নুরুল হত্যা মামলার আসামিদের আপিল নিয়ে সর্বোচ্চ আদালতের প্রশ্ন

|

ইব্রাহিম খলিল:

রাজশাহীর পুঠিয়ার শ্রমিক নেতা নুরুল ইসলাম হত্যার ঘটনায় পুঠিয়া থানার তৎকালীন ওসি সাকিল উদ্দিনসহ তিন পুলিশ কর্মকর্তাকে দায়ি করে বিচার বিভাগীয় তদন্ত হয়েছে। এরপরেও আবার আপিল কেন? এ প্রশ্ন তুলেছেন আপিল বিভাগ।

রোববার মামলার শুনানিতে বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের বেঞ্চ এ প্রশ্ন তোলেন। এ বিষয়ে শুনানির জন্য আগামী রোববার দিন ধার্য করেছেন আদালত।

গত ১ ডিসেম্বর, রাজশাহীর পুঠিয়ায় শ্রমিক নেতা নুরুল হত্যা মামলা তদন্তের জন্য পিবিআইকে নির্দেশ দিয়েছিলেন আদালত। পাশাপাশি এজাহার কারসাজি করায় ওসি সাকিলের বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষ ও দুদককে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। কিশোর আসামির জবানবন্দি গণমাধ্যমে দেয়ায় এসপি শহিদুল্লাহ’র ব্যাপারে তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণে আইজিপিকে আদেশ দেন আদালত।

এর আগে, গত ১১ নভেম্বর পুঠিয়া থানার তৎকালীন ওসি সাকিল উদ্দিনসহ তিন পুলিশ কর্মকর্তার সম্পৃক্ততা পায় বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি। প্রকৃত হত্যাকারীদের বাঁচাতে শ্রমিক নেতা নুরুল হত্যা মামলার এজাহারই পাল্টে দিয়েছিলেন রাজশাহীর পুঠিয়া থানার তৎকালীন ওসি সাকিল উদ্দীন। জেলা ডিবি পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, প্রকৃত আসামিদের বাদ দিয়ে নিরপরাধ কিশোরকে আসামি হিসেবে দেখানোর। যমুনা টেলিভিশনের অনুসন্ধানে বের হয় কীভাবে ওই কিশোরকে নির্যাতনের পর মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে, নামাজ পড়িয়ে জোরপূর্বক আদায় করা হয় মিথ্যা জবানবন্দি।

বাংলাদেশের রাজশাহী জেলার পুঠিয়া উপজেলার শ্রমিক নেতা নুরুল ইসলাম হত্যার ঘটনায় পুঠিয়া পুলিশ স্টেশনের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাকিল উদ্দিনসহ তিন পুলিশ কর্মকর্তাকে দায়ী করে
বিচার বিভাগীয় তদন্ত হয়েছে। এরপরেও আবার আপিল কেন? এ প্রশ্ন তুলেছেন বাংলাদেশের
সর্বোচ্চ আদালত আপিল বিভাগ।

রোববার মামলার শুনানিতে বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের বেঞ্চ এ
প্রশ্ন তোলেন। নিহত শ্রমিক নেতা নুরুলের মেয়ে নিগার সুলতানা প্রত্যাশা করেন, ভারপ্রাপ্ত
কর্মকর্তা সাকিলের আপিল আবেদনটি খারজি হবে এবং মামলার তদন্ত ও স্বাভাবিক বিচার কাজ
অব্যাহত থাকবে, মূল আসামিরা গ্রেফতার হবে এবং তাদের শাস্তির মাধ্যমে সঠিক ন্যায়বিচার
নিশ্চিত হয়।

অর্ধ বছরের বেশি সময় পর চাঞ্চল্যকর মামলাটি বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালতে ওঠার পেছনে ভূমিকা রেখেছে যমুনার দীর্ঘ অনুসন্ধান। যেই অনুসন্ধানের ফলেই মামলাটি সঠিক তদন্তের পথ পেয়েছে।
সুগম হয়েছে ন্যায় বিচার পাবার পথটি।

বাংলাদেশের রাজশাহী জেলার পূর্বের একটি উপজেলা ‘পুঠিয়া’। সেখানকার একটি ইট ভাটা থেকে মটর
শ্রমিক নেতা নুরুল ইসলামের মরদেহ উদ্ধার হয় ২০১৯ সালের ১১ জুন সকালে। তার আগের রাতে
নিখোঁজ হন তিনি। নুরুল ইসলাম রাজশাহী জেলা সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়ন, পুঠিয়া শাখায় সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী ছিলেন।

এর আগে মটর যান শ্রমিক ইউনিয়ন নির্বাচনে ভোটের পর কারচুপি করে হারানোর অভিযোগ নিয়ে
স্থানীয় আদালতে নির্বাচনের ফলাফল স্থগিত ও তদন্ত চেয়ে একটি আবেদন করেছিলেন নুরুল
ইসলাম। এর পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন পরিচালনা কমিটিসহ প্রার্থীদের বিরুদ্ধে সমন জারি হয় ১০
জুন। নিহত নুরুল ইসলামের পরিবারের দাবি, এতে ক্ষুব্ধ হয়ে সেদিনই তুলে নিয়ে নুরুলকে হত্যা করে
প্রতিপক্ষ।

