সত্যের চেয়ে ৬ গুণ দ্রুত ছড়ায় মিথ্যা!

|

হোয়াইট হাউজে বিস্ফোরণ ঘটেছে, আহত হয়েছেন বারাক ওবামা। এমন টুইট বার্তার কথা মনে আছে? মনে নেই, নাই বা থাকতে পারে। ঘটনাটি ২০১৩ সালের। কোনো এক ব্যক্তি বার্তা সংস্থা এপির টুইটার অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে এ খবরটি ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। যদিও এমন কোনো ঘটনা আদৌ ঘটেনি।

কিন্তু এ তথ্যের ফলে যুক্তরাষ্ট্রে পুঁজিবাজার ডাও জোন্সের সূচক মাত্র দুই মিনিটে নেমে গিয়েছিল ১০০ পয়েন্ট। সত্য ঘটনার জানার সঙ্গে সঙ্গে খুব দ্রুতই ঘটে যাওয়া ধস সামলে উঠেছিলো পুঁজিবাজারটি। আর্থিক লোকসান ঘটে গেলে অনেক ক্ষেত্রেই তা পুষিয়ে নেওয়া যায়।

যদি এ ধরনের কোনো টুইটের ফলে পৃথিবীব্যাপী পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলো মধ্যে বেধে যায় ধুন্ধুমার যুদ্ধ। তখন বিশ্ববাসী কোন উপায়ে ঠেকাবে নিজেদের জন্য ডেকে আনা কেয়ামতকে!

শুধু টুইটার কেন? মিথ্যা খবর কিংবা তথ্য ছড়ানোতে অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমও কম যায় না। টুইটারের ঘটনাগুলো তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি করায় এ নিয়ে আলোচনাটাও বেশি হচ্ছে।

চমকে ওঠার মতো তথ্য হলো, বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও অন্যান্য অনলাইন মাধ্যম ব্যবহার করে ‘আম’ জনতাই মিথ্যা খবর কিংবা গুজব ছড়াচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাচাটুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি-এর (এমআইটি) একদল গবেষক  এ বিষয়ে দীর্ঘ অনুসন্ধান ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরই এমনটি জানিয়েছেন। শুধু রাজনীতি কিংবা নাগরিক তারকাদের খবর নিয়ে নয়; ব্যবসা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিসহ সব ধরনের খবর নিয়ে তারা গবেষণা চালিয়েছেন।

গবেষণা প্রতিবেদনটি বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সাইন্স’-এ গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত হয়েছে।

তাদের গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, টুইটারে মিথ্য খবর কিংবা গুজব সত্য ঘটনার চেয়ে বহুগুনে শেয়ার হচ্ছে। সত্য ঘটনা কদাচিৎ এক হাজার বারের বেশি শেয়ার হয়ে থাকে। কিন্তু শীর্ষ ভূয়া খবর সব সময় লাখোবার শেয়ার হয়ে থাকে। আর ভূয়া খবর ছয় গুণ দ্রুত গতিতে মানুষের কাছে পৌঁছায়।

গবেষক দলের একজন সদস্য ও এমআইটি’র স্লোয়ান স্কুল অব ম্যানেজমেন্টের অধ্যাপক সিনান আরাল বলেন, “এর জন্য রোবটা দায়ী নয়। ভাবতেই হতাশ লাগছে, আমরা সাধারণ মানুষই এর জন্য দায়ী।”

গবেষণায় খবর যাচাই-বাছাই

প্রতিষ্ঠার বছর ২০০৬ থেকে ২০১৭ অবধি টুইটারে পোস্ট করা সব সত্য ও মিথ্যা খবর কিংবা তথ্য যাচাই-বাছাই করা হয়েছে। গবেষক দল উৎস আমলে না নিয়ে এক লাখ ২৬ হাজার খবর কিংবা তথ্য নিয়ে কাজ করেছেন। ওই খবর কিংবা তথ্যগুলো ৩০ লাখ মানুষ ৪৫ লাখ বার পুণরায় পোস্ট দিয়েছিলেন।

ছয়টি স্বাধীন সত্যতা যাচাইকারী প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় খবর বা তথ্যগুলোকে সত্য অথবা মিথ্য-এই দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছিল। সত্যতা যাচাইকারী প্রতিষ্ঠানগুলো মধ্যে স্নোপস, পলিটিফ্যাক্ট, এবং ফ্যাক্টচেক ডট অর্গ উল্লেখযোগ্য।  শুধু যাচাইকারী প্রতিষ্ঠানের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নয়, এ কাজে গবেষক দল টুইটারে প্রচার হওয়া ১৩ হাজারের অধিক অন্যান্য খবর তাদের শিক্ষার্থীদের দিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিয়ে ছিলেন। যাচাইয়ে উভয় প্রক্রিয়ায় ফলাফল ছিল একই রকম।

