখন আর যুদ্ধের দামামা দেখা না গেলেও দেশটির পরিবেশে সর্বব্যাপী যে বিষ ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে তা নিত্যদিন ইরাকীদের জন্য ভয়ঙ্কর দুর্ভোগ বয়ে নিয়ে আসবে। এই দুর্ভোগ শুধু বর্তমান প্রজন্মকে নয়, ভোগ করতে হবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে।

এর দায় প্রবল ক্ষমতাবান মার্কিনিদের এক দিন না এক দিন নিতেই হবে। ইতিহাস কি কাউকে ক্ষমা করে?

যমুনা অনলাইন: এফএইচ









Leave a reply