পরদিন শ্রমিক নেতা নুরুল খুন হবার পর তার মেয়ে নিগার সুলতানা ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল
আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা আহসান উল হক মাসুদ, কলেজ অধ্যক্ষ গোলাম ফারুক, সরকার দলীয়
ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ নেতা মিঠু, শ্রমিক নেতা আব্দুর রহমান পটলসহ ৮ জনের নাম উল্লেখ করে
পুঠিয়া পুলিশ স্টেশনে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। কিন্তু পরবর্তীতে মামলাটির অগ্রগতি জানতে
নিগার আবার পুলিশ স্টেশনে গেলে হতবাক হয়ে দেখতে পান মামলার রেকর্ড ফাইলে আসামিদের নাম
তিনি উল্লেখ করলেও এখন সেখানে আসামি “অজ্ঞাতনামা” লেখা। এতে বিমর্ষ ও হতভম্ব হয়ে নিগারজালিয়াতি ও কারচুপি করে মামলার রেকর্ড ফাইল বদলে ফেলার অভিযোগ তোলেন, পুলিশ স্টেশনের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাকিল উদ্দিনের বিরুদ্ধে।

নুরুল ইসলামের পরিবারের সব অভিযোগ উপেক্ষা করে, ১৮ জুন ২০১৯ এ হঠাৎই ১৬ বছরের এক কিশোরকে এই হত্যা মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে তার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির
কথা উল্লেখ করে সংবাদ মাধ্যমে হত্যারহস্য উন্মোচনের হয়েছে দাবি করে প্রেস বিজ্ঞপ্তি পাঠায়
পুলিশ। পরদিন ১৯ জুন সেটি পত্রিকাগুলোতে প্রকাশিত হয়। যদিও আসামির জবানবন্দির তথ্য সংবাদ
মাধ্যমে হস্তান্তরের বিষয়ে উচ্চ আদালতের কঠোর নিষেধাজ্ঞা আছে। এখানে সুস্পষ্ট আইন লঙ্ঘন
করে পুলিশ।

সেই প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে পুলিশ উল্লেখ করে, গ্রেফতার হওয়া কিশোর আদালতে স্বীকারোমূলক
জবানবন্দী দিয়েছে যে, ‘ষাঠোর্ধ্ব নুরুল ইসলাম একজন সমকামী। কিশোরটির সাথে যৌনকর্ম করতেই
সে জোর করে কিশোরটিকে একটি ইটভাটায় নিয়ে যায়। কিশোরটি যৌনকর্মে রাজি না হয়ে ইট দিয়ে
নুরুল ইসলামের মাথার জোরে আঘাত করে এবং একপর্যায়ে নুরুল মারা যান।’

এমন জবানবন্দির কথা শুনে নিহত নুরুলের মেয়ে নিগার সুলতানা আরো বিমর্ষ হয়ে যান। তিনি দাবি
করে, তার বাবা কখনো সমকামী ছিল না। তিনি ইসলামী রীতিনীতি মেনে চলতেন। হত্যার মূল আসামিদের রক্ষা করতেই একজন নিরপরাধ কিশোরকে গ্রেফতার করে হুমকি দিয়ে জোর করে মিথ্যা জবানবন্দি আদায় করেছে পুলিশ।

নুরুল ইসলাম হত্যা মামলার মূল আসামিরা যখন গ্রেফতার হচ্ছে না, নিরপরাধ এক কিশোরকে গ্রেফতার করে যখন মামলা ভুলভাবে পরিচালনার করা চেষ্টা চলছে, যখন পুঠিয়া পুলিশ
স্টেশন যখন সঠিকভাবে মামলা তদন্ত করছে না, ঠিলেঠালাভাব দেখাচ্ছে, তখন নিহত নুরুলের মেয়ে
নিগার সুলতানা নিরুপায় ও অসহায় হয়ে পড়েন।

উপয়ান্ত না দেখে মামলাটির সঠিক তদন্ত ও মূল আসামিদের গ্রেফতার চেয়ে উচ্চ আদালতে ০৮
সেপ্টেম্বর, ২০১৯ এ একটি রিট মামলা দায়ের করেন নিহত নুরুলের মেয়ে নিগার সুলতানা।
এর আগে হত্যা মামলা সমস্ত নথি হাতে এসে পৌছায় সংবাদ মাধ্যম যমুনার নিউজের হাতে।

