সুরাইয়ার মৃত্যুর এক সপ্তাহেও গ্রেফতার হয়নি কেউ

|

প্রেম করেছিলেন সুরাইয়া। বাবা মায়ের বিচ্ছেদ সত্ত্বেও তারা একমত হয়ে ভালোবাসার মানুষের হাতেই তুলে দিয়েছিলেন সুরাইয়াকে। কিন্তু সুখ তো নয়ই, বরং শ্বশুরবাড়ির অত্যাচারে শেষপর্যন্ত পেটে সন্তান নিয়েই গায়ে আগুন দিয়ে আত্মহত্যা করতে হয় সুরাইয়াকে। তার মৃত্যুর ঘটনায় মামলা করেছে পরিবার। কিন্তু মৃত্যুর সপ্তাহ পেরুলেও গ্রেফতার হয়নি কেউ।

তবে নেত্রকোণার পুলিশ সুপার মো. আকবর আলী মুন্সি জানালেন, এ ঘটনায় স্বামীসহ শ্বশুরবাড়ির লোকজনকে আসামি করে একটি মামলা হয়েছে। আসামিদের গ্রেফতারে পুলিশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলেও জানালেন তিনি।

সুরাইয়ার মৃত্যুর পর তার মা বলেন, আমাদের বিচ্ছেদের পর নানি এবং দাদির কাছে বড় হয় সুরাইয়া। সে ভেবেছিল, ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে ঘর বাঁধলে জীবনটা সুখের হবে। কিন্তু বিয়ের মাস দুয়েক পর থেকেই শ্বশুরবাড়িতে শুরু হয় তার ওপর নির্যাতন। যৌতুকের জন্য স্বামী, শাশুড়ি নানাভাবে অত্যাচার শুরু করে। ১৬ মাসের সংসারে দফায় দফায় সালিশ বৈঠক হয়েছে। কিন্তু মীমাংসা হয়নি, আমার মেয়ে জীবন দিয়ে এ নির্যাতনের মীমাংসা করে দিল। সন্তান পেটে নিয়েই আত্মহত্যা করলো আমার মেয়েটি। মৃত্যুর আগে সে একটি মৃত কন্যা সন্তান জন্ম দিয়েছিল।

পড়ুন: পেটে সন্তান নিয়েই আত্মহত্যা করতে হলো সুরাইয়াকে

লাবণ্যর বাবা বলেন, দেখে মনে হচ্ছিল, লাবণ্যর বাচ্চাটাও খুব কষ্ট পেয়েছে। মৃত সন্তান জন্ম দেওয়ার পর লাইফ সাপোর্টে চিকিৎসাধীন ছিল সে। এরপর আর কথা বলেনি আমার মেয়ে। সুরাইয়াই চায়নি তার স্বামীকে যৌতুক দেক তার বাবা।

ঢাকার শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে লাইফ সাপোর্টে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে সুরাইয়া নেওয়াজ লাবণ্যর মৃত্যু হয়। সুরাইয়ার জন্ম দেয়া কন্যাসন্তানকে আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করেন। আর সুরাইয়া মারা যাওয়ার পর নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার গাখাজোড়া গ্রামে শুক্রবার রাত ১১টায় পারিবারিক কবরস্থানে তার লাশ দাফন করা হয়।

সুরাইয়ার মামা জাহাঙ্গীর মাহমুদ বলেন, ৯ অক্টোবর সন্ধ্যা ৭টার দিকে স্বামী শাহীন আলমের সঙ্গে সুরাইয়ার কথা হয়। এরপরই গায়ে আগুন দেয় সে। এ ঘটনার বিষয়ে শ্বশুরবাড়িতে সংবাদ দেওয়া হয়েছিল কিন্তু তারা কেউ কোনো খোঁজও নেয়নি।

সুরাইয়ার শ্বশুরবাড়ি ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলায়। তাকে সেখান থেকে এনে কলমাকান্দার গাখাজোড়া গ্রামে দাদির কাছে রেখে এসেছিলেন তার বাবা আরিফুল ইসলাম হারুন। পাঁচ দিন আগে ওই বাড়িতে থাকা অবস্থায় ফোনে স্বামীর সঙ্গে কথা বলে রাগারাগি হওয়ার পর গায়ে আগুন দেয় সুরাইয়া।

লাবণ্যকে লালন পালন করা নানি জাহেরা খাতুন (৭০) আহাজারি করে বলেন মেয়েটিকে মুক্তিযোদ্ধা (মৃত) স্বামীর ভাতার টাকা জমিয়ে দেড় লক্ষাধিক টাকা খরচ করে অনেক স্বপ্ন নিয়ে বিয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু আগুনে পুড়ে সব ছাই হয়ে গলো।

সুরাইয়া নেওয়াজ লাবণ্যর বিষয়ে জানতে তার স্বামী শাহীন আলমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও পাওয়া যায়নি।

লাবণ্যের চাচা এ ঘটনায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। তিনি বলেন, আমার ভাতিজিকে প্রথমে ফুসলিয়ে বিয়ে করে যৌতুকের জন্য মারধর করতো। এসব নিয়ে অনেকবার বিচার বৈঠক হয়েছে। মেয়েটিকে বাড়িতে নিয়ে আসার পরও মোবাইল ফোনে হুমকি দিয়ে গালমন্দ করতো। ঘটনার আগেও তার স্বামী ফোনে যৌতুক চেয়ে হুমকি দিয়েছে।

এ ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাইলে নেত্রকোণার কলমাকান্দা থানার ওসি আবদুল আহাদ বলেন, এ বিষয়ে শনিবার থানায় মামলা হয়েছে। লাবণ্যর চাচা কলমাকান্দা উপজেলার গাখাজোড়া গ্রামের সাইদুল ইসলাম সাঈদ বাদী হয়ে স্বামী শাহীন আলম, ভাসুর শাহান মিয়া, শাশুড়ি মমতা আক্তার, ননদ শারমিন আক্তার, শ্বশুর আবু তাহের ও শাহীনের বন্ধু আশরাফুল ইসলামকে আসামি করে একটি মামলা দায়ের করেছেন। আসামিদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

লাবণ্যকে শ্বশুরবাড়িতে খাবার দাবারে অশান্তি দিতো বলে অভিযোগ করে সুরাইয়ার পরিবার। তাদের ভাষ্যমতে, আলু ভর্তা, ডাল ছিল তার নিয়মিত খাবার। চিকিৎসকের কাছে নিতেও নিষেধ ছিল স্বামী শাহীন আলমের। যেতে হলে বাবার বাড়িতে ফিরে যেতে হবে। গর্ভবতী লাবণ্যকে প্রচণ্ড মারধরও করতো তারা।


সম্পর্কিত আরও পড়ুন





Leave a reply