নিউজ ফিড পাল্টে কী করতে যাচ্ছে ফেসবুক?

|

বাণিজ্যিক পোস্ট কমিয়ে নিউজ ফিডে বন্ধুদের পোস্টকে অধিক গুরুত্ব দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ফেসবুক। বৃহস্পতিবার ফেসবুকের প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গ তার ফেসবুক পাতার বলেন, “গত কয়েক বছরে বাণিজ্যিক পোস্টে ভরে গেছে নিউজ ফিড, এতে ঢাকা পড়ছে ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত পোস্টগুলো। সপ্তাহ্খানেকের মধ্যেই নিউজ ফিডে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখতে পাবেন।”

তিনি আরও বলেন, “বিভিন্ন মানুষকে কাছে আনাই ফেসবুকের মূল উদ্দেশ্য। সাধারণ ব্যবহারকারীদের শেয়ার করা পোস্টগুলোই বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে সংযোগে মুখ্য ভূমিকা রাখে।”

জাকারবার্গের এ বার্তা ঘুম হারাম করে দিয়েছে সংবাদ মাধ্যমগুলোর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং পাঠক ও দর্শক-শ্রোতা সংশ্লিষ্ট বিভাগের। কেনই বা হবে না, নিউ মিডিয়ার ধারণাটা বলতে গেলে পুরোটাই গড়ে ওঠেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ওপর নির্ভর। দর্শক-পাঠক-ভোক্তা যাই বলা হোক না কেন, সংখ্যা বিচারে ফেসবুক বাকি সবার থেকে বহু যোজন এগিয়ে। এ মাধ্যমটির ব্যবহারকারীর সংখ্যা ২০০ কোটি, যা পৃথিবীর জনসংখ্যার এক চতুর্থাংশেরও বেশি।

পিউ গবেষণা কেন্দ্রের অনুসন্ধান অনুসারে, ফেসবুক মারফতই প্রায় ৪৫ ভাগ মার্কিন নাগরিক খবর পড়ে থাকে। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপট নিয়ে এ ধরনের উল্লেখযোগ্য কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে সংখ্যাটা নেহায়েৎ কমও হবে না।

ফেসবুকের এমন উদ্যোগ গণ মাধ্যম ও অপরাপর প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এক ধরনের অগ্নিপরীক্ষা বলা যায়। প্রযুক্তি ও ডিজিটাল মিডিয়া বিষয়ক মার্কিন সংবাদ মাধ্যম দ্য ভার্জ-এর সম্পাদক কেসি নিউটন বলেন, “অনেক প্রকাশক ভাবেন তাদের প্রচুর পাঠক ও দর্শক-শ্রোতা রয়েছে, কিন্তু তা আসলে এক ধরনের ট্রাফিক (অন্য লিংক থেকে আসা পাঠক ও দর্শক-শ্রোতা)।  আমাদের খুঁজে বের করতে হবে, কাদের সরাসরি পাঠক ও দর্শক-শ্রোতা রয়েছে।”

শুধু কি সংবাদ পরিবেশনকারীদের জন্য এটি খারাপ খবর? আদতে তা নয়, পুরো ডিজিটাল মিডিয়ার বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যিক কাঠামোতে ব্যাপক রদবদল ঘটাতে বাধ্য করবে ফেসবুকের নিউজ ফিড পরিবর্তনের উদ্যোগটি। কেননা, বিশ্বজুড়ে ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের বাজারের অন্যতম বড় অংশ দখল করে আছে ফেসবুক।

গণ মাধ্যম বিনিয়োগকারী বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এম-এর তথ্যানুসারে, ফেসবুক ও গুগল মিলে ২০১৭ সালের বিশ্বের ডিজিটাল বিজ্ঞাপন খাতের ৮৪ শতাংশ নিজেদের দখলে রেখেছিল।

আদতে কি চাইছেন ফেসবুকের সহ-প্রতিষ্ঠাতা জাকারবার্গ? কেউ কেউ বলছেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মিথ্যা ও অপতৎপরতা মূলক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে ফেসবুক ব্যবহার করা হচ্ছে। এ নিয়ে সমালোচনার মুখে ফেসবুককে আরও বেশি স্বচ্ছ করার উদ্যোগ নিয়েছেন জাকারবার্গ।