মামলার কাগজ পত্র পর্যালোচনা করে কয়েকটি প্রশ্ন উঠে আসে আমাদের অনুসন্ধানী মনে।
১) শ্রমিক নেতা নুরুল হত্যার মোটিভ কী?
২) পুলিশ কেন হত্যা মামলাটি ফাইল রেকর্ড পরিবর্তন করে আসামিদের নাম মুছে দিল?
৩) পুলিশ কেন একজন অজ্ঞাত কিশোরকে এই মামলায় গ্রেফতার করলো?
৪) মূল আসামি না ধরতে পুলিশকে কারা প্রভাবিত করছে?
৫) কিশোর যদি নিরপরাধ হয় তাহলে সে কীভাবে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিল?
৬) এই মামলাটি বিতর্কিত করতে পুলিশের স্বার্থ কতটুকু?
৭) নুরুল হত্যার সাথে স্থানীয় রাজনীতির সম্পর্ক কতটুকু?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানতে যমুনার অনুসন্ধানী দলকে যায় ঘটনাস্থল রাজশাহীর পুঠিয়ায়। পুঠিয়ায় গিয়ে আমরা কথা বলি নুরুল ইসলামের মেয়ে নিগার সুলতানা, তার স্ত্রী ও পরিবারের অন্যান্য
সদস্যদের সাথে। কথা বলি স্থানীয় লোকজন, মোটরযান শ্রমিক ইউনিয়নের নেতাকর্মী ও নুরুল
ইসলামের সহকর্মীদের সাথে। কথা বলি ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের নেতাদের সাথে।
কথা বলি, অভিযুক্ত ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা আহসান উল হক
মাসুদ, সরকার দলীয় ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ নেতা মিঠু, শ্রমিক নেতা আব্দুর রহমান পটল
কয়েকজনের সাথে।

তাদের বক্তব্যে উঠে আসে, নুরুল স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয় শ্রমিক নেতা ছিলেন। মটরযান শ্রমিক
ইউনিয়ন নির্বাচনে তার জেতার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু তিনি হেরে যান। এবং ভোট কারচুপির অভিযোগ
তুলে আদালতের শরণাপন্ন হন। এই নির্বাচনের ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র ছিল, কারণ এই শ্রমিক ইউনিয়ন নির্বাচনে জয়ীরা পুঠিয়ার স্থানীয় রাজনীতিতে ভালো প্রভাব রাখতে পারে।

স্থানীয়রা আরো বলেন, নুরুল ইসলামের মধ্য তারা কোনো সমকামিতার লক্ষণ বা প্রবণতা দেখেননি।
পুলিশের এই সংবাদ বিজ্ঞপ্তিটি তাদের হতবাক করেছে। এমনকি স্থানীয় মসজিদের ইমামও জানান,
নুরুল ইসলাম নিয়মিত চর্চাকারী মুসলিম ছিলেন। তারা মনে করেন, সমকামিতা নয় বরং শ্রমিক
রাজনীতিই নুরুল ইসলাম হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী হতে পারে।

তবে যাদের বিরুদ্ধে নুরুল ইসলামের মেয়ে নিগার সুলতানা অভিযোগ করেছিলেন, তারা হত্যাকাণ্ডের
কারন হিসেবে নুরুল ইসলামের সমকামিতাকেই সামনে নিয়ে আসে বারবার।

নিহতের নুরুলের পরিবার ও আইনজীবীর দাবি, হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বাঁচাতে একাধিক নিরপরাধ
মানুষকে এ মামলার সাথে জড়িয়েছে পুলিশ। অনেকটা জজ মিয়া আদলে, একটি কিশোরকে নির্যাতন এবং
ভয়ভীতি দেখিয়ে সমকামিতার কথা উল্লেখ করে, আদায় করেছে জবানবন্দি।

নুরুলের স্বজনরা আরো জানান, নুরুলের বিরুদ্ধে সমকামিতার এমন অভিযোগ আনা হয়েছে, যা
স্পর্শকাতর। কিন্তু সেই অভিযোগ প্রমাণের জন্য মরদেহ থেকে সংগ্রহ করা হয়নি নমুনা।

এর মধ্যে, আমাদের হাতে আসে গ্রেফতারকৃত কথিত কিশোর আসামির মায়ের ঠিকানা। আমরা
যোগাযোগ করি তাদের সাথে। কিশোরটির পরিবার গরীব। কিশোরটি বাবা নেই। মা একমাত্র
উপাজর্নক্ষম। পরিবারে রয়েছে তার বৃদ্ধ নানা ও নানী।

কিশোরটি হত্যার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির বিষয়ে জানত চাইলে কিশোরের মা কান্না জড়িত
কণ্ঠে জানান, তার নিরপরাধ ছেলেকে ফাঁসিয়েছে পুলিশ। তার ছেলের কোন দোষই নেই। সেই
হত্যাকাণ্ডের সাথে কোনভাবেই জড়িত নয়।

কিশোরের মা আরো বলছেন, ইটভাটায় সমকামিতার জন্য নুরুলকে ইটের আঘাতে হত্যার যে ঘটনা পুলিশ বলছে, সে-দিন কিশোরটি হত্যার স্থানেই ছিল না, ছিল নিজের বাড়িতেই।

কাঁদতে কাঁদতে অসহায় মাটি বলেন, তারা ছেলেকে ছাড়া তিনি বাঁচবেন না। এই পৃথিবীতে একটি মাত্র
ছেলে ছাড়া তার কেউ নেই। এই মিথ্যা অভিযোগ, পুলিশের সাজানো নাটক মামলা থেকে তার ছেলেকে যেন মুক্ত করা হয়।

