আফরিনে সেনা অভিযান নিয়ে তুরস্ক এত আক্রমাণাত্মক কেন?

|

সিরিয়ার আফরিন নামক এলাকায় সেনা অভিযান চালাতে মরিয়া হয়ে ওঠেছে তুরস্ক। গত কয়েকদিন ধরে দেশটিতে যুদ্ধের দামামা বাজছে। সিরিয়া সীমান্তে ট্যাংকের বহর অপেক্ষমান। সেনারা মহড়া দিচ্ছে।  প্রায় সবক’টি টিভি চ্যানেলে ঘণ্টা ঘণ্টায় আফরিনের সর্বশেষ পরিস্থিতি জানানো হচ্ছে। একটি টিভিতে বলা হয়েছে, ‘আফরিন অভিযানের ক্ষণ গণনা শুরু হয়ে গেছে।’

প্রেসিডেন্ট এরদোগান সোমবার হুমকি দিয়েছেন, সিরিয়ান কুর্দি বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপ ওয়াইপিজি’কে ধুলোয় মিশিয়ে দেয়া হবে। একই সাথে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি। কুর্দি যোদ্ধাদেরকে প্রশিক্ষণ দিয়ে সিরিয়ার সীমান্ত রক্ষায় মোতায়েন করার মার্কিন পরিকল্পনাকে ‘তুরস্কের পিঠে ছুরিকাঘাত’ বলে অভিহিত করেছেন।

গত এক সপ্তাহ ধরে প্রায় প্রতিদিনই এরদোগান আফরিন ইস্যুতে কথা বলেছেন। জানিয়েছেন, তার সেনাবাহিনী সব প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। যে কোনো মুহুর্তের সেখানে অভিযান চালানো হবে।

তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত জাভুসগ্লু মঙ্গলবার কানাডার ভ্যাঙ্কুভারে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস ম্যাটিসের সাথে বৈঠকে বলেছেন, যদি ওয়াইপিজি’কে প্রশিক্ষণ দিয়ে নতুন কোনো বাহিনী গঠনের চেষ্টা করে যুক্তরাষ্ট্র, তাহলে দুই ন্যাটো মিত্রের মধ্যকার সম্পর্কে অপূরণীয় ক্ষতি হবে।

তুরস্কের সেনাপ্রধান হুলুসি আকার একই দিন ব্রাসেলসে ন্যাটোর উচ্চ পর্যায়ের এক বৈঠকে বলেছেন, তুরস্কের সার্ভবৌমত্বের জন্য হুমকি এমন কোনো গোষ্ঠিকে কেউ মদদ দিলে তা মেনে নেয়া হবে না, পাল্টা জবাব দেয়া হবে।

আন্তর্জাতিক সংবদমাধ্যম জানাচ্ছে, ইতোমধ্যে সিরিয়া সীমান্তবর্তী একাধিক প্রদেশে অর্ধশতাধিক ট্যাংক ও সাজোয়া যান পৌঁছে আফরিনে প্রবেশের জন্য অপেক্ষা করছে। এবং কয়েকটি লক্ষ্যবস্তুতে গোলাবর্ষণও করেছে। তুরস্কের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের দেয়া তথ্য মতে, ১৪৬টি টার্গেট নির্দিষ্ট করে রেখেছে সেনাবাহিনী।

কেন এত উত্তেজনা?

সিরিয়া ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র-তুরস্কের মধ্যে সম্পর্ক খারাপ যাচ্ছে বিগত কয়েক বছর ধরে। তবে গত সপ্তাহে ওয়াশিংটনের এক পরিকল্পনার কথা মার্কিন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ পাওয়ার পর দু’দেশের মধ্যে উত্তেজনা চরমে উঠে। নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, তুরস্ক ও ইরাক বরাবর সিরিয়ার সীমান্ত পাহারা দেয়ার জন্য ৩০ হাজার বিদ্রোহী যোদ্ধার একটি বাহিনী গঠন করতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। সেই বাহিনীতে ১৫ হাজার যোদ্ধা থাকবেন সিরিয়ার কুর্দি বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন ওয়াইপিজি থেকে। বাকিদেরকে অন্যান্য বিভিন্ন গ্রুপ থেকে বাছাই করা হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের এ সিদ্ধান্তকে নিজেদের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে তুরস্ক ও সিরিয়া। কোনো স্বাধীন দেশের সরকারের সাথে চুক্তি ছাড়া বাইরের কোনো দেশ সীমান্তরক্ষী নিয়োগ দেবে- এটা স্বাভাবিকভাবেই কারো মেনে নেয়ার কথা নয়। ফলে দামেস্কের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপকে সার্বভৌমত্বে আঘাত বলে অভিহিত করা হয়েছে।