ভুয়া পোস্টের মাধ্যমে ২০১৬ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন প্রভাবিত করার মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে ফেসবুকের বিরুদ্ধে। এক বিশ্লেষণধর্মী  প্রতিবেদনে মার্কিন গণ মাধ্যম সিএনএন বলেছে, “সর্বশেষ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রে রুশ প্রপাগান্ডা ও হিলারিকে নিয়ে মিথ্যা সংবাদ ফেসবুকে শেয়ার হওয়ার বিষয়টি বেশ আলোড়ন তুলেছিল। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জাতিগত ঘৃণ ও বিদ্বেষমূলক ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে প্রায়শই সংঘাত ও হতাহতের ঘটনা ঘটছে। এ  সব বিষয়কে আমলে নিয়ে জাকারবার্গ ফেসবুকের অ্যালগরিদম পরিবর্তন করতে চাইছেন।”

ওই সব ঘটনা ফেসবুককে আদালত পর্যন্ত নিয়ে গেছে। শুধু ফেসবুক নয়, এ ধরনের ঘটনায় আদালতে যেতে হচ্ছে টুইটার ও ইউটিউবকেও। এ সব ঝুট-ঝামেলা থেকে পরিত্রাণ পেয়ে নিজের ও নিজ প্রতিষ্ঠান ফেসবুকের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে বছরের শুরুতেই ফেসবুকে নিউজ ফিডের পরিবর্তনের কথা জানালেন জাকারবার্গ।

তবে সমালোচকরা বলছেন, সাময়িক লোকসান হলেও আয় বাড়িয়ে নিতে এটি ফেসবুকের সুদুরপ্রসারী পরিকল্পনার একটি অংশ। লন্ডন ভিত্তিক মিডিয়া এজেন্সি ভিসিসিপি মিডিয়ার চেয়ারম্যান পল মিড বলেন, “এটি ব্যবসার সহজ হিসাব: ফেসবুকে স্বল্প সময় ব্যয় ও স্বল্প পরিমাণ বিজ্ঞাপন দেখাতে বেশি অর্থ দিতে হবে।”

শুধু পল নয়, প্রায় একই কথা বলেছেন ইন্টারপাবলিক গ্রুপের ডিজিটাল এজেন্সি মিডিয়া রিপ্রাইজ-এর প্রধান জেমস ডগলাস বলেন, “এটি আর কিছুই নয়, ফেসবুকে দেখাতে বেশি টাকা নেওয়ার একটি আয়োজন।”

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, যদি আয় বাড়িয়ে নিতেই ফেসবুক এ উদ্যোগ নিয়ে থাকে; তবে অত বড় একটি পরিবর্তনের ধাক্কা ফেসবুক বহন করতে পারবে? ইতিমধ্যে ভালোই লোকসান গুণেছে ফেসবুক ও জাকারবার্গ।

বিখ্যাত ম্যাগাজিন ফোর্বসের তথ্য অনুসারে, নিউজ ফিডে পরিবর্তনের ঘোষণা একদিন পর শুক্রবার ফেসবুকের শেয়ার দরও কমেছে চার দশমিক ৪০ শতাংশ। শুক্রবার দিন শেষে ফেসবুকের শেয়ার দর নেমে আসে ১৭৯ ডলার ৩৭ সেন্টে। বৃহস্পতিবার এ কোম্পানির শেয়ার দর ছিল ১৮৭ ডলার ৭৭ সেন্ট।

ফোর্বস আরও জানিয়েছে, ফেসবুকের শেয়ারের অবনমনে ব্যক্তিগতভাবে জাকারবার্গে লোকসান হয়েছে তিন শত ত্রিশ কোটি ডলার।

ফিন্যান্সিয়াল টাইমস জানিয়েছে, নিউজ ফিড পরিবর্তন করলে ফেসবুকের রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ৯ শতাংশ অবধি কমতে পারে। উল্লেখ্য, প্রতিষ্ঠানটি প্রতিবছর প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ৩৯ শতাংশ।

তবে ইতিমধ্যে যে পরিমাণ লোকসান হয়েছে, সেই ধারায় আগামী কয়েক মাস চলতে থাকলে বিনিয়োগকারীরা ফেসবুকের সঙ্গে থাকবেন কিনা, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ প্রকাশ করেছে ব্যবসা সংক্রান্ত বিশ্লেষক সংবাদ মাধ্যম ব্লুমবার্গ।

ব্লুমবার্গের এ ধরনের হিসবা-নিকাশ জাকারবার্গও নিশ্চয় করেছেন? তবে কি তিনি তার এই পরিকল্পনা বাদ দেবেন? ভবিষ্যতে কি করবেন তা এখনই বলা যাচ্ছে না। তবে তিনি যে প্রস্তুনি নিয়েই নেমেছেন, তার বক্তব্য থেকে সেটি স্পষ্ট।

 

যমুনা অনলাইন: এফএইচ









Leave a reply