আমরা কিশোর আসামির সাথে সরাসরি কথা বলতে চাই। কারণ তার সাথে কথা বললেই এই নুরুল হত্যার আসল রহস্য উন্মোচিত হবে। বেরিয়ে আসবে আসল সত্য। এই মাধ্যমে বোঝা যাবে পুলিশ কি সত্য বলছে নাকি মিথ্যা অভিযোগ সাজিয়ে নুরুল হত্যার আসল আসামিদের রক্ষা করার চেষ্টা করছে।
কিন্তু আমরা কীভাবে কিশোরটির সাথে দেখা করবো। সেতো আসামি। রয়েছে জেলখানাতে। তার সাথে
দেখা করা এবং জেল পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে নিভৃতে নির্ভয়ে কথা বলা সহজ নয়। সত্য উদঘাটনে আমরা পরিকল্পনা করলাম কিশোর আসামির সাথে দেখা করার জন্য।

আমাদের অনুসন্ধানী দল দেখা করতে চায় কিশোরটির সাথে। তবে আসামি হওয়ায় তাকে রাখা হয়েছে
রাজশাহীর পাশের জেলার যশোরের কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে। অনেকে যশোরের এই কিশোর
উন্নয়ন কেন্দ্রকে বলে শিশুদের জেলখানা। অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত শিশু কিশোর আর মামলায় অভিযুক্ত
শিশু কিশোরদের এই শিশু জেলখানায় রাখা হয়। যার নাম কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্র। তাদের প্রাপ্ত
বয়স্ত আসামিদের সাথে রাখা হয় না, কারন এতে প্রাপ্ত বয়স্ত আসামিরা কিশোর আসামিদের ওপর
অত্যাচার নির্যাতন করতে পারে। বাংলাদেশসহ ভারতীয় উপমহাদেশের সব দেশেই কিশোরদের জন্য
আলাদা কারাগার রয়েছে।

আমরা পৌঁছে যাই যশোরে কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে। এখানেই রাখা হয়েছে শ্রমিক নেতা নুরুল হত্যা
মামলার কথিত কিশোর আসামিকে। সেখানে যাওয়া সহজ নয়। আমরা কিশোরের স্বজন সেজে তার মাকে সাথে নিয়ে যশোর কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রের ভিতরে যাই কিশোরটির সাথে দেখা করতে। কারা পুলিশ আমাদের যেতে বাঁধা দেয় না। কারণ তারা ভাবে আমরা কিশোরটি স্বজন। কিশোরটি মা আমাদের সাথে থাকায় আমাদের বিষয়ে কোনো সন্দেহ পোষণ করে না কারা পুলিশরা। তারা আমাদের বক্তব্য সহজে বিশ্বাস করে নেয়।

আমরা কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে অনেক অভিযুক্ত কিশোর আসামি দেখতে পাই। যাদের বয়স ১৮ এর
নিচে। তাদের ছড়িয়ে ছিটিয়ে অনেকটা অবহেলা পড়ে থাকতে দেখা যায়। অনেকের চোখে মুক্তি আকুতি।
তারা তাদের মা বাবা স্বজনদের কাছে ফিরে যেতে চায়। তবে সাজা শেষ না হলে বা মামলার কার্যক্রম
শেষ হবার আগ পর্যন্ত তাদের মুক্ত হবার কোনো উপায় নেই। তবে এই প্রতিষ্ঠানটির নাম কিশোরউন্নয়ন কেন্দ্র হলেও আমরা এখানে কিশোরদের উন্নয়ন বা সংশোধনের কোন ব্যবস্থা দেখি না। সব
জায়গায় বরং কিশোরদের প্রতি অবহেলা ছাপ।

এসব দৃশ্য দেখতে দেখতে আমরা সেই কথিত কিশোর আসামির কাছে পৌঁছে যাই। আমরা একটি
দুশ্চিন্তাগ্রস্থ অসহায় কিশোর মুখ দেখতে পাই, যে মুক্তির সব আশা ছেড়ে দিয়েছে। কিশোরটির মা
তার সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেন। আমরা কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে একটু নিভৃত জায়গায় তাদের
নিয়ে বসি। কিশোরটি আমাদের সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে কিছুটা আতঙ্কিত ও বিচলিত বোধ করে। আমরা তাদের নিশ্চিন্তে থাকার অভয় দেই। বলি, আমাদের সাথে কথা বলাতে তার কোন ক্ষতি নেই। কিন্তু কিশোরটি আতঙ্কিত বোধ করে এই ভেবে, যদি পুলিশ জানতে পারে সে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেছে কারাগারের ভিতর বসে তবে সেটি তার জন্য ভয়ঙ্কর কিছু বয়ে আনবে পুলিশের পক্ষ থেকে। পুলিশ তাকে হয়তো নির্যাতন করবে এটা জেনে গেলে। আমরা আবার তাকে অভয় দেই নিশ্চিন্ত থাকতে বলি, তাকে জানাই পুলিশের এই বিষয়ে কোন কিছু জানায় সুযোগ নেই। সে যেন নির্ভয়ে থাকে।
আমরা তার সাথে আন্তরিকতার সাথে কথা বলি। তার দুশ্চিন্তা দূর করার চেষ্টা করি। তাকে অনুরোধ
করি সত্যিটুকু বলতে। কারণ সে সত্য বললে তার মুক্তির সম্ভাবনা প্রবল হবে। কিশোরটি আস্তে
আস্তে আমাদের কথা আশ্বস্ত হয়।

