প্রিয় মার্ক জুকারবার্গ ভাই…

|

প্রিয় মার্ক জুকারবার্গ ভাই,

প্রথমেই আমার সালাম নিবেন। আমি বাংলাদেশের একজন আমজনতা, ইংরেজিতে ম্যাংগো পিপল বলতে পারেন। নাম মো: ফখরুল আবেদীন। এই দেশে এটাকে বলে ভাল নাম। আর ডাকনাম মিলন। আর তাই আপনার আবিষ্কৃত ফেসবুকে একাউন্ট খুলেছি ফখরুল আবেদীন মিলন নামে। আশা করি জাতীয় পরিচয় পত্র দেখতে চাইবেন না, আর দেখতে চাইলেও ছবির সাথে মিলাতে চাইবেন না।

তো যাই হোক, পর সমাচার এই যে, আপনার এই ফেসবুকের কল্যানে বহু হারিয়ে যাওয়া বন্ধু বান্ধব আর আত্মীয় স্বজনকে খুঁজে পেয়েছি। তাদের ছবি দেখতে পাওয়া ব্যাপক আনন্দের বিষয়। তবে ওইদিন প্রাক্তন প্রেমিকার ছবি দেখে খানিকটা মন খারাপ হয়েছিল। নাতনী কোলে তার ছবি দেখে তব্দা খেয়ে গিয়েছিলাম। তব্দা শব্দের ইংরেজী কি জানি না, জানলে ইংরেজীতে লিখতাম।

তবে আজকাল আর ফেসবুকে ঢুকতে ইচ্ছা করে না। খালি ক্যাঁচাল আর ক্যাঁচাল। হাঁচি দিলে ক্যাঁচাল, হাসি দিলে ক্যাঁচাল, ভালবাসায় ক্যাঁচাল, ভাল বাসায় ক্যাঁচাল, চালে, ডালে, পাতায়, ছাতায়, যাতায় ক্যাঁচাল আর ক্যাঁচাল।

তারপর আসেন জ্ঞানগর্ভ আলোচলায়। মোটামুটি সবাই জ্ঞানীগুণীজন। সবজান্তা শমসের গ্রুপের জ্বালায় তো টেকা দায়। খুবই হীনমন্যতায় ভুগী। কারন আমার তো কোন বিষয়েই জ্ঞান তো দূরের কথা, সামান্য গ ও নাই।

গতবছর মায়ানমারের সেনাবাহিনী বেশ পার্ট নিয়েছিল আমাদের সাথে। এই দেশের উপরে হেলিকপ্টার চালিয়ে বেশ একটা ভাব নিয়েছিল। কিন্তু যখন তারা ফেসবুক ঘেটেঘুটে দেখল যে এই দেশের প্রায় অর্ধেকের বেশী মানুষ যুদ্ধবিষয়ে এক্সপার্ট, তখন তারা ভয় পেয়ে নিজের দেশেই যুদ্ধ লাগিয়ে দিল।

আমরা কুইক লার্নার মানে যে কোন কিছু খুব দ্রুত শিখতে পারি। এই যেমন ধরেন ইউটিউব দেখে দেখে আমরা ট্যাংক চালানো থেকে শুরু করে এয়ারবাস এ-৩৮০ প্লেন চালানোও শিখে ফেলেছি। চাইলে পরীক্ষা করে দেখতে পারেন।

প্লেনের কথাই যখন আসল তখন আপনি নিশ্চই জেনেছেন নেপালে এই দেশের এক বিমান দুর্ঘটনায় ৫০ জনের মত মানুষ প্রান হারিয়েছেন। আমি যে তাদের নিয়ে শোক পালন করব তারও উপায় নাই। এখানেও চলছে সব এক্সপার্ট ওপিনিয়ন। কে কি কেন কোথায় কখন কিভাবে সব প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন আমাদের ভাই বেরাদাররা। এ ব্যাপারে নি:শ্বকবি মিলেন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন,

“বিশ্ব অবাক তাকিয়ে রয়,
এক দেশেতে এত এভিয়েশান এক্সপার্ট
কেমন করে হয়?”

