আন্দোলনের মাধ্যমেই অবশেষে মাইগ্রেশনের অনুমতি পেলো নর্দান মেডিক্যালের ২৩৯ শিক্ষার্থী

|

রংপুর প্রতিনিধি:

নয় মাস আন্দোলনের পর অবশেষে মাইগ্রেশনের অনুমতি পেলেন অনুমোদনহীন রংপুরের নর্দান প্রাইভেট মেডিক্যাল কলেজের ২১ নেপালী শিক্ষার্থীসহ ২৩৯ জন।

১৯ সেপ্টেম্বর মাইগ্রেশনের অনুমতি দিয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য-শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ থেকে চিঠি ইস্যু করা হয়েছে। এর মাধ্যমে দোলাচলে থাকা চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন এখন বাস্তবায়নের পথে। এ নিয়ে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল যমুনা টেলিভিশন।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, গত জানুয়ারি মাসে আন্দোলন শুরু হওয়ার পর থেকেও মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কলেজটিকে বিধিমালা পরিপূর্ণ করার জন্য নানা সুযোগ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু কলেজ কর্তৃপক্ষ তা পূরণ করতে কোনো ধরনের আগ্রহ দেখাননি। উপরন্তু তারা বিধিমালা না মেনেই এমবিবিএসএ আবারও ভর্তির চেষ্টা এবং শিক্ষার্থীদের মাইগ্রেশনে বাধা তৈরি করেছিল। তা না হলে ফেব্রুয়ারি মাসেই বিএমডিসি কর্তৃক ২১ জনকে ইন্টার্নি করার সুযোগ দেয়ার সময়ই মাইগ্রেশন নিশ্চিত হয়ে যেতো।

মাইগ্রেশন সংক্রান্ত স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য-শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের উপ-সচিব রবিউল আলমের ১৯ সেপ্টেম্বর স্বাক্ষরিত চিঠিতে (স্মারক নং৫৯.০০০.০০০০.১৪১.০৬.০০১.২১.৫৫২) বলা হয়েছে, বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ স্থাপনা ও পরিচালনা বিধিমালা ২০১৯ (সংশোধিত) না মানায় ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষ হতে নর্দান প্রাইভেট মেডিক্যাল কলেজ, রংপুর এমবিবিএস কোর্সে ভর্তি কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়।

কলেজ কর্তৃপক্ষের স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারের আবেদনের প্রেক্ষিতে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর ২৭ জুলাই ২০২১ তারিখে সরেজমিনে প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করে প্রতিবেদন প্রেরণ করে। চিঠিতে আরও বলা হয়, গত ২ সেপ্টেম্বর স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ/ডেন্টাল কলেজ/আইএইচটি/ম্যাটস প্রতিষ্ঠা, স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার, আসন সংখ্যা বৃদ্ধি, নতুন কোর্স অনুমোদন ইত্যাদি সংক্রান্ত কমিটির সভায় তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়।

চিঠিতে আরো বলা হয়েছে, বিশ্লেষণ শেষে প্রয়োজনীয় শর্তসমুহ প্রতিপালন না করা এবং প্রতিষ্ঠানটি মানসম্মত করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের আগ্রহ পরিলক্ষিত না হওয়ায় অধ্যয়রনরত সকল শিক্ষার্থীর রাজশাহী মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অন্যান্য বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজে মাইগ্রেশনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালককে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের নির্দেশনা দেয়া হয়।

এই চিঠির পর শিক্ষা জীবন নিয়ে অনিশ্চিত থাকা ২১ নেপালীসহ ৫ শিক্ষাবর্ষের ২৩৯ জন শিক্ষার্থীর মুখে হাসি ফুটেছে। অবশ্য এই হাসি ফুটানোর পেছনে রয়েছে তাদের ধারাবাহিক আন্দোলন। যা নিয়ে ধারাবাহিক ও অনুসন্ধানী একাধিক প্রতিবেদন প্রচার করেছিল যমুনা টেলিভিশন।

স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ সূত্র জানায়, ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও শর্ত পুর্ণ না করায় কলেজটির একাডেমিক নবায়ন ও বিএমডিসির রেজিস্ট্রেশন বাতিল হয় ১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষে। আর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন বাতিল হয় পরের বছর। আর ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি কার্যক্রম স্থগিত ঘোষণা করে মন্ত্রণালয়।

কিন্তু এরপরই চতুরতার আশ্রয় নেয় কলেজ কর্তৃপক্ষ। হাইকোর্টে একটি রিট করে পত্রিকায় অনুমোদন থাকার মিথ্যা বিজ্ঞপ্তি দিয়ে ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষ পর্যন্ত ২১ নেপালীসহ ২৩৯ জনকে ভর্তি করায় কলেজটি। এভাবে প্রতিষ্ঠানটি পকেটস্থ করে শত কোটি টাকা, জানায় শিক্ষার্থীরা। এমনকি প্রতিষ্ঠানটিতে ২১ জন এমবিবিএস পাশ করে ১১ মাস ধরে ইন্টার্ন করতে পারছিলেন না। আর পাঁচটি শিক্ষাবর্ষের প্রায় আড়াইশ শিক্ষার্থীর জীবন হুমকির মুখে পড়ে।

