১৫ আগস্ট এবং শোকাবহ শূন্যতা

|

অধ্যাপক ডা. এস এম মোস্তফা জামান:

তার কথা বলছি। অশ্রুভেজা শোকাবহ ১৫ আগস্ট। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪৫ তম শাহাদত বার্ষিকী ও জাতীয় শোক দিবস। ‘মুজিব আমার স্বাধীনতার অমর কাব্যের কবি’ যে মানুষটির হাত ছুঁয়ে এসেছিলো স্বাধীনতা। সবুজ মানচিত্র .. লাল সবুজের পতাকা .. একটি দেশ।

“বিপ্লব স্পন্দিত বুকে মনে হয় আমিই মুজিব”
“কে বলেছে মুজিব নাই , মুজিব সারা বাংলায়”
“এক মুজিব লোকান্তরে , লক্ষ মুজিব ঘরে ঘরে”

এই শ্লোগান গুলো আমার রক্তের সাথে সতত প্রবহমান। মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত যে মানুষটি থাকবে আমার প্রতিটি নিঃশ্বাসে প্রশ্বাসে। আমি কোনদিন বঙ্গবন্ধুকে কাছ থেকে দেখিনি। আমি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারিনি।

কিন্তু এই দুঃখবোধ যেমন আমাকে কাঁদায় ঠিক তেমনি মুক্তিযুদ্ধ – বঙ্গবন্ধু আমার প্রতিদিনের অহংকার।
আমার বাবার সৌভাগ্য হয়েছিলো বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্য পাবার। আবার বাবা আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। কিন্তু সেই গল্পগুলো কতবার যে শুনেছি বাবার মুখে। বঙ্গবন্ধু যে স্কুলে পড়াশোনা করতেন আমার বাবাও পড়তেন একই স্কুলে। আমার বাবা বঙ্গবন্ধুর কয়েক বছরের ছোট। আমার বাবা প্রতিদিন মাইলের পর মাইল হেঁটে স্কুলে যেতেন। স্কুলে প্রথম বেঞ্চে বসতেন। কিন্তু কয়েকজন ছেলে প্রায়ই বাবার বই খাতা ফেলে পেছনে রেখে দিতো। বাবা একদিন সেই সময়ের মুজিবকে এই বিষয়টি জানায়। তারপর থেকে বাবা প্রতিদিনই প্রথম বেঞ্চে বসতো। অর্থাৎ বঙ্গবন্ধুকে না দেখলেও এ রকম অনেক গল্পে বেঁড়ে উঠেছি বঙ্গবন্ধুর সাহস আর শক্তি নিয়ে। আমার বাবা আমাদের একটি লোহার তৈরি রড দেখাতেন আর বলতেন এটি নিয়েই তিনি বঙ্গবন্ধুর ডাকে ঐতিহাসিক ৭ ই মার্চের জনসভায় রেসকোর্স ময়দানে গিয়েছিলেন । সেই জনসভার গল্প আমরা শুনতে শুনতে বড় হয়েছি।

আমি যখন খুব ছোট ছিলাম তখনো বঙ্গবন্ধুর একটি পোষ্টার আমাদের বাসায় টাঙানো দেখতাম। পঁচাত্তরের সেই দুঃসময়ে ও বাবা পোস্টারটি নামাতে দেননি। অনেক আত্মীয় স্বজন এসে ভয় মাখানো কথা বলতো। বাবা বলতেন একবারতো ৭১ এ মৃত্যুর খুব কাছ থেকে ফিরে এসেছি। সেই সময়ের দু’আনা দামের বঙ্গবন্ধুর সেই পোস্টারটি হৃদয়ের একেবারে গহীনে নিয়েই বড় হয়েছি।

১৯৭৫ এর ১৫ আগস্টে আমি ছোট ছিলাম। কিন্তু সেই সময়ের বিভীষিকাময় দিনগুলোয় আমার আব্বা ভীষণ আহত হয়েছিলেন। তার ভেতরের শূন্যতা এখনো অনুভব করি। “ শেখ সাহেবকে মেরে ফেলেছে ঘাতকরা… তিনি ভাবতে পারছিলেন না। পাকিস্তানিরা যা করতে সাহস করেনি, এ দেশেরই কিছু লোক তা ঘটিয়েছে।

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাহাদাত বার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবসহ ৭৫-এর ১৫ই আগস্টে ঘাতকের নির্মম বুলেটে নিহত সকল শহীদদের।

