স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য শিশু অপহরণ ও খুন, বেরিয়ে এলো লোমহর্ষক কাহিনী

|

সিসিটিভি ফুটেজ দেখে শনাক্ত করা হয় আসামি সেলিমকে।

রাজধানীর খিলগাঁওয়ে চাঞ্চল্যকর অপহরণ মামলায় আটক করা হয়েছে ১ জনকে। আটককৃত ব্যক্তির দেয়া জবানবন্দি থেকে জানা যায় শিশু আকাইদ (৫) হত্যার লোমহর্ষক বর্ণনা।

গত শুক্রবার (৬ আগস্ট) খিলগাঁওয়ে নিজেদের বাসার সামনে খেলছিলো ৫ বছর বয়সী আকাইদ। খেলা শেষে বাসায় না ফেরায় স্বাভাবিকভাবেই আকাইদকে খুঁজতে বের হন তার বাবা-মা। নিকটবর্তী এলাকা নুর মসজিদ সংলগ্ন ২নং রোডের গলির রাস্তায় তন্নতন্ন করে খুঁজেও না পেয়ে থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন তারা (ডায়েরি নম্বর-৩৯৬)।

এই ডায়েরির ভিত্তিতে অনুসন্ধান শুরু করে পুলিশ। পার্শ্ববর্তী এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেন তারা। এসব ফুটেজে দেখা যায় যে, ঐদিন খেলার সময়ই এক অজ্ঞাতনামা রিকশাওয়ালা আকাইদকে তার রিকশায় করে নিয়ে যাচ্ছে। এ তথ্যের প্রেক্ষিতে খিলগাঁও থানায় একটি অপহরণ মামলা দায়ের করেন আকাইদের বাবা মো. আবদুল মালেক।

এর মাঝেই গত সোমবার (৯ আগস্ট) নুর মসজিদ সংলগ্ন ২নং রোডের গলির একটি ৫ তলা ভবনের ২য় তলায় একটি শিশুর লাশ পাওয়ার খবর আসায় সেখানে উপস্থিত হয় পুলিশ। লাশের পরিহিত প্যান্টের রঙ দেখে তদন্তকারী অফিসার প্রাথমিকভাবে ধারণা করেন এটি অপহৃত শিশু আকাইদের লাশ। প্রাথমিক ধারণার ভিত্তিতে তারা আকাইদের বাবা-মা’কে ঘটনাস্থলে ডাকেন লাশটিকে শনাক্ত করতে। আকাইদের বাবা-মা সন্তানের লাশ শনাক্ত করলে পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে ক্রাইমসিন সংরক্ষণ করেন এবং ময়নাতদন্তের জন্য লাশটিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠানো হয়।

এরপর সিসিটিভি ফুটেজে প্রাপ্ত সূত্রের ভিত্তিতে মামলার তদন্তকারী অফিসার ও অন্যান্য অফিসাররা খিলগাঁও থানা ও আশেপাশের এলাকার রিকশা গ্যারেজসমূহে অভিযান পরিচালনা করে গতকাল সোমবার (৯ আগস্ট) উক্ত অপহরণের সাথে জড়িত আসামি রিকশাচালক মোঃ সেলিম (৩২) কে গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে এসে জিজ্ঞাসাবাদ করলে আসামি ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে।

আসামি সেলিম প্রাথমিকভাবে স্বীকার করে যে, সে পেশায় একজন রিক্সা চালক। তার স্ত্রী নুপুর আক্তার দীর্ঘদিন যাবত কিডনি’র রোগে আক্রান্ত। এছাড়াও তার পেটে টিউমারের অস্তিত্বও রয়েছে। স্ত্রীর চিকিৎসা করার জন্য সেলিমের অনেক টাকার প্রয়োজন হচ্ছিলো।