আগেই বলেছি, পুলিশের দাবি, নুরুল ইসলাম কিশোরটিকে সমকামিতার জন্য বাধ্য করতেন। সহ্য করতে
না পেরে সুযোগ বুঝে তাই ইট ভাটায় এই কিশোর একাই হত্যা করেছে তাকে। যা কিশোরটি স্বীকার
করেছে ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে। আমরা তাকে জিজ্ঞেস করি পুলিশের এই ভাষ্য
সত্য কিনা? আসলেই সে শ্রমিক নেতা নুরুল ইসলামকে হত্যা করেছে কিনা সমকামিতার জন্য? কী
তাই? কিশোরটি এবার আমাদের অকপটে সব সত্য খুলে বলে, সে বলে ভিন্ন কথা। যা আমাদের কান
বিশ্বাস করতে পারছিল না।

কিশোর জানায়, ১৮ জুন তাকে স্থানীয় আদালতে নেয়া হয়। আর রাজশাহী জেলা গোয়েন্দা পুলিশ তাকে
আটক করে ১৪ জুন। এ চারদিন তাকে গুপ্তস্থানে বন্দী করে রাখে পুলিশ।

কিশোরটি জানায়, এসময় তার ওপর অকথ্য নির্যাতন চালায় পুলিশ। সেই অকথ্য অত্যাচার
নির্যাতনের বর্ণনা করার ভাষা তার নেই।

কিশোরটি জানায় পুলিশ অকথ্য নির্যাতনের পর তাকে শিখিয়ে দেয়, আদালতের সামনে জবানবন্দিতে
তাকে কিভাবে অপরাধ স্বীকার করত হবে। কিন্তু কিশোরটি বলে, যে কাজ সে করেনি সে কথা সে
কিভাবে বলবে? সে আদালতে মিথ্যা জবানবন্দি দিতে পারবে না, খুন না করে খুনি হতে পারবে রা।
নির্মম নির্যাতনের একপর্যায়ে তার মাথায় পিস্তল ঠেকায় পুলিশ। বলে, সে আদালতে মিথ্যা
জবানবন্দি না দিলে তাকে গুলি করে হত্যা করা হবে। কিশোরের মুখে এসব কথা শুনে আমাদের শরীর
কাটা দিয়ে উঠে। কতটা নির্দয় ও নিমর্ম হতে পারে একটি আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা। কিশোরটি বলে
চলে, নির্মম নির্যাতনের এক পর্যায়ে নামাজ পড়িয়ে মিথ্যা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়ার কথা বলা হয়। না হলে তাকে মেরে ফেলার হুমকি দেয় পুলিশ। এভাবে মিথ্যা জবানবন্দি দিতে তাকে হত্যার হুমকি দিয়ে রাজি করায় পুলিশ। পুলিশ কিশোরটিকের আরো আশ্বস্ত করে, এই মামলায় তার সাজা কম হয়ে যেন সে দ্রুত মুক্তি পায়, সেই ব্যবস্থা করবে।

শ্রমিক নেতার পরিবার ও তাদের আইনজীবী জানান, নুরুল ইসলাম খুন হন, শ্রমিক রাজনীতির বিরোধীপক্ষের হাতে। পুরো ঘটনাটি ভিন্ন খাতে নিতে, কিশোরের সাথে অবৈধ সম্পর্কের নাটক সাজিয়েছে পুলিশ। টার্গেট করা হয়, গরীব অসহায় পরিবারকে।

এই বিষয়ে আমরা যাই জেলা পুলিশের সর্বোচ্চ কর্মকর্তার সাথে কথা বলতে। মামলাটি তদন্তাধীন,
এমন অজুহাত দেখিয়ে এ বিষয়ে সাক্ষাৎকার দিতে অস্বীকৃতি জানান পুলিশের এসপি। যদিও তদন্ত
চলা অবস্থাতেই গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বলা হয়, নুরুল ইসলামের হত্যাটি হয়েছিল সমকামিতার
জন্য। এমনকি মিডিয়ার সামনে আনা হয় কিশোরটিকে। ছবিও প্রকাশ করা হয় কিশোরটি। অথচ কিশোর আসামির ছবি প্রকাশেও উচ্চ আদালতের কঠোর নিষেধাজ্ঞা আছে। সেই নির্দেশও তোয়াক্কা করেনি পুলিশ।

