করোনা প্রতিরোধ : সময় আছে এখনো

|

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত একজন মারা গেলেন বাংলাদেশে। আর আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়ালো ১৪ তে। ১৬ কোটি মানুষের দেশে এই সংখ্যা খুবই সামান্য। কিন্তু উদ্বেগ উৎকণ্ঠা ভয় বাড়ছে, মানুষের মনে। কারণ, আমাদের জনসংখ্যার ঘনত্ব, মানুষের আচরণ, চিকিৎসা ব্যবস্থা ও প্রশাসনের নানা দুর্বলতা।

যিনি মারা গেলেন, তার বয়স ৭০ বছর। তিনি বিদেশে যাননি, কিন্তু বিদেশ ফেরত একজনের সাহচর্যে এসেছিলেন। সহজ কথায়, সেই বিদেশ ফেরত ব্যক্তি করোনাভাইরাস বহন করে এনে আরেকজনকে দিলেন এবং বয়স্ক ও অন্যান্য জটিলতা থাকায় তাকে মরতে হলো।

প্রশ্ন হলো, সেই ব্যক্তি কি কেবল ঐ নিহত বৃদ্ধের কাছেই গিয়েছিলেন? নিশ্চয় না। তার মানে আরো কতজনকে সংক্রমিত করেছেন, কে জানে? গত একমাসে এরকম লক্ষাধিক মানুষ বিদেশ থেকে এসেছেন। তাদের বিশাল অংশই কোয়ারেন্টাইনে ছিলেন না কিংবা সরকারও বিষয়টাকে ক্যাজুয়ালি নিয়েছিলেন। ফলাফল টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া দেশজুড়েই এখন বিদেশ ফেরত মানুষ। এদের অনেকেই ইতালিসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে আগত। সরকার কেন তাদের আসতে দিল, কেন আরও আগে ফ্লাইট বন্ধ করলো না, এসব আলোচনা বিতর্ক করার সুযোগ বা সময় বিশ্বাস করেন কোনটাই আর নেই।

এখন দ্রুত বিদেশ ফেরতদের খোঁজ নিন। তাদের তালিকা করেন। সরকারের জন্য এটা মোটেও কঠিন কাজ নয়। ইমিগ্রেশন থেকে জেলাভিত্তিক তালিকা ডিসি আর জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানকে পাঠান। তারা ইউএনও ও উপজেলা চেয়ারম্যানদের থানাভিত্তিক তালিকা দিক। তারপর প্রত্যেক উপজেলা তার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কাউন্সিলর, নারী কাউন্সিলারদের সাথে বসেন। স্থানীয় পুলিশের সহায়তা নেন। নিশ্চিত থাকেন, কাউন্সিলর বা মেম্বাররা তার এলাকার সবাইকে চেনেন, জানেন। বিশেষ করে গ্রাম এলাকায় যারা বিদেশ থাকেন, তাদের আরো ভাল করেই চেনেন এলাকার লোকজন। প্রত্যেক ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কমিটি আছে। তাদের সহযোগিতা নিক প্রশাসন। উপজেলায় সম্ভব না হলেও জেলায় একটা হাসপাতালকে আলাদা করুন। সেখানে আক্রান্ত আর সন্দেহভাজনদের রাখেন।

তার আগে জরুরি চিকিৎসক নার্সসহ মেডিকেল স্টাফদের নিরাপত্তা বিধান করা। তাদের জন্য করোনা প্রতিরোধক পোশাক ও অন্যান্য জিনিসপত্র দ্রুত সরবরাহ করতে হবে। মাথায় রাখতে হবে, চিকিৎসক নার্সরা সবচে গুরুত্বপূর্ণ। তাদেরকে ঝুকিতে ফেললে ভুগতে হবে পুরো দেশকে। যত টাকা লাগুক, যেভাবেই হোক ডাক্তার নার্সদের অভয় দেন, তাদের আত্মবিশ্বাসী করুন নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে।

ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতার ওপর জোর দেন। নিজের বাড়ির সামনে বা বিল্ডিংয়ের সামনে অন্তত এক বালতি পানি আর একটা সাবান রাখার বুদ্ধি দিচ্ছেন অনেক চিকিৎসক। এটা করা খুব কঠিন না।

আতঙ্ক ছড়িয়ে লাভ নেই, পরিস্থিতি রীতিমত খারাপ। সেখান থেকে যতটা সম্ভব ক্ষয়ক্ষতি কীভাবে কমানো যায় সেটা ভাবতে হবে। মনে রাখতে হবে, কেবল আপনি বা আপনার পরিবার সচেতন হলেও অন্যের উদাসীনতায়ও আপনি বা আপনার স্বজন আক্রান্ত হতে পারেন।

আমাদের জীবদ্দশায় এ ধরনের বিপদ দেখিনি। যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি, জার্মানি ও ফ্রান্সের মতো দেশগুলো হিমশিম খাচ্ছে করোনা মোকাবিলায়। তাদের অর্থনীতি থেকে শুরু করে সচেতনতা সবই আমাদের চেয়ে অনেক উন্নত। কাজেই ব্যাপকহারে সংক্রমিত হলে বাংলাদেশ পরিস্থিতি সামলাতে পারবে না। একমাত্র উপায় প্রতিরোধ, সেই প্রস্তুতির জন্য দুই মাস সময় আমরা পেয়েছিলাম। সেটি কাজে যে লাগাতে পারিনি, তাও জানি। তারপরও এখান থেকেও ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব। তার জন্য দরকার আমার আপনার দায়িত্ববোধ, সচেতনতা আর অবশ্যই রাষ্ট্রের কার্যকর উদ্যোগ।

মাহফুজ মিশু:

লেখক: মাহফুজ মিশু : বিশেষ প্রতিনিধি, যমুনা টেলিভিশন









Leave a reply