ঘাতকরা ভেবেছিল জাতির পিতাকে হত্যা করলেই তাঁর নাম মুছে ফেলা যাবে এই বাংলায়। কিন্তু তারা বোঝেনি বঙ্গবন্ধুর আরেক নাম বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশ প্রত্যাশিত যাত্রা থেকে বিচ্যুত হতে বাধ্য হয়েছিল।

১৫ আগস্ট শুধু বাংলাদেশের ইতিহাসের বড় দুর্যোগ নয়, এটি সারা বিশ্বের ইতিহাসে একটি কলঙ্কজনক অধ্যায়। যে নৃশংসতায় বঙ্গবন্ধু ও তাঁর স্ত্রী-সন্তানদের হত্যা করা হয়েছিল তার কোনও তুলনা বিশ্বের ইতিহাসে নেই। যখন এদেশে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ নামক কালো একটি আইন ছিলো- সেটি বাতিলের জন্য খুব বেশি মানুষের মিছিল দেখিনি। টক শোতে না হোক, আজকের দিনের অনেক বড় বড় ব্যক্তিত্বদের কজনই বা ছিলেন এই কালো আইনের বিরোধিতা করবার জন্য। কিন্তু সেই সাদা কালো পোস্টারে যখন লেখা থাকতো “কাঁদো বাঙালী কাঁদো, ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল কর”

সত্যিই বিচারের বাণী নিভৃতেই কেঁদেছে বছরের পর বছর। খুব বেশিদিন আগের কথা নয় সেই সময় ১৫ আগস্টে হরতাল ডাকা হতো বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ডাকে আমরা হেঁটে হেঁটে যেতাম ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে জাতির পিতার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে অথবা স্বেচ্ছায় রক্তদান অনুষ্ঠান আয়োজন করতে।

আমার বাবা যেমন বঙ্গবন্ধুর বীরত্বের কথা বলতেন আনন্দ নিয়ে আর আমরা সন্তানরা শুনতাম সেইসব দিনের কথা। আমার বাবা কোন নেতা ছিলেন না, কিন্তু সরকারের একেবারেই একজন সাধারণ কর্মচারি হিসেবে জীবন পার করে আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। কিন্তু জীবনাচরণে ছিলেন বঙ্গবন্ধুর মতো সাহসী এবং স্বাধীনচেতা। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ যখন সরকার গঠন করলো ১৯৯৬ সালে। তখন বিটিভিতে বেশ কিছু অনুষ্ঠান করেছিলো ১৯৭১ এর নির্যাতিত মানুষদের কাহিনী নিয়ে অথবা মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে। সেই সময় আমার বন্ধু আব্দুন নূর তুষার একটি অনুষ্ঠান করার দায়িত্ব পেয়েছিল। তুষার আমার বাবার একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছিলো সেই সময়কে ধারণ করে। কিন্তু কয়েকদিন আগে জানতে পারি সেই সময়ের অনুষ্ঠানের কোন কিছুই নেই আর্কাইভে ।

আমার কষ্ট হয়েছিলো শুনে সেটিই ছিলো আমার বাবার মিডিয়াতে প্রথম এবং শেষ সাক্ষাৎকার অথবা কথকতা। সেটিও তুষার বার বার অনুরোধ করায় বিটিভির স্টুডিওতে গিয়েছিলো। একথা মনে করবার কারণ হলো বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় ছিলো না তখন অনেক বঙ্গবন্ধু সৈনিককে দেখতাম যারা কোন কিছু চাওয়া পাওয়ার হিসেব না করেই ৩২ নম্বরে ভিড় করতো জাতির পিতাকে শ্রদ্ধা জানাতে অথবা শেখের বেটিকে এক নজর দেখতে। পরনে ময়লা কাপড় হয়তো “নব্য আওয়ামী লীগার শাহেদদের মতো গুছিয়ে কথা বলতে পারতো না কিন্তু রিকসায় বঙ্গবন্ধুর ছবি টাঙিয়ে ৭ই মার্চের ভাষণ শোনাতো অবলীলায়। আমি সেই সব মুখগুলো খুঁজে ফিরি। আমাকে এখনো উজ্জীবিত করে সেই সব দৃপ্ত শৃঙ্খলমুক্ত মুখ। পায়ে পায়ে যেন হারিয়ে না যায় সেই সব মুখ।

লেখক: অধ্যাপক, হৃদরোগ বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়









Leave a reply