এরইমধ্যে, প্রত্যাহার করা হয়েছে ওই ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাকিল উদ্দিনকে। পুলিশ জানায়,
অভ্যন্তরীণ কারণে পুঠিয়া পুলিশ স্টেশন থেকে সাকিলকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। যদিও আমাদের
হাতে প্রমাণ আছে, বছরখানেক আগে সম্পত্তি আত্মসাতের অভিযোগে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাকিল
উদ্দিনের বিরুদ্ধে মামলা করেন তার শাশুড়ি। সেই মামালার পর ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাকিল
উদ্দিনের স্বপদে থাকার আইনি বৈধতা হারায়। তাকে প্রত্যাহার করার নির্দেশও দেয় পুলিশ হেডকোয়ার্টার। যদিও সেই আদেশ যথাসময়ে পালন করেনি রাজশাহী জেলা পুলিশ। বরং প্রত্যাহারের
আদেশের পরও বহাল তবিয়তে পুঠিয়া পুলিশ স্টেশনে স্বপদে অবস্থান করেন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা
সাকিল উদ্দিন। স্থানীয়দের থেকে আমরা আরো জানতে পাই আরো একটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায়
ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাকিল উদ্দিনের সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে। সেই বিষয়েও কোনো ব্যবস্থা
নেয়নি রাজশাহী জেলা পুলিশ।

এই পর্যায়ে আমরা শ্রমিক নেতা নুরুল ইসলাম হত্যাকাণ্ডের অনেক প্রশ্নের উত্তর পাই। আমাদের
কাছে অনেকগুলো বিষয় পরিষ্কার হয়। আমাদের অনুসন্ধানের বেরিয়ে আসে কীভাবে পুলিশ শ্রমিক
নেতা নুরুল ইসলাম হত্যাকান্ডের মামলার ফাইল কারসাজি করেছে। জালিয়াতি করে মূল আসামীদের নাম
মামলা থেকে বাদ দিয়েছে। আমারা আরো সত্য উদঘাটন করি, কীভাবে পুলিশ একজন নিরপরাধ
কিশোরকে গ্রেফতার করে। তাদের গোপনে বন্দি করে তার ওপর পাশবিক ও অমানবিক নির্যাতন
চালায়। আমরা সত্য বের করি, কীভাবে কিশোরটিকে পুলিশ পিস্তল ঠেকিয়ে হত্যার হুমকি দিয়ে
জোরপূর্বক স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি আদায়ের ব্যবস্থা করে। আমাদের অনুসন্ধান অনেকখানি
এগিয়ে যায়। আমাদের কাছে আরো পরিষ্কার হয়, মূলত স্থানীয় রাজনীতির প্রভাবে মূল আসামিদের
বাঁচাতে পুলিশ মামলাটি মিথ্যা পরিপূর্ণ করে দেয়। আমাদের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে কীভাবে রাজশাহী
জেলা পুলিশ একটি হত্যা মামলার মূল আসামিদের বাঁচাতে একের পর এক আইন লঙ্ঘন করে অন্যায়ের
পাহাড় সাজিয়েছে। নিরপরাধীকে অপরাধী সাজিয়ে সাজার ব্যবস্থা করছে। চরম অপরাধের মাধ্যমে পুলিশ বিচার ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। বিচারপ্রার্থীদের ন্যায় বিচার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে

সবচেয়ে বড় বাঁধা সৃষ্টি করেছে পুলিশ। অথচ পুলিশকে দেখা হয় আইনের মূল রক্ষক হিসেবে। কিশোরটির বক্তব্য সবিস্তরের বণানা করে আমরা অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করি। তার উপর
নির্যাতন করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি আদায়ের বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ করি। এতে নড়েচড়ে
বসে স্থানীয় প্রশাসন।

এরই মধ্যে ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, রিট মামলাটির প্রাথমিক শুনানি শেষে উচ্চ আদালত হাইকোর্ট
ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাকিল উদ্দিনক কতৃক শ্রমিক নেতা নুরুল হত্যা মামলার ফাইল রেকর্ড
জালিয়াতির অভিযোগটি বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি প্রশ্ন তোলেন, কীভাবে
মামলার তদন্ত চলমান অবস্থায় আসামির জবানবন্দি বিষয়ে পুলিশের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রদান
করলো?

গ্রেফতার কিশোর, তার পরিবার ও নিহত শ্রমিক নেতা নুরুলের পরিবার, সবাই চায় হত্যা মামলাটির
সঠিক তদন্ত ও ন্যায় বিচার। যা নিয়ে গভীর সংশয়ে দিন কাটায় তারা। একজন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে গঠিত হয় বিচার বিভাগীর তদন্ত কমিটি। সবচেয়ে আনন্দ ও প্রাপ্তির বিষয় সংবাদ প্রতিষ্ঠান যমুনার অর্থাৎ আমাদের অনুসন্ধান সংবাদ প্রতিবেদন প্রাথমিক প্রমাণ উপাত্ত হিসেবে গ্রহণ করে বিচার বিভাগীর তদন্ত কমিটি। সেই অনুসন্ধানী সংবাদ প্রতিবেদনের সহায়তা নিয়ে তারা তাদের পরবর্তী ও চূড়ান্ত তদন্ত কাজ পরিচালনা করে।

নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিচার বিভাগীর তদন্ত কমিটি তাদের তদন্ত শেষ করে এবং উচ্চ আদালতে
লিখিত তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। সেই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে-

১) শ্রমিক নেতা নুরুল ইসলাম হত্যা মালার ফাইল রেকর্ডে কারসাজি করা হয়েছে। নিহত নুরুলের মেয়ে
নিগার সুলতানার দায়ের করা মামলার ফাইল রেকর্ডটি জালিয়াতি করে মূল আসামিদের নাম বাদ দেয়
পুলিশ। নিগারের অভিযোগ সত্য প্রমানিত হয়েছে। পুলিশের মামলার ফাইল রেকর্ডটি কারসাজি ও
জালিয়াতি ধরা পড়েছে বিচার বিভাগীর তদন্ত কমিটি কাছে।

২) শ্রমিক নেতা নুরুল ইসলাম হত্যা মালার ফাইল রেকর্ডে কারসাজি ও জালিয়াতিতে সরাসরি জড়িত
পুঠিয়া পুলিশ স্টেশনর তখনকার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাকিল উদ্দিন আহমেদ বাপ্পীসহ বেশ
কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা। এটিও বিচার বিভাগীর তদন্ত কমিটির তদন্তে উঠে এসেছে।

৩) শ্রমিক নেতা নুরুল ইসলাম হত্যা মালার ফাইল রেকর্ডে কারসাজি ও জালিয়াতিতে জড়িতদের মধ্যে
আছেন, ৩ জন অতিরিক্ত জেলা পুলিশ সুপারও।

৪) বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনে আইনগত ব্যবস্থা নিতে বলা হয় এ সমন্ত অপরাধে জড়িত
পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে।

বিচার বিভাগীয় কমিটির সুপারিশে, নিগার সুলতানার প্রকৃত এজাহারটিকে এজাহার হিসেবে নিতে বলা
হয়েছে। পাশাপাশি পুলিশ স্টেশন পুলিশ স্টেশন মামলা ফাইল রেকর্ড প্রাপ্তির স্বীকারপত্র সময় ও
তারিখ উল্লেখ করতে বলেছে।

আমাদের অনুসন্ধানে উঠে আসে পুলিশের জালিয়াতি ও অপরাধের কথা। শ্রমিক নেতা নুরুল হত্যার বিচার বিভাগীয় তদন্তে উপাত্ত হিসেবে গ্রহণ করা হয় টিম যমুনা অনুসন্ধানী প্রতিবেদন। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, মামলার এজাহার কারসাজির দায় রাজশাহী পুঠিয়া পুলিশ স্টেশনর তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাকিল উদ্দিনসহ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. মাহমুদুল হাসান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মু. মতিউর রহমান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আবুল কালাম সাহিদ ও ইন্সপেক্টর তদন্ত মহিনুল ইসলাম এড়াতে পারেন না। প্রতিবেদনের ওপর শুনানি শুরু হয় ২৭ নভেম্বর বুধবার।

এর আগে, অ্যাটর্নি জেনারেলের অনুরোধে, দু’দফা শুনানি পিছিয়ে ছিলেন আদালত। এদিন উচ্চ আদালত
বলেন, হালকাভাবে দেখার নয় পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ। হত্যা মামলার আসামি গ্রেফতারের কথা উল্লেখ করে, একটি কিশোরের কথিত ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি গণমাধ্যমে প্রকাশ করে পুলিশ। আদালত জানতে চান, আইনের কোন ধারায় কিশোর আসামির জবানবন্দি গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হলো। যদিও এ বিষয়ে কোনো সদুত্তর মেলেনি পুলিশ সুপারের জবাবে। আদালতের কাছ থেকে ন্যায় বিচার প্রত্যাশা করেন বাদী নিগার সুলতানা।

বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনের শুনানি শেষে আদেশ দেন ১ ডিসেম্বর, ২০১৯।
১) রাজশাহী পুঠিয়ার শ্রমিক নেতা নুরুল হত্যা মামলা তদন্তের জন্য বাংলাদেশের পুলিশ ব্যুরো অব
ইনভেস্টিগেশন, পিবিআইকে নির্দেশ দিয়েছিলেন উচ্চ আদালত।

২) পাশাপাশি শ্রমিক নেতা নুরুল ইসলাম হত্যা মালার ফাইল রেকর্ডে কারসাজি ও জালিয়াতি করায়
ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাকিল উদ্দিনের বিরুদ্ধে পুলিশ হেড কোয়ার্টার ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ
দেন।

৩) একইসাথে দুর্নীতি দমন কমিশন, দুদককেও পুঠিয়া পুলিশ স্টেশনের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাকিল
উদ্দিনের বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়।
৪) কিশোর আসামির জবানবন্দি গণমাধ্যমে দেয়ায় জেলা পুলিশের এসপি শহিদুল্লাহর ব্যাপারে তদন্ত
করে ব্যবস্থা গ্রহণে পুলিশ হেডকোয়ার্টার ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ, আইজিপিকে আদেশ
দেন উচ্চ আদালত।

