মুগ্ধতার আরেক নাম সত্যজিৎ রায়

|

উপমা মাহবুব:

তিনি সেই মানুষ যার লেখা বই পড়তে পড়তে বইটির পাতায় পাতায় আঁকা পেন্সিল স্কেচে হাত বুলাতাম। কী অসাধারণ গল্পের প্লট। চমৎকার আঁকার হাত। প্রতিটা বই-এর মলাট লেখকের নিজের হাতে অলংকরণ করা। প্রচ্ছদগুলো থেকে চোখ ফেরানো যায় না। মনে মনে ভাবতাম একজন মানুষ একসঙ্গে লেখক আবার আঁকিয়ে – এটা কিভাবে সম্ভব? গোয়েন্দা কাহিনী, সায়েন্স ফিকশন, ছোট গল্প- কোনটা ফেলে কোনটা পড়ব তা বুঝে উঠতে পারতাম না। পড়া বই বার বার, হাজারবার পড়তাম। আমার শৈশবের অনেক বড় অংশ জুড়ে আছেন সত্যজিৎ রায় নামের এই মানুষটি। উপেন্দ্র কিশোর রায়ের পুত্র সুকুমার রায় এবং সুকুমার রায়ের পুত্র সত্যজিৎ রায়। সবাই অসম্ভব গুণী। অসাধারণ লেখনশৈলীর অধিকারী। এক প্রজন্মের পর যেন আরেক প্রজন্ম আরও মেধা ও সৃজনশীলতা নিয়ে পৃথিবীতে এসেছেন। এটা কিভাবে সম্ভব?

শুধু লেখা নয়, সত্যজিৎ রায়ের নির্মাণ করা সিনেমায় শৈশব থেকে তরুণ বয়স পর্যন্ত বুঁদ হয়ে থেকেছি। কাহিনী, নির্মাণ কৌশল থেকে শুরু করে মিউজিক কম্পোজিশন সবকিছুতেই তিনি অনন্য। আজও চোখে ভাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস ফাঁকি দিয়ে টিএসসিতে গেছি সত্যজিত রায়ের সিনেমা দেখতে। বেশ হাস্যকর এ্যারেঞ্জমেন্ট। টিএসসি অডিটোরিয়ামে একটা প্রজেক্টর চালানো হয়েছে। ১০ টাকার টিকেট কেটে আমরা অসংখ্য ছেলেমেয়ে ভালো করে দেখা যায় না, শোনা যায় না এমন অবস্থাতেই মুগ্ধ হয়ে তাঁর বানানো সিনেমা দেখছি! আর কী দারুণ ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মানুষ ছিলেন সত্যজিৎ রায়। তাঁর চেহারা, কথা, আচার-আচরণ সবকিছুতেই বুদ্ধিমত্তা, সৃজনশীলতা আর প্রবল ব্যক্তিত্ব ফুটে উঠতো। টিভিতে হোক বা ছবিতে, আমি তাঁর দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতাম। ওনি যা তা উনার প্রতিটি পদক্ষেপে প্রকাশ পেতো। ভেতরের মানুষটাকে তার বাহিরের আবরণ দেখে এ নিমিষেই চিনতে পারা যায়, এ রকম মানুষের সংখ্যা নিঃসন্দেহে খুবই কম।

সত্যজিৎ রায়ের এতটাই ভক্ত ছিলাম যে ইচ্ছা হতো ওনার একটা পোস্টার রুমে টাঙ্গিয়ে রাখি। সে সময় তাঁর যে পোস্টারগুলো পাওয়া যেত তার কোনোটাই আমার পছন্দ ছিল না। হয় বেশি বয়সের ছবি, নইলে নায়কের মতো চেহারার তরুণ সত্যজিত। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শেষ পর্যায়ে আজিজ সুপার মার্কেটে ওনার একটা পোস্টার পেলাম। একদম যেমন চাই ঠিক তেমনি। ছবিটা কাঁধ পর্যন্ত তোলা। পুরো চেহারা স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। একটু বাঁকা হয়ে তাকিয়ে আছেন৷ তরুণ নন, অতি বয়স্কও নন। দুই চোখে প্রবল ব্যক্তিত্ব, মেধা আর সৃজনশীলতা একসঙ্গে খেলা করছে। খুবই এ্যারিস্ট্রোকেট চেহারা। কিন্তু এই অহংকার ধনসম্পদের অহংকার নয়, সৃজনশীলতার অহংকার। এই ছবির দিকে তাকালে সত্যজিৎ রায়কে চেনেন বা এমন মানুষও উপলব্ধি করবেন যে ছবির মানুষটা কোনো সাধারণ কেউ নন। অবশ্যই তিনি দারুণ প্রতিভাবান একজন বিশেষ ব্যক্তি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষদিন পর্যন্ত সত্যজিৎ রায়ের এই পোস্টারটা আমার হল জীবনের সঙ্গী ছিল।

