বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর বরগুনায় তাৎক্ষণিক বিদ্রোহ

|

সিরাজ উদ্দীন আহমেদ:

আমি ১৯৭৫ সালে বরগুনার মহকুমা প্রশাসক। আমরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচী বাস্তবায়নে নিয়োজিত। সে সময়ে ১৫ আগস্ট সকাল ৭.৩০ মিনিটে বেতারে হঠাৎ ডালিম ঘোষণা করলো-বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছে। সামরিক আইন ও কারফিউ জারি করা হলো। আমি এককভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলাম-এ হত্যাকাণ্ড ও সংবিধান লঙ্ঘনের প্রতিরোধ করবোই। আমি জানতাম অবৈধ সরকারের বিরোধিতা করলে মৃত্যু অনিবার্য- তাই অঙ্গীকার করলাম “This is the end of my life” বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ ও খুনি সরকারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করলে মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও আমি বরগুনার বাকশাল নেতা-কর্মী ও ছাত্রলীগ এবং বঙ্গবন্ধুর অনুগত সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়ে প্রতিরোধ শুরু করি।

আমি প্রথমে ঘোষণা করলাম-আমরা খুনি সরকারকে স্বীকার করি না। বরগুনার রক্ষীবাহিনী নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ি। খুনি সরকারের পক্ষে সকল প্রকার মিছিল ও সমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করি। জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়। তিন দিন বরগুনায় সকল দপ্তরের কাজ বন্ধ থাকে। আমার বাসভবনে জনতার ঢল নেমে আসে। ১৫ ও ১৬ আগস্ট আমার সরকারি বাসভবনে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যার প্রতিবাদে শোকসভা অনুষ্ঠিত হয়। আমি পটুয়াখালী জেলা সদরে অবস্থিত রক্ষীবাহিনী লিডারের সাথে যোগাযোগ করি এবং তাদের অস্ত্র নিয়ে প্রতিরোধ করার নির্দেশ প্রদান করি। রক্ষীবাহিনী ঢাকায় যোগাযোগ করে আমাকে জানায় যে, হেড অফিস থেকে তাদের কোন নির্দেশ দিতে পারছে না।

বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে বরগুনায় যারা আমার সাথে ছিলেন তাদের মধ্যে বরগুনা জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও ফুলঝুরি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা প্রয়াত সিদ্দিকুর রহমান (১৯৭৯ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন), তৎকালীন বরগুনা জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি জাহাঙ্গীর কবীর, ছাত্রলীগ সম্পাদক আব্দুর রশীদ, ছাত্রলীগ সহ-সভাপতি সুলতান আহমেদ, ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু, দেলওয়ার হোসেন, আব্দুল মোতালেব ও আরও অনেকে। বাকশাল নেতাদের মধ্যে ছিলেনÑএডভোকেট নুরুল ইসলাম সিকদার, এডভোকেট নিজামউদ্দিন আহমেদ এমপি, ইউনুস শরীফ, বরগুনা কলেজের অধ্যক্ষ শামসুল আলম, আব্দুল লতিফ ফরাজী, আব্দুল মান্নান প্রমুখ।

বঙ্গবন্ধুর হত্যার প্রতিবাদকারী বরগুনার সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে ছিলেন- বরগুনা মহকুমা পুলিশ কর্মকর্তা ফারুক আহমেদ, জনসংযোগ কর্মকর্তা মাহমুদুর রহমান, সাব-রেজিস্ট্রার আলী আসগর, সার্কেল অফিসার (উন্নয়ন) মোখলেসুর রহমান, মহকুমা ত্রাণ কর্মকর্তা বিপ্লব কুমার শর্মা প্রমুখ।

সেদিন আমরা অস্ত্র তুলে নিয়েছিলাম। আমার সরকারি জিপে ছাত্রলীগ ও বাকশালের কয়েকজন কর্মী ছিল, তাদের হাতে ছিল অস্ত্র। মহকুমা প্রশাসক হিসেবে আমার নির্দেশে বরগুনা শহরে রক্ষীবাহিনী টহল দেয়। ১৫ আগস্ট বরগুনায় ঘোষণা দিয়েছিলাম যে, যারা খুনি সরকারের পক্ষে মিছিল বের করবে তাদের গুলি করে হত্যা করে বরগুনার খাকদন নদীতে ফেলে দেয়া হবে। বরগুনা শহর বা কোন থানায় মিছিল বের হয়নি। বরগুনা ব্যতীত বাংলাদেশের সকল শহরে খুনি সরকারের পক্ষে মিছিল বের হয় এবং তারা আনন্দ করে। এ মর্মবেদনা আজও আমাকে তাড়িত করে।

