মোস্তফা হামেদীর নতুন কবিতার বই

|

বইমেলায় এসেছে দ্বিতীয় দশকের কবি মোস্তফা হামেদীর নতুন কবিতার বই ‘তামার তোরঙ্গ’। বইটি প্রকাশ করেছে জেব্রাক্রসিং প্রকাশন। স্টল নম্বর ৬৬০। প্রথম দশকের কবি সোহেল হাসান গালিব ‘তামার তোরঙ্গ’ প্রসঙ্গে বলেন, “তার ছোট ছোট বাক্য, যেন ক্যানভাসে তুলির ছোট ছোট স্ট্রোক, ধীরে ধীরে ফুটিয়ে তোলে বড় একটা ল্যান্ডস্কেপ। যদিও আমাদের আগ্রহ নেই কোনো ল্যান্ডস্কেপে, কিন্তু ঘটনাটি এত অজান্তে ঘটে যে, এই টেকনিকটাই দারুণ প্লে-ফুল হয়ে ওঠে। নতুন একটা ভাষাভঙ্গির সন্ধান যে পেয়েছেন তিনি, এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ।”

দ্বিতীয় দশকের আরেক কবি হাসান রোবায়েত ‘তামার তোরঙ্গ’ প্রসঙ্গে বলেন- “ধরেন, একটা বিস্তীর্ণ মাঠের মধ্য দিয়ে আপনি হাঁটছেন। দুপুর প্রায় শেষ শেষ। চারদিকে গাছেরা তাদের ফল গুছিয়ে নিচ্ছে রৌদ্রের থেকে। পুরনো সাইকেলে ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ তুলে কেউ হারিয়ে যাচ্ছে নিজের ছায়ায়। আপনার তৃষ্ণার ভেতর মিঠা পানির কল চাপছে একজন ছিপছিপে তরুণী। তারপর রাত নেমে এলে মূক এক তারা চুপ হয়ে বসে আছে আলোর তল্লাশে। গুল্ম ও ঘাসের মর্মে একটা ট্রেন মিলিয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। অদূরেই কারো প্রিয় গমক্ষেত লুট হয়ে যাচ্ছে। ভাবছেন, এমন ইশারা, ধ্বনি কোথায়? মোস্তফা হামেদী ছোট ছোট বাক্য আর সান্দ্র ইমেজ দিয়ে তার কবিতায় এমনই একটা আশ্চর্য জগৎ তৈরি করেন। এ যেন বহু পুরনো কোনো তামার তোরঙ্গ খুলে হঠাৎ পাওয়া যাবে সেইসব ঘ্রাণ যা মেঠোফুলের বয়ানে উজ্জ্বল। হামেদী সহজেই নিয়ে যেতে পারেন তার আপাত-লোকো-জগত আর রোদ-ঝরঝরে ভাষা দিয়ে এক আর্কাইক বাংলায় যা চিরদিনের হয়েও কী গভীর সমকালীন!”

এই বইটি সম্পর্কে দ্বিতীয় দশকের আরেক কবি হুজাইফা মাহমুদ বলেন- “মোস্তফা হামেদী একজন সাহিত্যের শিক্ষক। সাহিত্যের শিক্ষকদের রচনাধর্মী লেখাজোখা মাঝে মাঝে ভাল হলেও কবিতা টবিতা এতো একটা ভাল হয়না। এটা মোটামুটি শাশ্বত সত্যের কাছাকাছি বিষয়। তবে দুয়েকজন সম্মানিত ব্যতিক্রমতো সব বিষয়েই থাকেন! মোস্তফা হামেদী সেই বিরল মনীষীদের একজন, যিনি ছাত্র ঠ্যাঙিয়ে সাহিত্য শেখান, আবার নিজেও নরম, মোলায়েম সুন্দর সুন্দর কবিতা লেখেন! হামেদী গ্রামে থাকেন, গ্রামের কলেজেই শিক্ষকতার মহান ব্রত পালন করেন। ফলে তার কবিতার জগতটাও তেমনই, আধুনিক গেঁয়ো কবিতা। হামেদী বৃষ্টির দিনে ধান ক্ষেত আর পুকুরের পাশে লুঙ্গী পড়ে ঘুরে বেড়ান, উজানো কৈ মাছের সন্ধানে। কৈ মাছ দেখা মাত্রই ক্ষিপ্র শিকারির মতো ঝাঁপিয়ে পড়েন।

হামেদী গভীর দু:খ নিয়ে লক্ষ্য করেন, এই সমাজ এখনো ঔপনিবেশিকতার প্রভাবে হাবুডুবু খাচ্ছে। বাংলার সমাজ ও সংস্কৃতি থেকে ঔপনিবেশকতার প্রভাব কিভাবে দূর করা যায়! বাংলা কবিতাকে কিভাবে ইউরোসেন্ট্রিক বলয় থেকে সরিয়ে মূলের দিকে ফিরিয়ে নেওয়া যায়। সেসব ভাবতে ভাবতেই তিনি খাতা কলম নিয়ে বসেন এবং ‘শেমিজের ফুলগুলি’ নামক আশ্চর্য সুন্দর একটি কবিতা লেখেন। শীতের রাতে লেপমুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়েন হামেদী, কিন্তু বাঁশঝাড়ের শেয়ালের ডাকে ঘুম আসেনা। প্রথমে বিরক্ত হোন তিনি। কিন্তু একটু পরেই হামেদীর শিল্পবোধ জেগে উঠে, তিনি এই হুক্কা হুয়া রবের অনিন্দ্য সুন্দর সুর লালিত্য আবিষ্কার করেন। তন্ময় হয়ে শুনেন। তারপর “শৃগালনিনাদ” থেমে গেলে বিমুগ্ধ হামেদী খাতা- কলম টেনে নেন, এবং ধীরে ধীরে লেখেন-

রাত্রি খোদাই করে শেয়ালের ডাক
বনকাঁটা পুঁতে রেখে লুকায় ও কারা
শীতের গরিমা ভেঙে জেগে থাকে একা
এক ভুঁইচাঁপা গাছ, কুয়াশায় ভিজা
তার বিষণ্ন হৃদয়—ছাল ও বাকল
জঙ্গলের কাছ ঘেঁষে মন্দা জোছনা!

 









Leave a reply