অনলাইনে হঠাৎ হঠাৎ ভাইরাসের মতো দ্রুত খবর ছড়িয়ে পড়ে। এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা চলছে। কিন্তু এমআইটি’র এবারকার গবেষণা অন্য যে কোনো সময়ে তুলনায় অনেক বড় পরিসরের এবং অনেক বেশি সুসংগঠিত।

ভূয়া খবর কেন শেয়ার হয়?

ভূয়া খবর মানুষকে সত্য খবরের চেয়ে বেশি আকর্ষণ করে। এই কথা শুনতে খারাপ লাগতে পারে, কিন্ত এটি অনেকাংশে সত্য। বিষয়টি নিয়ে আরো গভীরে অনুসন্ধান করতে গিয়ে গবেষক দল, সত্য ও মিথ্য খবরের প্রতি মানুষের আবেগ বিষয়ে কাজ করেন। তারা দেখতে পেয়েছেন, “ভূয়া খবর শেয়ার করার প্রবণতা মানুষের প্রবৃত্তিতেই রয়েছে।”

ভূয়া খবরের এই প্রবৃত্তিগত বিষয় উদঘাটনে কানাডার জাতীয় গবেষণা কাউন্সিল উদ্ভাবিত একটি পরিমাপ যন্ত্র ব্যবহার করেন। ধরন অনুসারে, সত্য খবর মানুষকে আশান্বিত, আনন্দ বা দুঃখ দিলেও ভূয়া খবর মানুষের ভেতরে বিস্ময় ও বিতৃষ্ণার মতো তীব্র আবেগ তৈরি করে।

দু’টি খবর: একটি সত্য, একটি ভূয়া

গবেষক দল দু’টি বাণিজ্য বিষয়ক খবরের উদাহরণ তুলে ধরেন। এতে তারা দেখাতে চেয়েছেন, দুই রি-টুইট হতে কোন ধরনের খবরের কতটা সময় লাগে।

  • ২০১৪ সালের একটি খবর: ফ্যাশন চেইন জারা আনুভূমিক ডোরাকাটা ও সোনালী তারাসহ বাচ্চাদের একটি পায়জামা বাজারে ছাড়ে। কাউবয় শেরিফদের পরিধেয় পোশাক থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তারা পায়জামার এ নকশাটি করেছে। কিন্তু টুইটার ব্যবহারকারীরা এই নকশাকে নাজি কনসেন্ট্রেশন শিবিরের উর্দির সঙ্গে তুলনা করেছিল। স্নোপেস জানিয়েছে: খবরটি সত্য। এই খবরটি দুই শত বার রি-টুইট হতে সাড়ে সাত ঘণ্টা সময় লেগেছিল।
  • ২০১৬ সালের একটি খবর: বিতর্ক সৃষ্টির মাধ্যমে বিক্রি বাড়াতে চিক-ফিল-এ রেস্টুরেন্ট বিদ্রুপাত্নক প্রবন্ধের অংশ বিশেষ প্রকাশ করেছিল। যাতে লেখা ছিল ‘আমরা কালোদেরও পছন্দ করি না।’ স্নোপেস জানিয়েছে: খবরটি মিথ্যা। এটি দুই শত বার রি-টুইট হতে সময় লেগেছিল চার ঘণ্টা ২০ মিনিটি।

কি করা যেতে পারে?

এমআইটি’র গবেষক দলটি জানিয়েছেন, “কোনটি ভূয়া এ বিষয়টি জানাই এ ধরনের খবর কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে প্রথম পদক্ষেপ।” তারা বলেন, মানুষের চারিত্রিক ব্যবহার এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মানুষের এই চারিত্রিক ব্যবহার পরিবর্তনের জন্য খবরগুলোর ধরনে পরিবর্তন আনা দরকার।

গবেষক দলের সদস্য ও টুইটারের গণ মাধ্যম বিষয়ক সাবেক বিজ্ঞানী দেব রায় বলেন, “শুধু মানুষের চারিত্রিক ব্যবহার পরিবর্তন করলেই হবে না; ফেসবুক, গুগল, ইউটিউব ও টুইটার, এবং গণমাধ্যম কোম্পানিগুলোকে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে।”

যমুনা অনলাইন: এফএইচ









Leave a reply