একজন বার্তাকক্ষ সম্পাদকের ঈদ


নিঃসন্দেহে ঈদের দিন সকালটা একটু আলাদা। একটু বাড়তি প্রস্তুতি, নতুন কাপড়-চোপড়, খাওয়া-দাওয়া–এই আরকি। কিন্তু আর সব তো অন্যান্য দিনের মতোই। অফিস আছে, সেই চিরচেনা ব্যস্ততা, ফোন, চায়ের কাপে আড্ডা, এসবই। তাহলে ঈদের দিন কি খুব ব্যতিক্রম? দেখি কতটা।

ঢাকায় তো অনেকবারই ঈদ করলাম। কিন্তু আজ অব্দি জাতীয় ঈদগাহ বা বায়তুল মোকাররমে নামাজ আদায় করা হলো না। কারণ নামাজ শেষেই তো অফিস। তাই বাসার পাশে মহল্লার মসজিদ বা অফিসের পাশের কোনো মসজিদের জামাতই ভরসা।

বাসায় খানিকটা মিষ্টিমণ্ডা তৈরি হয়েছে। তাই খেয়ে অফিসের দিকে রওনা। দেরি হয়ে গেলে বিপদ। কারণ ঈদে নিউজরুমে লোক কম। কখন কি দরকার হয়। নির্দিষ্ট সময়ের কিছুটা আগে যাওয়াটা বোধহয় ভালো।

অনেকে মনে করেন, ঈদে টেলিভিশন অফিসগুলো বোধহয় একেবারেই একঘেয়ে। আনন্দহীন জায়গা। ব্যাপারটা সেরকম নয়। ঈদের দিন টিভি পর্দায় যেমন আলাদা প্রস্তুতি থাকে, নিউজরুম অর্থাৎ অফস্ক্রিনেও তেমনি থাকে নানা আয়োজন। খাবার-দাবার, হই-হুল্লোড়। আড্ডাবাজি অন্যান্য দিনের তুলনায় আরও বেশি হয় বৈকি।

সবচেয়ে মজার যে বিষয়টি- সালামি। ঈদের দিন সালামি দেয়া-নেয়ার ধুম পড়ে যায় অফিসে। জুনিয়রদের টার্গেট থাকে, কোনো সিনিয়র যাতে মিস না হয়। কখনও ১০ টাকা, কখনও ২০-৫০-১০০। এটা বর্ণনাতীত মজা। টাকাটা মুখ্য নয়, সালামি তোলার আনন্দটাই আসল। আবার মিড লেভেলের যারা তারা যেমন সিনিয়রদের কাছ থেকে সালামি পায়, তেমনি দিতেও হয় জুনিয়রদের।

ও হো, আর খানিকক্ষণ বাদেই তো বুলেটিন। ই-মেইল চেক করো। নতুন কিছু কি এল?
ঈদের দিন, সব নিউজ দেয়ার দরকার নেই। রান ডাউনে জায়গা কম। ঈদের বিশেষ প্রোগ্রাম ঢুকেছে, তাই। ১০টার বুলেটিন শেষ। পরেরটা এখনও ৪০ মিনিট বাকি। তাহলে এতক্ষণ কি আবারও আড্ডায় মাতবো? সুযোগ নেই। কারণ নিউজ এডিটর আগেই বলে রেখেছেন, ১১টার বুলেটিনে সারাদেশে ঈদ জামাতের কম্পাইল প্যাকেজ ধরাতে হবে। তাই একে একে ফোন করা শুরু। প্রথমে ব্যুরো অফিস। তারপর কয়েকটি জেলায়। স্ক্রিপ্ট লিখে প্যানেলে, তারপর অনএয়ার।

