দোকানে চা খেতে খেতে করোনা নিয়ে আড্ডা, নেই সচেতনতা

|

নিজস্ব প্রতিনিধি, সাতক্ষীরা
করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে সাতক্ষীরা জেলা জুড়ে চলছে প্রচার প্রচারণা। সরকারি বেসরকারিভাবেও লিফলেট বিতরণ মাইকিং ছাড়াও চলছে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অব্যাহত অভিযান। নোভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে নিজেদের সচেতনতার ওপর। সার্বক্ষণিক পরিচ্ছন্ন থাকা, অন্যের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা এমন বেশ কিছু জরুরি নির্দেশনাও প্রচার করা হচ্ছে বিভিন্ন টেলিভিশনসহ নানা মাধ্যমে। আর এ কারণেই এরই মধ্যে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সিনেমা হলসহ জনসমাগম হয় এমন সব অনুষ্ঠান আয়োজনও।

এত কিছুর পরও অবাক করা বিষয় হলো মানুষ যেন এই বিপদের গুরুত্ব বুঝতেই চাইছে না। সাতক্ষীরা শহরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে মানুষের মধ্যে সচেতনার সামান্যতম উদ্যোগই নেই। শহরসহ গ্রামাঞ্চলের মানুষ সচেতনতা নিয়ে হেলা ফেলা করছে ইচ্ছে মত। শহরে খোলা পরিবেশে সড়কের পাশে চলছে ভাতের হোটেল রেস্তোরা। সেখানে নারী পুরুষ দল বেঁধে খাচ্ছে। জেলার প্রতিটি উপজেলায়ই একই অবস্থা। চায়ের দোকানগুলোতে মানুষের জটলা। গ্রামাঞ্চলের হাট বাজারের অবস্থা খুবই খারাপ। বিভিন্ন পেশায় কর্মরত শ্রমিকরা দিন শেষে চায়ের দোকানে টিভি পর্দার সামনে গায়ে গা ঘেঁষে বসে ও দাঁড়িয়ে করোনাভাইরাস নিয়ে ব্যাপক আলোচনাও করছে। এসব মানুষের একজনও মাস্ক পরিহিত নয়। সম্পর্ক অটুট রাখতে একই কাপে পালাক্রমে চলছে চা পান। কাপটিও ধোয়া হচ্ছে না গরম পানিতে। সেই সাত সকালে বালতিতে রাখা পানিতে কোনোক্রমে ডুবিয়েই তাতে চা ঢেলে ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে ক্রেতার হাতে। এর পাশাপাশি সিগারেটের পর সিগারেট চলছে, দোকানের সামনেই বা খুঁটি বরাবর ঝুলছে পুরোনো ময়লা সুতোয় বাঁধা গ্যাস লাইটার। ঝুলতে থাকা ওই গ্যাসের লাইট শক্ত হাতে ধরে সিগারেটে আগুন ধরাচ্ছে একের পর এক ধূমপায়ীরা।

গতকাল বিকালে বিনেরপোতা বাজারের একটি চা দোকানের সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দেখা গেল, করোনাভাইরাস নিয়ে এখানে আগত ক্রেতা এমনকি দোকানির কোনোই মাথাব্যথা নেই। গরম পানিতে কাপ না ধুয়েই চা দিচ্ছেন ক্রেতাদের। কেন এমন করছেন জানতে চাইলে ওই চা দোকানি বলেন, লিকার কড়া লাল চা বানাতে এমনিতেই বেশি কাঠ পুড়ে যায়। গরম পানিতে বারবার কাপ ধুয়ে চা বেচা সম্ভব না। জেলা প্রাণী সম্পদ অফিসের সামনের চা পান ও সিগারেটের দোকানে একের পর এক ক্রেতা দোকানের সামনে ঝুলিয়ে রাখা গ্যাস লাইটারে সারা দিনে শত শত মানুষ হাতে নিয়ে ব্যবহার করছে। এতে করোনাভাইরাস ছড়ানোর ঝুঁকি বাড়াচ্ছে কি না জানতে চাইলে ওই দোকানি বলেন আপনার ভয় থাকলে লাইটে হাত দিবেন না।