বরগুনায় আমাদের প্রতিরোধ চলে তিন দিন পর্যন্ত। আমাদের সাথে স্থানীয় সংসদ সদস্য আসমত আলী সিকদার, নিজামউদ্দিন আহমেদ, শাহজাদা আব্দুল মালেক খান যোগ দেন। শাহজাদা আব্দুল মালেক খান খন্দকার মোশতাক আহমেদের আপন ভায়রা। তাকে খন্দকার মোশতাক তার মন্ত্রিসভায় নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মালেক খান তা প্রত্যাখ্যান করেন। এমন চরিত্রের লোক বাংলাদেশে বিরল।

বরগুনায় আমাদের প্রতিরোধ ভেঙ্গে পড়ে। অবৈধ সরকার আমাকে চাকরিচ্যুত করে। পটুয়াখালীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সরকারের আদেশ নিয়ে আমার স্ত্রীর সাথে দেখা করে। সরকারী বাসভবন ছেড়ে দিতে হলো। পটুয়াখালী জেলায় আমার প্রবেশ নিষিদ্ধ হলো। আমি এ আদেশে ভীত হইনি। অবৈধ সরকারের নির্দেশ আমাকে আরও সাহসী করেছিল। আমার স্ত্রী বেগম ফিরোজা, শ্যালিকা বেগম শামসুন্নাহার মিনু ও রানু দুঃসময়ে আমাকে সাহস যুগিয়েছিল।

খবর আসছে আমাকে যেকোনো সময় সরকার গ্রেফতার করতে পারে। যশোর সেনানিবাস থেকে খবর আসছে তারা নাকি আমাকে মেরে ফেলবে। ইতোমধ্যে বরগুনায় বাকশাল কর্মীদের গ্রেফতার শুরু হয়। বরগুনা ও পটুয়াখালী পুলিশ আমার বিরুদ্ধে রিপোর্ট দিচ্ছে। আমাদের গোপন সভা চলছে। খালেদ মোশাররফ ক্যু করে খন্দকার মোশতাককে ক্ষমতাচ্যুত করলে আমরা সংগঠিত হই। আমরা আত্মগোপনে চলে যাই। অনেকেই ইতোমধ্যে গ্রেফতার হয়ে যান।

ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে চার নেতা হত্যার প্রতিবাদে আমরা বরগুনা শহরে প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা বাবু জ্ঞানরঞ্জন ঘোষের বাসায় গোপন সভার আয়োজন করি। সভায় বরগুনার আওয়ামী লীগ সেক্রেটারি এডভোকেট নুরুল ইসলাম সিকদার, ন্যাপের সেক্রেটারি এডভোকেট জয়নাল আবেদীন এবং বরগুনা কলেজের অধ্যক্ষ শামসুল আলম উপস্থিত ছিলেন। আমরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলাম ৬ নভেম্বর বরগুনায় জেলহত্যার প্রতিবাদে হরতাল পালিত হবে। রাতে বাকশাল ও ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা প্রচার চালায়। ৬ নভেম্বর জেলহত্যার প্রতিবাদে বরগুনায় পূর্ণ হরতাল পালিত হয়। বাংলাদেশে ঢাকার পরে শুধু বরগুনা শহর ছাড়া আর অন্য কোথাও হরতাল পালিত হয়নি।

জনতা তাকে হত্যা করেনি। অথবা জনতা প্রচণ্ড গণআন্দোলন করেও তাকে হত্যা করেনি। দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীরা তাকে হত্যা করেছে। জনগণের নিকট তিনি চিরদিন ‘শেখ সাহেব’ বা ‘বঙ্গবন্ধু’ হিসেবে চিরঞ্জীব হয়ে থাকবেন। কারণ তিনি ছিলেন বাঙালির মুক্তির মহানায়ক, শ্রেষ্ঠতম বাঙালি।

লেখক: সাবেক সচিব।









Leave a reply