এর আগে, সে নুর মসজিদ সংলগ্ন ২নং রোডের গলির বাড়ি (যেখানে আকাইদের লাশ পাওয়া গেছে) মালিক বাবুল সাহেবের স্ত্রীর কাছে মঙ্গলবার (৩ আগস্ট) টাকা চাইলে কাঙ্ক্ষিত অংকের টাকা প্রাপ্তিতে ব্যর্থ হয়। এ সময় বাড়ি মালিক বাবুল সাহেব তাকে শনিবার (৭ আগস্ট) বাড়ি পরিস্কার করতে আসতে বলেন। তখনই সেলিম পরিকল্পনা করে যে, সে কোনো অবৈধ জিনিস বাবুল সাহেবের বাড়িতে রেখে পরবর্তীতে তা সেখান থেকে সরানোর বিনিময়ে বাবুল সাহেবের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা আদায় করবে।

এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতেই বুধবার (৪ আগস্ট) সে একটি ক্ষুর কিনে নিজের কাছে রেখে দেয়। এরপর শুক্রবার (৬ আগস্ট) বিকাল আনুমানিক বিকাল ৩.৫০ এর দিকে আসামি সেলিম রিক্সা নিয়ে মধ্য নন্দীপাড়া ২নং রোডে যায়। সেখানে একটি বাসার সামনে ৫/৬ জন বাচ্চাকে একসাথে খেলতে দেখে। সেখান থেকেই আকাইদকে বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে তার রিকশাতে করে নুর মসজিদের দিকে নিয়ে যায় সেলিম। পরে তাকে বাবুল সাহেবের বাড়ীর দ্বিতীয় তলায় নিয়ে সেখানে থাকা রশি দিয়ে আকাইদের দুই হাত বেঁধে ক্ষুর দিয়ে গলা কেটে মৃত্যু নিশ্চিত করে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে সেলিম।

আসামি সেলিমের পরিকল্পনা ছিল, যেহেতু বাবুল সাহেব তাকে শনিবার (৭ আগস্ট) বাড়ি পরিষ্কার করতে বলেছেন, তো বাড়ি পরিষ্কার করার সময় এই লাশটি পেলে পুলিশি ঝামেলা এড়াতে বাবুল সাহেব নিশ্চয়ই লাশটি বাড়ি থেকে সরানোর চিন্তা করবে। এক্ষেত্রে বাবুল সাহেব তাকে দিয়েই লাশটি সরানোর উদ্যোগ নিলে সে লাশ সরানোর কাজের বিনিময়ে মোটা অংকের টাকা দাবি করবে। কিন্তু ৭ তারিখে এবং তার পরবর্তী তিন দিনেও বাবুল সাহেব সেলিমকে বাড়ি পরিস্কার করতে না ডাকায় এবং লাশের খোঁজ না পাওয়ায় সেলিমের পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়।

এদিকে, সোমবার (৯ আগস্ট) সকাল থেকেই বাবুল সাহেবের বাড়ি থেকে ব্যাপক পঁচা দুর্গন্ধ বের হতে শুরু করলে খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে সবাই ২য় তলায় একটি বাচ্চার পঁচাগলা মৃতদেহ দেখতে পেয়ে পুলিশকে খবর দেন।

আজ মঙ্গলবার (১০ আগস্ট) আসামি সেলিমকে ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করা হয়। এ সময় আসামি স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। এরপর মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ফৌজদারি কার্যবিধি ১৬৪ ধারায় তাদের জবানবন্দি রেকর্ড করার আবেদন করলে সে আবেদনের প্রেক্ষিতে ঢাকা মহানগর হাকিম দেবব্রত বিশ্বাস আসামি সেলিমের জবানবন্দি রেকর্ড করেন। এরপর সেলিমকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

উক্ত ঘটনায় অপহরণের কাজে ব্যবহৃত রিক্সা, অপরহণের সময় অপহরণকারীর পরিহিত টি-শার্ট ও লুঙ্গি, হত্যাকাণ্ড ব্যবহৃত ক্ষুর জব্দ করা হয়েছে। উক্ত আসামিকে বিধি মোতাবেক আদালতে সোর্পদ করা হয়েছে। রুজুকৃত মামলায় পেনাল কোড ৩০২/২০১ ধারা সংযোজন করার জন্য ইতোমধ্যেই আদালতে আবেদন করা হয়েছে।

/এসএইচ


সম্পর্কিত আরও পড়ুন





Leave a reply