ঘটনাতো আরেকটি ঘটেছে। আমাদের টেলিভিশনেই টিকার যাচ্ছে, কোথায় যেন ঈদগাহে নামাজ পড়া নিয়ে দু’গ্রুপের সংঘর্ষ হয়েছে। দু’জন মারা গেছেন, আহত অনেকে। ঈদের দিন বড় ঘটনা। বেচারা ওই জেলায় যে সহকর্মী কাজ করেন, তার ঈদটাই মাটি। কিন্তু কিছু করার নেই। কারণ, আমরা যে সাংবাদিক।

ফোনে ওপার থেকে সহকর্মী নিশ্চিত করলেন, ঘটনাস্থল জেলা শহর থেকে বেশি দূরে নয়। যেতে সময় লাগবে আধাঘণ্টা খানেক। ফুটেজ মিলবে ১২টার বুলেটিনে। তাই-ই সই। মাঝখানে আর নিউজ নেই। বেশ কিছুক্ষণ আড্ডা মারার সময় বেরুলো।

এরমাঝে বিভিন্ন জায়গায় ঈদ উদযাপনের লাইভ হবে। ব্যুরো অফিসগুলোতে বলে দু’জনকে রেডি করলাম। ব্যতিক্রমী একটি স্টোরি পাঠিয়েছেন এক সহকর্মী। রেললাইনের পাশে থাকা দুঃস্থ এক পরিবারের ঈদের সকাল নিয়ে। এখনই অনএয়ার করতে হবে। কারণ পরে আর নিউজভ্যালু থাকবে না। সেটা আরেক সহকর্মীর হাতে বুঝিয়ে দিলাম।

দুপুর হয়ে গেছে। খিদেও লেগেছে প্রচণ্ড। আরও বেশ কয়েকটি নিউজবাবা এসে হাজির। যেগুলো বিকেলের বুলেটিনে লাগবে। তারআগে খেয়ে নেই।

অফিসে খাবারেও বিশেষ আয়োজন। পোলাও, মাংস, রোস্ট, ইলিশ মাছ। ভালোই খাই-দাই হল। এমন খানদানি ভোজের পরও একটু জিরানোর সুযোগ নেই। কারণ বিকেলের বুলেটিনের প্রস্তুতি আছে তো।

আর দু-একটি নিউজ লিখে বুলেটিন শুরু হতেই অফিসকে বিদায় বললাম। ঈদের দিন হিসেবে অনেক হয়েছে। আর না। বিকেলে এক বন্ধুর বাসায় দাওয়াতে যেতে হবে।

বাইরে বেরুলাম, দেখি ঝুম বৃষ্টি। ঘণ্টাখানেক আটকে থাকতে হল অফিসেই। বৃষ্টি যখন থামল, ততক্ষণে সন্ধ্যা হয়ে গেছে। বন্ধুর বাসায় যাবার প্রোগামেরও ইতি ঘটল। সন্ধ্যায় তাই গন্তব্য বাসা। একটু টিভি দেখলাম। ঈদের বিশেষ নাটক হচ্ছে। ঘণ্টাখানেক বসে থেকেও মন বসাতে পারলাম না। ভাবলাম, ঈদ তো চলেই গেল। কেমন গেল দিনটা? নিশ্চয়ই খুব মন্দ নয়। ব্যস্ততার মাঝেই তো গেছে। তারপরও কি যেন হয়নি, কি যেন হয়নি, এমন ঠেকছে।

মনে পড়লো সারাদিন একবার আব্বার সাথে কথা হয়েছে। সেই সকালের দিকে। তাও ব্যস্ততার কারণে খুব ভালোভাবে না। ভাইয়া, আপামনি, কারো সাথেই কথা হয়নি। কেমন যেন অস্থিরতায় ভরে উঠলো মন। সবার সাথে এক এক করে কথা বললাম। এখন একটু স্থির বোধ করছি। একটু স্থির। তবে সারাদিনের ব্যস্ততায় বেশ ক্লান্ত।

 

 

 

 

 

 

 

 

মুরশিদুজ্জামান হিমু: সাংবাদিক।









Leave a reply