গতবছর কক্সবাজার থেকে রাতের বাসে ঢাকা ফিরছি। নেট ঘাঁটতে ঘাঁটতে হঠাৎ পেয়ে গেলাম সত্যজিৎ রায়ের লেখা শেষ বই ‘অপুর পাঁচালী’র পিডিএফ ভার্সন৷ শৈশব থেকে পরিচালক হয়ে ওঠা সত্যজিৎ রায়ের জীবন কাহিনী। বইটি থেকে তাঁর শৈশবের জীবন সংগ্রাম, পথের পাঁচালী, অপরাজিত, অপুর সংসার – এই সিনেমাগুলো বানাতে পাড়ি দেওয়া কঠিন পথের বর্ণনা, তীব্র আর্থিক সংকট – এসব বিষয়গুলো সম্পর্কে জানতে পেরে বিস্মিত হয়েছি। হয়েছি শ্রদ্ধায় অবনত। বইটা সত্যজিৎ রায় ইংরেজি ভাষায় লিখেছিলেন। কিন্তু প্রকাশ করার আগেই তিনি মারা যান। তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবারের বেখেয়ালের সুযোগ নিয়ে কেউ একজন বইটির ফাইনাল পান্ডুলিপি চুরি করে। পরে সত্যজিৎ রায়ের স্ত্রী হাতে লেখা কাটাকুটিতে ভরা প্রথম পান্ডুলিপি থেকে দীর্ঘদিন পরিশ্রম করে ‘মাই ইয়ার্স উইথ অপু’ বইটি দাঁড় করান। পরে এটি ‘অপুর পাঁচালী’ নামে বাংলায় তর্জমা করা হয়। বইয়ের পেছনের ঘটনাটিও কী চমকপ্রদ! সেদিন রাতের অন্ধকারে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে পুরো বইটা পড়ে শেষ করেছিলাম। মনে হচ্ছিল আবারও শৈশবের সেই সত্যজিৎ রায়ে দিনরাত ডুবে থাকা পাঠকে পরিণত হয়েছি।

তারপরও এটা সত্যি যে শৈশব ও তারুণ্যের সেই আবেগময়তা এখন আর নেই। সত্যজিৎ রায়ের লেখা প্রিয় বই আর তাঁর বানানো সিনেমার বেশিরভাগ কাহিনীই ভুলে গেছি। কিন্তু আমার মানসিক বিকাশকে প্রবলভাবে প্রভাবিত করেছিল যে মানুষটি, বইপোকা হতে শিখিয়েছিলেন যিনি, কল্পনায় নিয়ে গেছেন গ্যাংটক থেকে হিমালয়, তাঁকে কী আর ভোলা যায়? গত বছর থেকে তাই খুব শখ হয়েছে কলকাতা যাওয়ার। সত্যজিৎ রায়ের বাসার সামনের ফুটপাতে মাটির ভাড় ভরা চা হাতে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবো। কল্পনার চোখ দিয়ে দেখবো তিনি এই পথ দিয়ে হাঁটছেন। সত্যিই, এখনও হঠাৎ করে কত শত অদ্ভুত চিন্তা মাথায় আসে! হয়ত এই ইচ্ছাটা ভবিষ্যতে পূরণ হবে, হয়ত হবে না৷ তবে বেশ কয়েকটা প্রজন্মকে সম্মোহিত করে রেখেছিলেন যে মানুষটি তিনি আমার হৃদয়ে থাকবেন শ্রেষ্ঠ বাঙালির একজন হয়ে। আমাকে সবচেয়ে প্রভাবিত করতে পারা মানুষের আসনে তিনি অধিষ্ঠিত হয়ে আছেন। ২ মে সত্যজিৎ রায়ের শততম জন্মদিন পার হলো। জন্মশতবার্ষিকী সমাগত। তার প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি।

লেখক: উন্নয়ন পেশাজীবী ও কলাম লেখক।









Leave a reply