সূত্র জানায়, এমন প্রেক্ষিতেই ইন্টার্ন করা ও মাইগ্রেশনের দাবিতে চলতি মাসের গত জানুয়ারি মাস থেকে ক্লাস পরীক্ষা বন্ধ করে দিয়ে প্রথমে ক্যাম্পাসের ভিতরে সকাল-সন্ধ্যা বিক্ষোভ করতে থাকে শিক্ষার্থীরা। এরই মধ্যে আন্দোলনে নামার খেসারত হিসেবে বিদেশী শিক্ষার্থীদের হোস্টেল থেকে বের করে দেয়া হলে তারা থানা ঘেরাও করে। এ নিয়ে তৈরি হয় লঙ্কাকাণ্ড।

প্রশাসনের হস্তক্ষেপে হোস্টেলে ফেরে বিদেশী শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনের এক পর্যায়ে ১৬ ফেব্রুয়ারি রংপুর মেডিক্যাল কলেজ ক্যাম্পাসে বাংলাদেশ মেডিক্যাল এন্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট ডা. শহিদুল্লাহ আসলে নর্দানের আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা তাকে ঘেরাও করেন। তার গাড়ি আটকিয়ে তার হাত পা ধরে ফেলেন শিক্ষার্থীরা। অনেকেই শুয়ে পড়েন গাড়ির সামনে। তিনি ঘোষণা দেন পরের দিনের মধ্যে মাইগ্রেশন ও ইন্টার্ন করার। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে পরের দিনের মধ্যেই এমবিবিএস পাশ করে ১১ মাস ধরে বসে থাকা শিক্ষার্থীদের ইন্টার্ন করার অনুমতি আসলেও মাইগ্রেশনের অনুমতি আসে নি। এতে ঝুলে যায় ২৩৯ শিক্ষার্থীর ভাগ্য।

বাধ্য হয়ে আবারও আন্দোলনে নামে তারা। এরই মধ্যে ক্যাম্পাসের সামনের বুড়িরহাট সড়ক অবরোধে মালিক পক্ষের লোকজনের মারধরে কয়েক শিক্ষার্থী আহত হলে আন্দোলন আরও কঠোর হয়। শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে ধারাবাহিকভাবে প্রতিদিন বিক্ষোভ ছাড়াও মেডিক্যাল মোড়ে কাফনের কাপড় গায়ে অবরোধ করে।

এতে প্রায় ৭ ঘন্টা রংপুরের সাথে সারা দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এছাড়াও আন্দোলন করতে গিয়ে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে উম্মে ফাতিমা, আবু রায়হান সরকার, মাহবুব হোসাইন নামের তিন শিক্ষার্থী। ক্যাম্পাসে নিয়মিত বিক্ষোভ, মানববন্ধন ছাড়াও শিক্ষার্থীরা দফায় দফায় মেয়র, বিভাগীয় কমিশনার, পুলিশ কমিশনার, ডিসি, স্বাস্থ্য পরিচালক, সিভিল সার্জন এর কার্যালয় ঘেরাও করে অবস্থান কর্মসুচি পালন করেন। এক পর্যায়ে ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনেও মাইগ্রেশনের দাবিতে মানববন্ধন করে শিক্ষার্থীরা।

এছাড়াও নগরীর কামালকাছায় এসোড সংলগ্ন কলেজটির বর্তমান চেয়ারম্যান ড. তাসকিনুর রহমান এবং পরিচালক শিরিন আখতারের বাড়িও দফায় দফায় গভীর রাত পর্যন্ত ঘেরাও করে শিক্ষার্থীরা। এরই মধ্যে কলেজটির চেয়ারম্যান ডা. তাসকিনুর রহমান সংবাদ সম্মেলন করে আন্দোলনকে অযৌক্তিক বললে সংবাদ সম্মেলন শেষে নিজ বাড়িতে তাকে অবরুদ্ধ করে রাখেন শিক্ষার্থীরা। পুলিশের হস্তক্ষেপে সে যাত্রায় রক্ষা হয় তার।

সূত্র জানায়, মালিকপক্ষ দফায় দফায় মাইগ্রেশন ঠেকাতে বিভিন্ন ধরনের তদবির অব্যাহত রাখেন। শেষ পর্যন্ত তারা তদবির করে ব্যর্থ হন এবং মাইগ্রেশনের সিদ্ধান্তে অটল থাকে সরকার।

কলেজটির শিক্ষার্থীদের আন্দোলন পরিচালনা কমিটির আহবায়ক ১৪-১৫ সেশনের শিক্ষার্থী আলমগীর হোসেন জানান, রক্তের বিনিময়ে আমরা মাইগ্রেশন পেয়েছি। এজন্য আল্লাহ তায়ালার কাছে শুকরিয়া করছি। কিন্তু আমাদের জীবন নিয়ে যারা ছিনিমিনি খেললেন তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয় নি। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হোক। এটা আমাদের দাবি।





সম্পর্কিত আরও পড়ুন







Leave a reply