করোনা: দুই মাসে কমেছে ৩৬ কোটি ডলার, রেমিটেন্সে অশনিসংকেত

|

মহামারী করোনাভাইরাসের তাণ্ডবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বেশির ভাগ এক্সচেঞ্জ হাউস বন্ধ রয়েছে। এছাড়া বেকার হয়ে গেছেন অনেক প্রবাসী। ফলে দেশের রেমিটেন্স প্রবাহে প্রবল ধাক্কা লাগা শুরু হয়েছে। গত দুই মাসে (ফেব্রুয়ারি-মার্চ) রেমিটেন্স কমেছে ৩৬ কোটি ডলার। এভাবেই ক্রমাবনতির দিকে যাচ্ছে দীর্ঘদিন ঊর্ধ্বমুখী থাকা প্রবাসী আয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিস্থিতি যে কতটা ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে; তা বোঝা যাবে এপ্রিল-মে শেষে। এটা ঠেকাতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে। বিশেষ করে বিদেশে যেসব নিম্নআয়ের প্রবাসী কর্মহীন হয়ে পড়েছেন, তাদের টিকে থাকার জন্য বাংলাদেশি দূতাবাস থেকে আর্থিক সহায়তা দেয়া যায় কি না, তা গুরুত্ব দেয়া জরুরি।

জানতে চাইলে অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শামস উল ইসলাম বলেন, বিদেশে এক্সচেঞ্জ হাউসগুলো আগের মতো আর সচল নেই। এখন আংশিক রেমিটেন্স পাওয়া যাচ্ছে মোবাইল অ্যাপসের মাধ্যমে।

তিনি বলেন, প্রবাসীরা অনেক দিয়েছেন। এ দুর্দিনে তাদের পাশে দাঁড়ানো উচিত। দু’পায়ে তারা যেন দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন সে ব্যবস্থা করতে হবে।

তিনি প্রবাসীদের সহায়তার প্রস্তাব দিয়ে বলেন, বিদেশে থাকা নিম্নআয়ের বাংলাদেশিদের সরকারিভাবে সহায়তা করা দরকার। অন্তত দুই থেকে তিন মাসের জন্য হলেও কিছু আর্থিক সহায়তা দেয়া প্রয়োজন। তা না হলে তারা বিদেশে টিকতে পারবেন না। আর তারা চলে এলে রেমিটেন্স প্রবাহ আরও নিম্নমুখী হবে।

অগ্রণী ব্যাংক সূত্র জানায়, সরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রেমিটেন্স আসে অগ্রণী ব্যাংকের মাধ্যমে। বিশ্বের ৮৫টি এক্সচেঞ্জ হাউসের সঙ্গে অগ্রণীর চুক্তি আছে। বর্তমানে সর্বগ্রাসী করোনার কারণে চুক্তিকৃত বেশির ভাগ এক্সচেঞ্জ হাউসই বন্ধ। বিশেষ করে ইউরোপের কোনো এক্সচেঞ্জ হাউস খোলা নেই। মালয়েশিয়া থেকে রেমিটেন্স আসা বন্ধ রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশ থেকে মোবাইল অ্যাপসের মাধ্যমে আংশিক রেমিটেন্স আসছে।

এ প্রসঙ্গে অগ্রণী ব্যাংকের রেমিটেন্স বিভাগে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শ্যামল চন্দ্র মহত্তম বলেন, আগে এ সময় প্রতিদিন ১২ থেকে ১৩ হাজার রেমিটেন্স পেতাম; যা প্রায় ৮ থেকে ১০ মিলিয়ন ডলার। এখন তা নেমে এসেছে ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ রেমিটেন্সে; যা প্রায় ২ থেকে আড়াই মিলিয়ন ডলার।