কবি হয়ত জানেন না যে আমাদের দেশের মানুষ শুধু এভিয়েশান এক্সপার্টই নয়, চন্দ্র সুর্য গ্রহ তারা ইহকাল পরকাল মুদ্রানীতি নিদ্রানীতি ভূরাজনীতি কুরাজনীতি গালসাস্ত্র বালসাস্ত্র অর্থনীতি অনর্থনীতি মোবাইল অটোমোবাইল হেন কোন বিষয় নাই যে জানে না।

তো যাই হোক, অনেক নিজেদের প্রশংসা করলাম দেখে মাইন্ড করবেন না। কারন আমরা যাই করি, বেশী বেশী করি। কম কিছু করি না।

ভালবাসলে বেশী বাসি আবার ঘৃনা করলেও বেশী করি। তবে একটা ব্যাপারে আপনাকে আমি ধন্যবাদ দিতে চাই, আর সেটা হল, আপনার ফেসবুক না থাকলে জানতেই পারতাম না যে মানুষের মনে এত ঘৃনা।

আমাদের ফাঁকি দেয়া কিন্তু কঠিন ব্যাপার। এই যে সারা দুনিয়া স্টিফেন হকিং মারা গেছে বলে কেঁদে কেটে অস্থির, কিন্তু আমরা তো জানি যে জনাব হকিং দুই বছর আগেই মারা গেছেন। নিশ্চই প্রশ্ন করবেন এই দুই বছর আপনারা কাকে দেখেছেন? আরে বস রোবট রোবট। তারা হকিং সাহেবের রোবট বানিয়ে সারা বিশ্বকে বোকা বানাতে পারলেও আমাদের পারেনি আর পারবেও না। তবে হকিং ব্র‍্যান্ডের প্রেশার কুকার আবিষ্কারের জন্য আমাদের মনে জায়গা পাকা করে নিয়েছেন।

এত কথা এক চিঠিতে বললে আপনি তালগোল পাকিয়ে ফেলবেন। তাই পরিশেষে আপনার কাছে একটা অনুরোধ করি। সরি, অনুরোধই যখন করব একটা কেন করব? বেশী বেশীই করি।

আমার প্রথম অনুরোধ, ফেসবুকের একাউন্টগুলোকে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ভাগ করে দেন। যেমন একাউন্ট খোলার সময় জিজ্ঞেস করা যেতে পারে,

আপনি কি জন্য ফেসবুকে একাউন্ট খুলতে চাচ্ছেন বা খুলেছেন?

অপশান গুলো এই রকম হতে পারে:

১. বন্ধু বান্ধব আত্মীয় স্বজন এর সাথে যোগাযোগ রাখতে

২. লেখালেখি করার জন্য

৩. রেডিও মান্না, কাঠের কল্লা, ‘পেম আইছিল শব্দ করিয়া’ সহ বিভিন্ন পেজের আজগুবি নিউজ শেয়ার করার জন্য

৪. বন্ধুদের ইনবক্সে বেহেস্তে যাওয়ার সহজ তরীকা বাতলে দেয়ার জন্য

৫. আমার কিছু ভাল্লাগে না, কাউরে ভাল লাগতেও দিমু না

৬. সবার ছবিতে ‘লাইচ লাগছা’ কমেন্ট করার জন্য

৭. মেয়েদের আদার ইনবক্সে আজীবন ঠাঁই পাওয়ার জন্য

৮. সব কিছুতেই “আমি আলাদা” টাইপ জাহির করার জন্য

৯. আমি সবজান্তা শমসের, সবাইকে জ্ঞান দেয়ার জন্য

১০. আমি একটা ছাগল সেটা সবাইকে জানানোর জন্য

আপাতত আর কিছু মাথায় আসছে না। আরো যদি কিছু আমার বন্ধুদের মাথায় আসে তবে সেটা কমেন্ট থেকে দেখে নিয়েন।

এর উপর ভিত্তি করে আলাদা আলাদা গ্রুপ করে দেন। কেউ কাউকে দেখবে না অর্থাৎ ছাগল কি খাচ্ছে সেটা পাগল জানবে না আবার পাগল কি বলছে সেটা ছাগল জানবে না। আমার মত আমজনতা কাঁচা আম দিয়ে পাতলা মুশুরের ডাল দিতে ভাত খাওয়ার গল্প বলুক তার বন্ধুদের।

এখন সময় এসেছে মানুষ আর অমানুষ আলাদা করার। নয়তো আপনার এই ফেসবুকের পতন অনিবার্য।

এখনই যদি এই পদক্ষেপ না নেন, তাহলে আমাদের মত আমজনতারা ফেসবুক ছেড়ে চলে যাবে আর আপনি একদল ছাগল নিয়ে বসে থাকবেন যারা আপনার বউকে লিখবে ‘nic lagca’ আর আপনাকে লিখবে ‘pak u’..

আশা করি ফেসবুকের নাম ইডিয়েটবুক হবার আগেই ব্যাপারটা ভেবে দেখবেন।

আপনার উওরের অপেক্ষায় থাকলাম।

ইতি,

একজন আমজনতা

(ফখরুল আবেদীন মিলন: উপন্যাসিক, ব্যাংকার)









Leave a reply