করোনা দুর্যোগ: ভারতীয় মিডিয়া বনাম বাংলাদেশি মিডিয়া

|

মনিরুল ইসলাম:

আপনি মাস্ক পরেননি কেনো? সাংবাদিকের এমন প্রশ্নে অনেকে বাঁকা চোখে তাকান। এথিকস শেখাতেও কার্পণ্য করেন না। অনেকে বলেন, মাস্ক পরা না পরা যার যার ব্যক্তিগত অধিকার। কিন্তু আমি তা মনে করি না। জনগুরুত্বপূর্ণ ওই প্রশ্নটি করার অধিকার সাংবাদিকের রয়েছে। কারণ, মহামারিকালে মাস্ক পরা একটি আবশ্যিক কাজ। একজন মন্ত্রী বা কোনো কর্মকর্তা তার সঠিক দায়িত্ব পালন না করলে সাংবাদিক যেমন প্রশ্ন তোলে, তেমনি একজন নাগরিক যদি তার দায়িত্ব এড়িয়ে যায়, তাহলে তাকে প্রশ্ন করা যাবে না কেনো?

এবার আসি আসল কথায়। আমাদের পাশের দেশ ভারত এখন করোনা মহামারির সর্বোচ্চ দুর্যোগে আছে। দেশটির সর্বোচ্চ কর্তা থেকে শুরু করে অনেকেই বেশ কয়েকমাস ধরে বলে আসছিলেন, ‘ভারত থেকে করোনা উধাও হয়ে গেছে’, ‘করোনাকে বিদায় করে দিয়েছে ভারত’, ‘জনজীবনে প্রভাব ফেলেনি করোনা’। এরকম নানা কথা বলা হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকেও। এরপর, নির্বাচন, জনসভা, মেলা, র‍্যালি সবকিছু ওপেন করে দেয়া হয়। সেই পালে আরো হাওয়া দিয়েছে ভারতের মিডিয়াগুলো। প্রতিদিন ভারতীয় গণমাধ্যমে খবর, টক-শো জুড়ে একটা আলোচ্য বিষয় থাকতো, ‘ভারত করোনার চেয়ে শক্তিশালী’। ঘণ্টার পর ঘণ্টা করোনা নিয়ে সরকারের প্রশংসায় পঞ্চমুখ থেকেছে অনেক মিডিয়া। জনপ্রিয় নিউজ চ্যানেল এবিপি নিউজের টকশো উপস্থাপক সুমিত আওয়াস্তি পরপর কয়েকটি শো-তে বলেন, ‘করোনা মহামারির এই সমুদ্র থেকে পরিত্রাণ দিতে একমাত্র হিন্দুস্তানই করতে পারে, এবং তা করে দেখিয়েছে’। ঠিক দুই আড়াই মাস পরে এসে সেই উপস্থাপক তার টকশোতে উল্লেখ করেন, ‘হিন্দুস্তানের এখন সমস্ত সিস্টেম ধসে পড়েছে’। একইসাথে নিউজ এইটিন ইন্ডিয়া, নিউজ স্টেট, আজ-তাক, রিপাবলিক-এর মতো বড় বড় নিউজ চ্যানেল ভারতকে করোনা যুদ্ধের জয়ী হিসেবে ঘোষণা করে দিনের পর দিন। ঠিক দুই মাস পর এসে সবগুলো মিডিয়ার সুর পাল্টে গেছে। করোনা নিয়ে সর্বত্র এমন তৃপ্তির ঢেকুরের কড়ায়-গণ্ডায় জবাব দিতে হচ্ছে ভারতকে।

ভারতের এবিপি নিউজের উপস্থাপক সুমিত আওয়াস্তি।

এই উদাহরণ দেয়ার কারণ হলো, বাংলাদেশে কোনো মিডিয়া করোনা নিয়ে এমন নির্বুদ্ধিতার পরিচয় দেয়নি। দেশের মানুষ অসেচতন হয়ে থাকলেও, গণমাধ্যম বরাবরই করোনা নিয়ে অতি সচেতন ছিল। করোনার সব সংবাদকে গুরুত্ব দেয়া থেকে শুরু করে মানুষকে সচেতন করে গেছে শুরু থেকে। বাংলাদেশে সরকারি বিভিন্ন পদক্ষেপ করোনা প্রতিরোধে কাজ করেছে। কিন্তু গণমাধ্যম সরকারের তোয়াজ বা প্রশংসা করতে ব্যস্ত থাকেনি। সেসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না তা নিয়ে বেশি বেশি খবর প্রচার-প্রকাশ করেছে। উল্টো, বাইরের চিত্র দেখিয়ে দেখিয়ে সরকারকে আরো কঠোর হতে বাধ্য করেছে গণমাধ্যম। এমনকি করোনা নিয়ে বিশ্বে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় প্রথম কাতারে হয়তো বাংলাদেশ থাকবে। প্রতিটি গণমাধ্যম করোনা দুর্যোগের অনিয়ম নিয়ে প্রতিবেদন ছেপেছে।