তিনি বলেন, ইউরোপ-আমেরিকা থেকে রেমিটেন্স আসা বন্ধ আছে, মালয়েশিয়া থেকেও আসছে না। শুধু সীমিত আকারে কিছু রেমিটেন্স আসছে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ থেকে। তিনি আরও বলেন, মার্চে রেমিটেন্স আহরণে আমাদের ব্যাপক প্রস্তুতি ছিল। কিন্তু এসেছে মাত্র ১৫ কোটি ডলারের মতো।

বেসরকারি ব্যাংকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি শাখা নিয়ে কাজ করছে পূবালী ব্যাংক। ব্যাংকটির মাধ্যমেও বিদেশ থেকে ভালো রেমিটেন্স আসত। কিন্তু এখন করোনার প্রভাবে রেমিটেন্স প্রবাহের ধারা নিম্নমুখী।

পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আবদুল হালিম চৌধুরী বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ৭৩টি এক্সচেঞ্জ হাউসের সঙ্গে চুক্তি আছে পূবালী ব্যাংকের। করোনার কারণে বর্তমানে এর বড় অংশ বন্ধ রয়েছে। সে কারণে বিকল্প পদ্ধতিতে রেমিটেন্স আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। ফলে রেমিটেন্স কমে তিন ভাগের এক ভাগে নেমে এসেছে।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, বিভিন্ন দেশে অর্ধশত এক্সচেঞ্জ হাউসের সঙ্গে চুক্তি আছে। কিন্তু এখন বেশির ভাগই বন্ধ। তিনি বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে রেমিটেন্স বড় ধরনের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এটা আরও মারাত্মক রূপ নিতে পারে। শুধু উল্লিখিত কয়েকটি ব্যাংক নয়, এভাবে প্রায় সব ব্যাংক রেমিটেন্স আহরণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ব্যাংকাররা জানান, ফেব্রুয়ারির শুরু থেকেই অনেক দেশ অবরুদ্ধ। সব মানুষ ঘরে বন্দি। দোকান-ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলছে না। কাজ নেই, আয়ের পথও বন্ধ। এভাবে আর কিছুদিন চলতে থাকলে নিজেদের খরচ মেটানোই দায় হয়ে যাবে। সেক্ষেত্রে কীভাবে তারা দেশে রেমিটেন্স পাঠাবেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান মতে, গত ফেব্রুয়ারির আগে প্রায় প্রতি মাসেই গড়ে ১৫ শতাংশের ওপরে রেমিটেন্স আসত। বিশেষ করে রেমিটেন্সের ওপরে ২ শতাংশ প্রণোদনা দেয়ার পর এর প্রবাহ আরও বেড়ে যায়। সেই রেমিটেন্স প্রবাহ গত ফেব্রুয়ারির হিসাবে কমে ১০ শতাংশে নেমে এসেছে। যেখানে আগের বছরের একই সময়ে ছিল প্রায় ১৫ শতাংশ। চলতি মার্চ মাসে রেমিটেন্স প্রবাহের অবস্থা আরও খারাপ।

সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মার্চ শেষে ১২৮ কোটি ডলারের সমপরিমাণ রেমিটেন্স এসেছে; যা গত বছরের মার্চে এসেছিল ১৪৫ কোটি ডলার। এ হিসাবে রেমিটেন্স কমেছে ১৭ কোটি ডলার।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রেমিটেন্স প্রবাহের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। ১১ দশমিক ৬৫ শতাংশ আসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। ইউরোপীয় দেশগুলো থেকে আসে ১২ দশমিক ৩৫ শতাংশ। দেশের প্রায় এক কোটি মানুষ বিদেশে অবস্থান করছেন। এদের বড় একটি অংশ মধ্যপ্রাচ্যে থাকেন।

ইতালিতে বৈধ-অবৈধভাবে থাকেন প্রায় আড়াই লাখ। কিন্তু করোনায় কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন বেশির ভাগ মানুষ। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কেউ ঘর থেকে বের হচ্ছেন না। সে কারণে রেমিটেন্সে এমন ছন্দপতন ঘটছে।





সম্পর্কিত আরও পড়ুন







Leave a reply