জমে উঠেছে গোপীনাথপুরের ঐতিহ্যবাহী ঘোড়ার মেলা

|

জয়পুরহাট প্রতিনিধি 
জয়পুরহাটের আক্কেলপুরে ঐতিহ্যবাহী গোপিনাথপুর মেলায় ঘোড়ার হাট জমে উঠেছে। বিজলি, কিরন মালা, রানী, সুইটি, বাহাদুর, কটকটি আরো কত যে বাহারি নাম। ওদের ক্ষিপ্রতা আর বুদ্ধিমত্তায়ও মেলে নামের সার্থকতা। ঘোড়াগুলোর দুলকী চলনে বিদ্যুৎ গতি, চোখের পলকে যেন মাইল পার। এমন নানামুখী গুণের কারণে দেশী-বিদেশী ঘোড়াগুলোর কদরও যথেষ্ট। পছন্দের প্রাণিটিকে পেতে ক্রেতাদের মধ্যে রীতিমতো কাড়াকাড়ি প্রতিযোগিতাও দেখা গেছে।

আয়োজকরা বলছেন, দেশের এক মাত্র ঘোড়া বেচাকেনার মেলা এটি। এ কারণে সারা দেশ থেকে আনা কয়েক হাজার ঘোড়া জড়ো করা হয় এখানে। এটিকে ঘোড়ার মিলনমেলা বললেও অত্যুক্তি হবে না। প্রতি বছর দোল পূর্ণিমা উপলক্ষে শুরু হয় মাসব্যাপী মেলা। মূল মেলা এক মাস হলেও পশুর মেলা হয় ১০ দিন। ঘোড়া ছাড়াও মহিষ, গরু, ভেড়া ও ছাগল কেনা বেচা হয় এ মেলায়।

ক্রেতা বিক্রেতা ও দর্শনাথীদের পদচারণায় এখন মূখর ঐতিহ্যবাহী গোপীনাথ মেলার ঘোড়ার হাট। দরদাম ঠিকঠাকের পর একটি খেলার মাঠে ঘোড়া নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ক্রেতাকে দেখানো হয় ঘোড়ার দৌড়। দোলপূর্ণিমা মেলার আয়োজকরা জানান, ৫০০ বছরের পুরনো এ মেলা শুরু থেকেই ঘোড়ার জন্য প্রসিদ্ধ ছিল। স্বাধীনতার পরও মেলায় নেপাল, ভূটান, ভারত, পাকিস্তানসহ মধ্য প্রাচ্যের দেশগুলো থেকে উন্নত জাতের ঘোড়া আসত। বর্তমানে সেসব এখন স্মৃতির পাতায় হলেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ঘোড় সওয়ারী ও ঘোড়া মালিকরা এ মেলায় ঘোড়া নিয়ে আসেন।

স্থানীয়রা জানান, এ মেলায় ময়মনসিংহ, জামালপুর, টাঙ্গাইল, বগুড়া, দিনাজপুর, গাইবান্ধা, পাবনা, রাজশাহী, নাটোর, সিরাজগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঘোড়ার আমদানি হয়। রাজশাহীর তানোর থেকে আসা সাইফুল ইসলাম একটি ঘোড়ার দাম হেঁকেছেন ১ লাখ ৯০ হাজার টাকা পরে তা দেড় লাখ টাকা বিক্রি করেন বলে জানান তিনি। নওগাঁর ধামইরহাট উপজেলার চকমরিয়ম গ্রামের আব্দুল খালেক বলেন, তিনি ২৫ বছর ধরে মেলায় ঘোড়া নিয়ে আসতেন এবার তিনি তিনটি ঘোড়া এনেছিলেন, সব ক’টি ১ লাখ ৯০ হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন।


দিনাজপুর থেকে আসা জব্বার আলী জানান তিনি ৪০ বছর থেকে এ মেলা ঘোড়া বেচাকেনা করেন। আগের চেয়ে এখন মেলার পরিধি অনেকটা ছোট হয়ে আসছে সেকারণে মেলার জৌলুস কিছুটা কমেছে তবে এখনও ভাল ঘোড়ার চাহিদা রয়েছে ক্রেতাদের কাছে। এবছর কিছুটা দামে ঘাটতি রয়েছে। খাবারের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় কিছুটা খরচ বাড়লেও ঘোড়ার দাম তেমনটা বাড়েনি ফলে ঘোড়া চাষীরা কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