সাতক্ষীরা পৌর শহরে প্রায় ১০ হাজার ইজি বাইক ও চার্জার ব্যাটারি চালিত ভ্যান চালক আছে। এর বেশির ভাগ চালক দুপুরের খাবার খাওয়ার জন্য সস্তা হোটেল খোঁজে। তারা রাস্তার পাশে খোলা জায়গার হোটেলে গাদা গাদি হয়ে বসে খাবার খাচ্ছে। তাছাড়া নিম্ন আয়ের মানুষেরাও রাস্তার ধারে বসে লুচি পুরি সিঙ্গাড়া খাচ্ছে। করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধে ব্যাপক প্রচারের কোনো প্রভাব এসব হোটেলে নেই। দেখলে যে কারোই মনে হবে মানুষ যেন মজা করে ভিড় করেই খাচ্ছে দুপুরের খাবার। অথচ করোনা ভাইরাসের সচেতনতা সৃষ্টি ও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের চোখের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। দফায় দফায় মিটিং করে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে প্রশাসনকে কি করে জেলা বাসিকে সুরক্ষা দেয়া যায় তার জন্য।

এসব নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে করোনা নিয়ে জানতে চাইলে তারা বলেন, কপালে যা আছে তা হবে। বাড়ি বসে থাকলে পরিবারকে খাওয়াবে কে। এসব মানুষেরা পালটা প্রশ্ন ছুড়ে বলেন, তুমি যদি চাল কিনে দাও-আমরা আর হাটে আসব না।

ইজি বাইক চালকের দুই পাশে যাত্রী। পেছনের আসনও যাত্রীত পরিপূর্ণ। কারোর মাস্ক নেই। ইজি বাইকের দুই পাশের হাতল একের পর এক যাত্রী শক্ত হাতে ধরে ওঠা নামা করছে। জীবাণু নাশক ব্যবহার করা হয় কি না এমন প্রশ্নের জবাবে কদম তলার ইজি বাইক চালক বলেন, দিন শেষে বড়ি ফিরে সাবান দিয়ে হাত ধুই। যাত্রীদের কথা তার ভাবার বিষয় নয়।

গ্রামাঞ্চলের খাবারের দোকান ও চা দোকানগুলোতে একই ধরনের চিত্র। সবাই করোনাভাইরাস নিয়ে জ্ঞান গর্ভ আলোচনা করছে। কেউ কেউ ভয়াবহতাও তুলে ধরছে। যারা এসব আলোচনা করছে তারা কেউ মাস্ক পরিহিত না। এসব আলোচকদের কেউ করোনা সচেতনও না।

অন্যদিকে বাস যাত্রীরা হয়ে পড়েছে নিরুপায়। সাতক্ষীরা থেকে বিভিন্ন রুটে চলাচল করা বাসের যাত্রী আগের মতোই। করোনার কারণে কমেনি। বাসের ট্রিপও আগের মতোই। কিন্তু বাসগুলোতে ভাইরাসের বিস্তার রোধে কোনো ব্যবস্থাই নেই। যাত্রী নিয়ে বাস ছাড়ার আগে কোনো ধরনের জীবাণুনাশক স্প্রে করা হচ্ছে না। সবাই গেটের হ্যান্ডেল ধরে উঠানামা করছে। গন্তব্যে পৌঁছার আগ পর্যন্ত বাসের ভিতরের লম্বা রডে ঝুলে থাকছে যাত্রী। সচেতন যাত্রীদের অনেকে মাস্ক পরে থাকছে।

সোমবার সন্ধ্যায় সাতক্ষীরা থেকে যশোর ছেড়ে যাওয়ার আগে ওই বাসের সহকারীকে প্রশ্ন করা হয় যাত্রীরা হাত দিয়ে বাসের যে অংশ ধরছে, সেখান থেকে ভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি আছে। এটা জীবাণু নাশক দিয়ে পরিষ্কার করা হয় কি না। বাসের সহকারী আরিজুল জানায় জীবাণু নাশক? সেটা দিয়ে কি হয়। টার্মিনালে কয়েক জন বাস চালক জানায় করোনা সচেতনা কি তা অনেক পরিবহণ শ্রমিক জানে না।









Leave a reply