নাটোরের রাজকন্যার ২৮৫টি প্রেমপত্রের সন্ধান

|

নাজমুল হাসান, নাটোর

নাটোর দিঘাপতিয়া রাজবাড়ির রাজকন্যা ইন্দুপ্রভা দেবীকে লেখা ২৮৫টি প্রেমপত্রের সন্ধান মিলেছে। গত ৫ মার্চ নাটোর ট্রেজারির চাবিহীন একটি ট্রাঙ্ক খুলে চিঠিগুলো দেখা যায়। এর আগে ২০০৩ সালে একই ট্রেজারিতে তার হাতে লেখা দশটি ডায়েরি পাওয়া যায়। এর মধ্যে একটিতে শুধু কবিতা। অন্যগুলোতে তাঁর আত্মজীবনী।

ইতিহাসবিদ সমর পালের তথ্যসূত্রে জানা যায়, নাটোরের দিঘাপতিয়া রাজবংশের চতুর্থ পুরুষ প্রমথনাথ রায়ের (১৮৪৯-১৮৮৩ খ্রিঃ) সর্বকনিষ্ঠ কন্যা ছিলেন ইন্দুপ্রভা দেবী। রানী দ্রবময়ীর গর্ভে ইন্দুপ্রভার জন্ম হয় ১৮৮২ খ্রিষ্টাব্দে। ইন্দুপ্রভার চার ভাই প্রমদানাথ (১৮৭৩-১৯২৫), বসন্তকুমার (১৮৭৪-১৯২০), শরৎকুমার (১৯৭৬-১৯৪৬), হেমেন্দ্র কুমার (১৮৭৭-১৯৩৯) ছিলেন স্বনামে উজ্জ্বল।

ইন্দুপ্রভাও ছিলেন শিক্ষিত ও সাহিত্যানুরাগী। আজ থেকে শতবর্ষ আগে নাটোরের এই রাজকন্যা কাব্যচর্চায় নিমগ্ন হয়ে মনের মাধুরী মিশিয়ে কবিতার সাথে গড়ে তুলেছিলেন নিবিড় সখ্যতা। মানুষ, প্রকৃতি, জীবন তাঁকে আলোড়িত করেছিল। ১৯৫৬ সালে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হলে নাটোরের রাজাসহ অন্যরা ভারতে চলে যায়। তখন তাদের অন্যান্য সম্পদের সাথে সাথে ইন্দুপ্রভার ডায়েরী ও চিঠিগুলি জমা ছিল নাটোর ট্রেজারির অন্ধকার কোণে।

দীর্ঘদিন পরে ২০০৩ সালে নাটোরের ইতিহাস প্রকল্পের কাজ করতে গিয়ে ডায়েরির কবিতাগুলো দৃশ্যমান হয় এবং কয়েকটা কবিতা আলোর মুখ দেখে। চমৎকার গোটা গোটা অক্ষরে লেখা কবিতার খাতাগুলো তাঁর শিল্পিত ও পরিশীলিত চেতনাকেই আলোকিত করে।

এর দীর্ঘদিন পর গত ৫ মার্চ একই ট্রেজারির চাবিহীন একটি ট্রাঙ্কের ওপরে রাজকুমারী ইন্দুপ্রভা নাম লেখা দেখতে পায় জেলা প্রশাসনের লোকজন। ট্রাঙ্ক খুলে একটি ছবি দেখা যায়। ছবিটির পরিচয় খুঁজতে গিয়ে ফ্রেম খোলা হয়। ফ্রেমের আড়ালেই লুকিয়ে ছিল রাজকুমারী ইন্দুপ্রভার নাম।

এছাড়া ট্রেজারিতেই পাওয়া যায় মহামূল্যবান পাথরখচিত রাজার মুকুট, জরির জামা, হাতির দাঁতের হাতল লাগানো ছুরি, দামি পাথর কেটে তৈরি রাজবাড়ির থালাবাসনসহ অনেক কিছু। পরে ট্রাঙ্কে সন্ধান মেলে ইন্দুপ্রভা দেবীর কাছে লিখা ২৮৫টি প্রেমপত্র। বিয়ের আগে ও পরে রাজকন্যাকে চিঠিগুলো লিখেছেন মহেন্দ্র কুমার সাহা চৌধুরী । খামের ভেতরে শতবর্ষ আগের চিঠিগুলো খুবই যত্নে ভাঁজ করে রাখা ছিল। এতোদিনেও চিঠির একটি অক্ষরও নষ্ট হয়নি। প্রতিটা চিঠির শেষে লেখা রয়েছে, ‘তোমারই মহেন্দ্র’।

ইন্দুপ্রভাকে সম্বোধন করা হয়েছে ‘প্রিয়তমে’ হিসেবে। চিঠির পরতে পরতে ছড়িয়ে রয়েছে মান-অভিমানসহ প্রেমময় কথা। ইন্দুপ্রভা কলকাতায় থাকার সময় তাঁকে তিনটি ঠিকানায় চিঠি দিয়েছেন। আবার ইন্দুপ্রভা যখন দিঘাপতিয়া রাজবাড়িতে থেকেছেন, তখনো কলকাতা থেকে মহেন্দ্র তাঁকে চিঠি লিখেছেন। দিঘাপতিয়া চিঠিপত্রে তাঁর নাম কখনো রাজকুমারী ইন্দুপ্রভা, কখনো শ্রীমতী ইন্দুপ্রভা দেবী আবার কখনো শ্রীমতী ইন্দুপ্রভা চৌধুরানী লেখা পাওয়া যায়। রাজশাহীর আইনজীবী মহেন্দ্র কুমার সাহা চৌধুরীর সাথে ইন্দ্প্রুভার বিয়ে হয়েছিল ১৮৯৪ খ্রিষ্টাব্দে।

একইভাবে ইন্দুর হাতের লেখা কবিতা ও তাঁর আত্মজীবনীও পড়া যাচ্ছে।

‘অব্যক্ত উচ্ছ্বাস’ কবিতায় ইন্দুপ্রভা লিখেছেন,

‘না জানি সে দেবদেহে মাখা কি মদিরা!

স্পর্শমাত্র কিসে সুখে করে আত্মহারা

আকুল অধীরপ্রাণে উন্মাদের সম

আদরে সে অঙ্গ ব্যগ্রে করি পরশন! ’।









Leave a reply