তোমারও কি চিড়িয়াদের মতোই কান্না পাচ্ছে?

|

তোমারও কি চিড়িয়াদের মতোই কান্না পাচ্ছে?

সাদিক হাসান শুভ:

বাঘঃ জানো আমাদের বিশাল একটা বন ছিল।
ছানাঃ বন? সেটা আবার কী?
বাঘঃ ও আচ্ছা। তুমি তো কখনো বন দেখনি! তোমার জন্ম হয়েছে এই কারাগারে। শোন, বন হলো অনেকগুলো গাছ আছে এমন একটা জায়গা। ঐখানে ফ্লোর পাকা না। ঐ যে বাইরে দেখ, যেমন মাটি দেখা যায়, বনের পুরুটা জুড়েই শুধু মাটি আর ঘাস। সেখানে আমরা বনের এ মাথা থেকে ও মাথা দৌড়াতাম।
ছানাঃ উফ! এগুলো কী শব্দ ব্যবহার কর আমি কিছু বুঝি না। দৌড় আবার কী জিনিস?
বাঘঃ দৌড় হলো জোরে জোরে হাঁটা। অনেক জোরে জোরে। আমরা এখানে যেভাবে হাঁটি তার চেয়ে হাজারগুণ জোরে হাঁটা।
ছানাঃ কেন এত জোরে হাঁটতে?
বাঘঃ আমরা শিকার ধরতাম। হরিণ বা গরু। একবার একটা মহিষ শিকার করতে গিয়ে লাথি খেয়েছিলাম। আমার পা দুই মাস ব্যথা ছিল।
ছানাঃ এগুলো কি খাওয়ার জন্য ধরতে?
বাঘঃ হ্যাঁ। আমরা সবাই মজা করে খেতাম।
ছানাঃ কেন মানুষ তোমাদের খাবার দিত না? আমাদের যেভাবে মাংস কেটে দেয়?
বাঘঃ হা হা হা। ঐখানে এই সব মানুষ যেতো না। সেখানে আমাদের রাজত্ব ছিল। আমরা যা চাইতাম তাই করতাম।
ছানাঃ তাহলে তুমি এখানে আসলে কীভাবে?
বাঘঃ এই মানুষগুলো আমাদের ধরে এনেছে। আমাদের মুক্ত জীবন এখন খাঁচায় বন্দি। কতদিন দৌড়াই না। কতদিন ঘাসের উপর শুই না। কতদিন তাজা হরিণের মাংস খাই না। এখন শুধু চেয়ে চেয়ে এই মানুষগুলোকে দেখি আর মনে মনে ভাবি যদি একদিন সুযোগ পাই তাহলে এদের সবগুলোকে খেয়ে ফেলব।
ছানাঃ তোমার অনেক কষ্ট হচ্ছে তাই না? আমার অবশ্য খুব কষ্ট হচ্ছে না, কারণ আমিতো জন্ম থেকেই এখানে। তবে তোমার কথা শুনে খুব বনে যেতে ইচ্ছা করছে। যদি বের হতে পারতাম তাহলে তোমার সাথে বনে হাঁটতাম, দৌড়াতাম। আমি কল্পনা করছি। আচ্ছা আমাদের আটকে রেখেছে কেন?
বাঘঃ ওরা আমাদের দিয়ে পয়সা কামায়। মানুষদের মধ্যে দুইটা গ্রুপ আছে। একটা গ্রুপ আমাদের ধরে এনে বন্দি করেছে। আরেকটা গ্রুপ আমাদের দেখতে আসে। যেই গ্রুপটা দেখতে আসে তারা টাকা দেয় আর যারা বন্দি করেছে তারা টাকা কামায়।
ছানাঃ মানুষ আমাদের দেখতে আসে কেন? যদি মানুষ দেখতে না আসতো তাহলে কি আমাদের ছেড়ে দিতো?
বাঘঃ মানুষ খুব নিষ্ঠুর একটা জাতি। তারা অন্যদের কষ্ট দেখে মজা পায়। দেখো না, ঐ বানরগুলোকে বিরক্ত করে মানুষের ছোট ছোট বাচ্চারা হাসিতে ফেটে পড়ে। তবে এরা আমাদের দেখতে না এলে হয়তো আমাদের ছেড়ে দিতো।
ছানাঃ এরা খুব খারাপ। এরা আমাদের খাঁচার সামনে এসে কী বিশ্রি ভাবে তাকায়। যেন জীবনে বাঘ দেখেনি। আমার লজ্জা লাগে। ভদ্রতা বলে তো একটা কথা আছে। আমাদের দেখার কী আছে? আমরা কি তাদের দেখতে যাই? যত্তসব!
বাঘঃ ওরা কত ভয়ংকর চিন্তাও করতে পারবে না। ওরা বন কাটতে কাটতে আমদের থাকার জায়গায় কারখানা করেছে। ওদের ভয়ে আমরা দূরে চলে গিয়েছিলাম। একদিন আমি আর ভাই আমাদের পুরনো জায়গাটা দেখতে গিয়েছিলাম, ঐখানে আমাদের অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। ওরা ভাইকে পিটিয়ে মেরে ফেলেছে! আমি ছিলাম একটু দূরে। আমাকে ধরে এই চিড়িয়াখানায় বন্দি করেছে।
ছানাঃ আল্লাহ, শুনেছি এরা নাকি সৃষ্টির সেরা জীব! এরা কীভাবে সেরা হয়? তুমি এদেরকে আমাদের মতো বন্দি করে দাও। ওরাও বুঝুক আমরা কত কষ্টে আছি।

অতঃপর এলো করোনাভাইরাস।

মেয়েঃ বাবা, এভাবে আর কতদিন? আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে। বুক ফেটে কান্না আসছে। আমি আর বন্দি থাকতে পারছি না।
বাবাঃ শোন, এখন কিছুদিন ঘরেই থাকতে হবে। বাইরে করোনাভাইরাস। বের হলেই মৃত্যু।
মেয়েঃ করোনা শেষ হলে আমাকে কোথায় নিয়ে যাবে?
বাবাঃ করোনা শেষ হলে তোমাকে চিড়িয়াখানা দেখাতে নিয়ে যাব।
মেয়েঃ আমি চিড়িয়া খানা দেখব না। বন্দি থাকার কষ্ট কি তুমি বুঝ না? আমরা কয়দিন বন্দি থেকেই পাগল হয়ে গেছি। আর ওরা জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বন্দি থাকে। ওদের কি কষ্ট হয় না?
বাবাঃ হ্যাঁ। তাইতো। এটাতো ভেবে দেখিনি।
মেয়েঃ প্রাণিগুলোকে মুক্ত করা যায় কীভাবে?
বাবাঃ আমরা না গেলেই ওরা ঐ প্রাণিগুলোকে ছেড়ে দিবে।
মেয়েঃ আমার খুব কান্না পাচ্ছে বাবা। আচ্ছা, তোমারও কি চিড়িয়াদের মতোই কান্না পাচ্ছে?

লেখকঃ শিক্ষক, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়।









Leave a reply