কুর্দি বিচ্ছিন্নতাবাদীরা তুরস্ক-সিরিয়া ও ইরাকের অংশ বিশেষ নিয়ে একটি কুর্দি রাষ্ট্র গঠনের চেষ্টা করে আসছে বহু বছর ধরে। তুরস্কের অভ্যন্তরে কুর্দি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সংগঠনের নাম পিকেকে। আর সিরিয়ার বিচ্ছিনতাবাদীদের সংগঠন হচ্ছে ওয়াইপিজি। তুরস্ক উভয় সংগঠনকে ‘একই মুদ্রার দুই পিঠ’ মনে করে, এবং উভয়কেই ‘সন্ত্রাসী’ তালিকাভুক্ত করেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ মনে করে শুধু পিকেকে’কে। অন্যদিকে ওয়াইপিজি’কে আইএসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করায় সংগঠনটিকে বহু আগে থেকেই অস্ত্র সরবরাহ করছে ওয়াশিংটন।

আঙ্কারার অভিযোগ, ওয়াইপিজি’কে অস্ত্র ও সমর্থন দিয়ে শক্তিশালী করার অর্থ পিকেকে’কেও শক্তিশালী করা, যা দেশটির সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি। এ কারণে সিরিয়ান কুর্দি যোদ্ধাদেরকে অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়ে তুরস্ক সীমান্তে নিয়োগ দেয়ায় আক্রমাণাত্মক হয়ে ওঠেছে আঙ্কারা। এরদোগানের সরকার চায়, কুর্দি বিচ্ছিন্নতাবাদীদেরকে যে কোনো মূল্যে সীমান্ত থেকে সরিয়ে সে জায়গায় তুরস্কপন্থী যোদ্ধাদের পূনর্বাসন করতে।

সামরিক বিশেষজ্ঞ মতিন গুরকান বলছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় কুর্দি যোদ্ধারা শক্তিশালী হয়ে ওঠায় তুরস্ক খুবই উদ্বেগের মধ্যে আছে। এর আগে সিরিয়ার ভেতরে ‌’ইউফ্রেতিস শেইল্ড’ নামে অভিযান চালিয়ে সফল হওয়ার কারণে সিরিয়া ইস্যুতে নিজেদের প্রভাব বজায় রাখতে পেরেছে আঙ্কার। আফরিন অভিযানকে ঘিরে একই রকম চিন্তাও কাজ করছে।’

তবে মতিন মনে করেন, রাশিয়ার সমর্থন ছাড়া আফরিন অভিযানে সফল হওয়া তুরস্কের পক্ষে কঠিন হবে। কুর্দিদেরকে সরিয়ে দিতে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বিমান হামলা। কিন্তু ওই এলাকায় আকাশসীমা নিয়ন্ত্রণ তরে রাশিয়া। এমতাবস্থায় যদি ক্রেমলিন যদি আঙ্কারাকে বিমান হামলার সুযোগ দেয় তাহলে মাত্র একদিনেই আফরিনে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক আহমেদ কাসিম খান বিবিসি’কে বলেছেন, ওয়াশিংটন যদি সত্যি সত্যি ওয়াইপিজি যোদ্ধাদের সমন্বয়ে নতুন বাহিনী গঠন করে ফেলে, তাহলে সিরিয়া পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নতুন দিকে মোড় নেবে। রাশিয়ার সমর্থন পাওয়া সহজ হবে বলে মন্তব্য করে অধ্যাপক খান বলেন, কিন্তু যদি আঙ্কারা সমর্থন আদায় করে ফেলতে পারে তাহলে তা পশ্চিমাদের সাথেও তুরস্কের সম্পর্কে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে।









Leave a reply