মানবিকতা যথেষ্ট নয়, চাই বেশি কিছু

|

“আপনি যদি ‘মানুষ ‘ শব্দটি একবার উচ্চারণ করেন
যদি অন্তর থেকে করেন উচ্চারণ
যদি বোঝেন এবং উচ্চারণ করেন ‘ মানুষ’ –
তো আপনি কাঁদবেন।”
(  আমার বন্ধু নিরঞ্জন – ভাস্কর চৌধুরী)

দরজায় কড়া নেড়ে ঠাঁই না পেলে, নিরাশ্রয়-নিরন্ন হয়ে মানুষ মরতো। রাষ্ট্র আর নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে যে ভয়াবহ নির্যাতন, মৃত্যুর মুখ থেকে কোনোরকমে পালিয়ে বেঁচেছে, তাকে যদি আবার সেদিকে ঠেলে দেয়া হতো – তার মত অমানবিকতা তো আর কিছু হতো না। অমানবিক হয়নি বাংলাদেশের মানুষ।

রাষ্ট্রের মানবিক সত্ত্বা নেই বটে, জনগণের মানবিক বৈশিষ্ট্যই তার কর্মকাণ্ডে প্রতিফলিত হয়। শুরুর দিকে প্রবেশ ঠেকাতে সীমান্ত আগলে রেখেছিলো বিজিবি। কিন্তু নদীর জল তো ঠিকই বাঁধের ফাঁকফোঁকর খুঁজে নেয়। রোহিঙ্গারাও তেমনি অপেক্ষাকৃত শিথিল সীমান্ত দিয়ে ঢুকে পড়ে। এদেশের মানুষের সহানুভূতি-সহমর্মিতার কারণেই সীমান্তে কড়াকড়ি অনেকটাই শিথিল হয়ে এসেছে।

প্রাণে বাঁচা গেল, এবার তো অন্ন-বাসস্থানের ব্যবস্থা করা চাই। নামমাত্র খাবার যা মিলছে, তাও স্থানীয় প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের উদ্যোগে। মাথা গোঁজার ব্যবস্থা করতে হাত পড়েছে বন-পাহাড়ে।

কিন্তু কতক্ষণ আর কতজনকে ধারণ করতে পারবে নিজের জনসংখ্যার ভারে ন্যুজ বঙ্গভূমি? যে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা আগেই এসেছে তাদেরও ফেরত যাওয়ার বা নেওয়ার খবর নেই। বানের জলের মতো আসছে মানুষ- শিশু থেকে বৃদ্ধ, শ’ ছাড়িয়ে হাজার, হাজার ছাড়িয়ে লাখ। কতজন আসছে তার ঠিকঠাক কোনো হিসাব নেই।

পরবর্তীতে এদের নিয়ে কোনো উদ্যোগ নিতে গেলে মিয়ানমারের কতজন নাগরিক বাংলাদেশে আছে, তা আন্দাজ করে বলতে হবে সরকারি কর্তাদের। ভাষা-সংস্কৃতি কাছাকাছি হওয়ায় এ দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের মানুষের সাথে মিশে যাওয়া কঠিন হবে না তাদের। এমন একটা অংশকে যদি আর আলাদাই করা না যায়, তার ঝুঁকিটাও কম নয়।

তাই বলতে চাইছি, রোহিঙ্গা ইস্যুতে কেবল মানবিকতা যথেষ্ট নয়।

কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে অন্য দেশগুলোর কাছে ভয়াবহতা বারংবার তুলে ধরা উচিত। ডেকে নিয়ে দেখানো উচিত কী দুর্বিষহ জীবনে ঠেলে দেয়া হয়েছে মানুষগুলোকে। যমুনা টেলিভিশনের এক অনুষ্ঠানে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক আমেনা মহসীন বলছিলেন, সম্ভব হলে ঢাকায় প্রতিদিন ব্রিফ করা উচিত। মিয়ানমারের অপরাপর প্রতিবেশীরা এর দায় এড়াতে পারে না। রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমিতে পুনর্বাসনের কোনো বিকল্প নেই, তার আগ পর্যন্ত কর্মপরিকল্পনা নিয়ে এগুনোর কথাও উঠে আসছে বিশ্লেষকদের তরফে। শুরু থেকেই একটা হিসেব থাকলে দরকষাকষিতে সুবিধা হতো।

বিদ্যমান পরিস্থিতি মাথায় রেখে, বাংলাদেশে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে অস্থিতিশীলতা ঠেকাতে কঠোর হতে হবে সরকারকে।

কঠোর হতে গিয়ে আবার চোখ কান বন্ধ করে, দুয়ার আটকে বসে না থাকি যেন। মানুষ ডাকছে তো, মানুষ মরছে তো, মানুষ তো! মানুষ!

সৌমিত্র শুভ্র: সাংবাদিক




Leave a reply