উচ্চ আদালতের এই রায়কে বাংলাদেশের বিচার বিভাগ, আইনের শাসন আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর জন্য মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করেন সিনিয়র আইনজীবীরা।

উচ্চ আদালতের এই রায়ে খুশি নিহত নুরুল ইসলামের পরিবার ও গ্রেফতারকৃত কিশোরের পরিবার।
কৃতজ্ঞতা জানান, সংবাদ মাধ্যম যমুনার অনুসন্ধানীর দলের প্রতি। অনুসন্ধানে তৃপ্তি পাই আমরাও।
ন্যায় বিচারের দরজাটি খুললো অবশেষে।

এর পরের সপ্তাহে রাজশাহীর শ্রমিক নেতা নুরুল ইসলাম হত্যা মামলায় গ্রেফতার কিশোরের ৬ মাসের
জামিন মঞ্জুর করে হাইকোর্ট। শ্রমিক নেতা নুরুল ইসলাম হত্যার মোড় ঘুরাতে এজাহার কারসাজি
করা হয়। এরপর নিরপরাধ কিশোরকে আটক করে, নির্যাতন চালিয়ে জবানবন্দি আদায় করা হয়। সেটি
প্রকাশ করা হয় গণমাধ্যমে। জানানো হয়, হত্যাকাণ্ডের কারণ জানা গেছে এবং হত্যাকারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চ ওই কিশোরের ৬ মাসের জামিন
মঞ্জুর করেন। আনন্দে মুক্ত বাতাসে কারাগার থেকে বেরিয়ে আসে কিশোরটি জামিন পেয়ে। কৃতজ্ঞতা জানান, সংবাদমাধ্যম যমুনার অনুসন্ধানীর দলের প্রতি।

এর আগে, এ মামলায় সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার এজাহার কারসাজির প্রমাণের কথা জানান
হাইকোর্টের আরেকটি বেঞ্চ। ব্যবস্থা নিতে বলেন, আইজিপি ও দুর্নীতি দমন কমিশনকে। আর
মামলাটি তদন্তের ভার দিতে বলেন, পিবিআইকে।

এর মধ্যে পেরিয়ে যায় প্রায় তিন মাস, চলে আসে ফেব্রুয়ারি, ২০২০। বাংলাদেশের পুলিশ ব্যুরো অব
ইনভেস্টিগেশন, পিবিআই ইতিমধ্যে শ্রমিক নেতা নুরুল ইসলাম হত্যা মামলায় অভিযুক্ত জাকির
নামের একজনেকে গ্রেফতার করে তার ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নেয়। বাদী নিগার
সুলতানা তদন্তে সন্তুষ্ট। তবে পুলিশের অসহযোগিতার অভিযোগ করেন তিনি। যমুনা সংবাদ মাধ্যমের
নামে তাকে দেয়া হয় ভুয়া ফোনও।

কথিত কিশোর আসামিকে শ্রমিক নেতা নুরুল ইসলাম হত্যা মামলায় সাবেক তদন্ত কর্মকর্তা জেলা
গোয়েন্দা পুলিশের সাব ইন্সপেক্টর রফিকুল ইসলাম হুমকি দেয়ার অভিযোগ ওঠে। কথিত
জবানবন্দির সত্যতা স্বীকার করতে আবারো হুমকি দেয়া হয় কিশোর আসামিকে।
কিশোরের পরিবার জানায়, হাইকোর্ট এই কিশোরের নিরাপত্তার নির্দেশ দিলেও জিডি নেয়নি পুঠিয়া
পুলিশ স্টেশন। পরে পাশ্বর্বর্তী রাজপাড়া পুলিশ স্টেশনয় জিডি করা হয়।

কিশোর আসামির জবানবন্দী গণমাধ্যমে প্রকাশ করে বিষয়ে এসপির বিরুদ্ধে আইজিপিকে তদন্তের
নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। তবে, আইজিপি তদন্ত দলের কাছে বিষয়টি অস্বীকার করে এসপি।

গত ১৮ জুন জেলা পুলিশের মুখপাত্র এডিশনাল এসপি মো. ইফতেখায়ের আলম গণমাধ্যমে জবানবন্দির
বিষয়ে প্রেসরিলিজ গণমাধ্যমে পাঠান। এসপি রাজশাহীর নামে ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে সেদিন প্রেস
রিলিজটি পোস্টও করা হয়।

এক ফোনাআলাপে এডিশনাল এসপি মাহমুদুল হাসানও স্বীকার করেন প্রেস রিলিজের বিষয়টি।
এদিকে, পিবিআই জানিয়েছে, আদালতের নির্দেশনা মতে চাঞ্চল্যকর এই হত্যা মামলাটি নিষ্ঠার সাথে
তদন্ত করছে তারা।

হাইকোর্টের রায় স্থগিত চেয়ে এর বিরুদ্ধে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত প্রধান বিচারপতির আপিল
বিভাগে আপিল করেন পুঠিয়া পুলিশ স্টেশনের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাকিল উদ্দিন।





সম্পর্কিত আরও পড়ুন





Leave a reply