এবার হাটে সর্ব্বোচ্চ আড়াই লাখ টাকায় যে ঘোড়াটি বিক্রি হয়েছে তার মালিক হোসেন আলী জানান, ঘোড়াটির বয়স সাড়ে চার বছর। এটি রেসিং ঘোড়া। দ্রুত দৌড়াতে পারে সাদা-কালো ডোরাকাটা ঘোড়াটির যত্ন নিতেন তিনি নিজেই। বাহারি ঘোড়াটি কিনেছেন রাজশাহীর সেকেন্দার বাদশা নামের এক সৌখিন ঘোর সওয়ারী। সিরাজগঞ্জের কুতুব আলী প্রায় সাড়ে আট ফুট উচ্চতার কালো রংয়ের ইয়া বড় এক তাজি ঘোড়া ১লাখ ৮০ হাজার টাকায় বিক্রি করলেন বলে জানান তিনি।

ঘোড় সওয়ারী ও ক্রেতা-বিক্রেতারা জানান, আগেও তাদের বাপ-দাদারা এ মেলায় ঘোড়া কেনা-বেচা করতেন, পূর্ব পুরুষের সূত্র ধরে তারাও আগলে রেখেছেন সেই পারিবারিক ঐতিহ্য। আগে ঘোড়ার হাট ও ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে ঘোর দৌড়ের বিস্তীর্ন মাঠ থাকলেও বর্তমানে সেই স্থানটি সংকুচিত করা হয়েছে বলে ঘোড়া বেচা-কেনায় কিছুটা সমস্যা হচ্ছে।

বগুড়া থেকে আসা সাইফুল ইসলাম জানান তার ছোট ভাই ইমনকে সাথে এনেছেন শুধু ঘোড়ার দৌড় দেখার জন্য। ইমন জানান, বাস্তবে ঘোড়া এত দৌড়াতে পারে আর এত সুন্দর হতে পারে সেটা তার জানা ছিলনা। বিভিন্ন রকমের ঘোড়া দেখে অভিভূত হয়েছেন নওগাঁ জেলার রবিউল ইসলাম মিয়া। তিনি জানান, ঘোড়া কিনতে নয় শুধু দেখতে এসেছেন তিনি। এতগুলো ঘোড়া এক সাথে দেখা যাবে এটাই তার কাছে আশ্চর্যের বিষয়।
গোপিনাথপুর মন্দিরের সেবায়েত রনেন্দ্র কৃষ্ণ প্রিয়া জানান মেলাটি হিন্দু সম্প্রদায়ের হলেও এখানে সব ধর্মের মানুষের মিলন মেলা হয়। এ মেলায় ঘোড়ার বাজার একটি অত্যন্ত আকর্ষনীয় বিষয়। ঘোড়ার হাট মেলার শ্রী বৃদ্ধি করে আসছে কয়েকশ’ বছর ধরে। যদিও তিনি বলেন মেলার পরিধি ছোট হওয়ায় আগের মত জমজমাট নেই।

মেলা কমিটির প্রধান কর্তা ও গোপীনাথপুর ইউপির চেয়ারম্যান আবু সাইদ জোয়ার্দ্দার বলেন, প্রশাসনের পাশাপাশি মেলা কমিটিও সার্বিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছে। এতো বড় পুরোনো এবং ঐতিহ্যবাহী বৃহৎ মেলা উত্তরবঙ্গের কোথাও নেই বলেও জানান তিনি। ঘোড়ার মেলাটি একটি ঐতিহ্যবাহী এবং আনন্দ উপভোগের বিষয়।

মেলায় ঘোড়া ছাড়াও মিঠাই মিস্টান্ন, শিশুদের খেলনা সামগ্রী, গৃহস্থালী কাজে ব্যবহার্য দ্রব্যসামগ্রী, কম্বলহাটসহ নানা ধরনের দোকানপাট, যাত্রা, নাগরদোলা শোভা পাচ্ছে।

আক্কেলপুর থানার অফির্সাস ইনচার্জ ওসি সিরাজুল ইসলাম জানান, মেলা উপলক্ষে বিপুল মানুষের সমাগম হয়েছে। তাদের নিরাপত্তায় প্রয়োজনীয় সংখ্যক পুলিশের পাশাপাশি আনসার মোতায়েন রয়েছে। আসা করা হচ্ছে পুরো আয়োজন শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হবে।

মেলায় ক্রেতা-বিক্রেতাদের দাবী যদি মেলার সময়টা আরো বাড়ানো যেত তাহলে বেচা-কেনার পরিমান আরো বৃদ্ধি পেত সেই সাথে আরো দুর দুরান্ত থেকে ক্রেতা বিক্রেতা ও দর্শনার্থীরা ভিড় জমাত।









Leave a reply