মাঝে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে আবার বিপর্যস্ত হচ্ছিল দেশ। সরকার কঠোর হলো, সংক্রমন এখন কমতির দিকে। হাসপাতালে আবার খালি হতে শুরু করে বেড। কিন্তু দেখবেন তৃপ্তির ঢেকুর নেই কোনো মিডিয়ায়। করোনার শুরু থেকে, সাংবাদিকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষের কাছে তথ্য পৌছে দিয়েছে। অনেকে তো জীবনই দিলো। তবু মানুষ যদি করোনা মোকাবেলায় আরেকটু সচেতন হয়, সরকার আরও একটু কঠোর হয়, বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে পারে, নীতি নির্ধারণে যেনো আরো পোক্ত হয়। রাজধানী থেকে শুরু করে দেশের অজপাড়া গায়ের কোনো হাসপাতাল-ক্লিনিকে কী সমস্যা, ডাক্তার নেই, অক্সিজেন নেই, ভেন্টিলেটর লাগবে, চিইকৎসক-নার্স-মেডিকেল টেকনোলজিস্ট কার কোথায় সুযোগ-সুবিধার অভাব, জীবন বাজি রেখে সবার তথ্য তুলে এনেছে গণমাধ্যম। অন্তত, যেখানে যে সমস্যার খবর প্রচার হয়েছে সেসব সমস্যা সমাধানে সচেষ্ট হয়েছে সরকার।

করোনা মহামারিতে দায়িত্ব পালন করছেন বাংলাদেশের একজন গণমাধ্যমকর্মী।

এলোমেলো কথাগুলো বলার একটিই কারণ। পাশের দেশ ভারতের অধিকাংশ রাজ্যে এখন দুঃসহ অবস্থা। শ্মশান, কবরস্থান কোথাও লাশের সারিতে দাঁড়ানোর জায়গা নেই। আইসিইউতে সেরে যাওয়ার পরিবর্তে মৃত্যুপথযাত্রী রোগীর সংখ্যা বেশি। বলা যায় না, বাংলাদেশের এমন অবস্থা নিমিষেই ফিরে আসতে পারে। ক’দিন আগেও দেশের হাসপাতালে যেমন তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না।

ভারত প্রথম সংক্রমণ একটু ভাল অবস্থায় গেলে একদম গা ছেড়ে দিয়েছিল। তাই কুম্ভমেলা থেকে শুরু করে বিভিন্ন পূজা-পার্বণ উৎসবে গা ভাসিয়ে দিয়েছিল সরকার, মিডিয়া ও দেশটির নাগরিকরা। যার পরিণতি সাম্প্রতিক করুণ দিনগুলো। তেমনি বাংলাদেশে রোজার ইদের কেনাকাটা-বাড়ি ফেরার ছবি দেখে সেরকম শঙ্কা মনে জাগছে। ভারতে যেমন বাতাসে লাশ পোড়ানোর গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে, বাংলাদেশে সেরকম লাশ পঁচা গন্ধ পেতে না চাইলে সচেতন হওয়ার কোনো বিকল্প নেই। ভারত থেকে শিক্ষা নেয়ার সময় এসেছে। করোনা এমন একটি ভাইরাস যেখানে ভ্যাকসিন নিয়েও তৃপ্তিতে নেই বিশ্ব। সেখানে কয়েকদিনের লকডাউনে সংক্রমণ কমলে, সন্তুষ্ট হওয়া বা বেঁচে যাওয়ার সুযোগ নেই।

আর তাই, মাস্ক পরা নিয়ে প্রশ্ন শুধু সাংবাদিকরা কেনো করবে? আপনিও রাস্তায় অফিসে, পরিচিত-অপরিচিত যার সাথে দেখা হবে, মাস্ক না পরলে জিজ্ঞেস করুন, আপনি মাস্ক পরেননি কেনো?        


লেখক: জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক, যমুনা টেলিভিশন।





সম্পর্কিত আরও পড়ুন







Leave a reply