নীরব ঘাতক নাক ডাকা

|

Man snoring while his wife is covering ears with the pillow

ডা. রফিক আহমেদ
অনেকে রাতের বেলায় ঘুমের মধ্যে এত জোরে নাক ডাকে যে, তার পাশের জনের ঘুম ভেঙে যায়। এ রোগের নাম অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া। অ্যাপনিয়া অর্থ যদি কোনো কারণে শ্বাস ১০ সেকেন্ডের বেশি বন্ধ থাকে তখন অ্যাপনিয়া বলা হয়। যারা স্লিপ অ্যাপনিয়ায় আক্রান্ত তাদের ১০ থেকে ৩০ সেকেন্ড পর্যন্ত শ্বাস বন্ধ থাকে এবং শ্বাস নেয়ার জন্য ঘুম ভেঙে যায়। সারা দিনের কর্মব্যস্ততার পর যখন কেউ ঘুমিয়ে যায়, তখন তার শ্বাসতন্ত্রের সঙ্গে জড়িত মাংসপেশিগুলো রিলাক্স বা শিথিল হয়ে যায়। শ্বাসতন্ত্রে ঠিকমতো বাতাস আসা-যাওয়া করতে পারে না বিধায় এমনটি হয়।

৫ বছরের কম বয়সী শিশুরা ঘুমের মধ্যে নাক স্বাভাবিকভাবেই ডাকতে পারে; কিন্তু তারপরও যদি এ সমস্যা ৫-১৫ বছর পর্যন্ত হয় তাহলে অবশ্যই একজন নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে। মধ্য বয়স থেকে বৃদ্ধ বয়সীদের রাতের বেলা নাক ডাকা রোগ বেশি হতে দেখা যায়।

সুস্থ জীবনযাপনের জন্য একজনের প্রতিদিন ৭-৮ ঘণ্টা ঘুমানোর প্রয়োজন; কিন্তু যারা স্লিপ অ্যাপনিয়ায় আক্রান্ত তাদের প্রতি রাতে ১০০ বার বা তারও বেশিবার ঘুম ভেঙে যায়। এতবার যার ঘুম ভাঙে সারা দিন সে কর্মক্ষেত্রে যাক বা যেখানেই যাক না কেন জেগে ঘুমায় এবং স্বাভাবিক কাজ-কর্ম, জীবনযাত্রার মান সবকিছুই ব্যাহত হয়। যারা স্লিপ অ্যাপনিয়ায় আক্রান্ত তাদের রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণ ৪০ শতাংশ বা তারও বেশি কমে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়।

যারা অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়ায় আক্রান্ত তারা দাঁতে দাঁত কাটে, তীব্র নাক ডাকে এবং ঘনঘন শ্বাস নেয়।

অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়ায় যারা আক্রান্ত হন ৮০-৯০ শতাংশ লোকের ক্ষেত্রে সঠিক কারণ নির্ণয় করা যায় না। স্লিপ অ্যাপনিয়ায় আক্রান্তের ঝুঁকির প্রবণতা যাদের বেশি-

* যারা রোগগ্রস্ত মোটা
* পুরুষ যাদের গ্রিবার দৈর্ঘ্য ১৭ ইঞ্চি বা তারও বেশি। মহিলা যাদের গ্রিবার দৈর্ঘ্য ১৬ ইঞ্চি বা তারও বেশি।
* ৫০ বছর বা তদূর্ধ্ব পুরুষ এবং ঋতুস্রাব বন্ধ হয়ে যাওয়া মহিলা।
* যাদের গলার হাড় এবং মাংসপেশির জন্মগত ত্রুটি আছে।
* ডাউন সিন্ড্রমে আক্রান্ত রোগী।
* যেসব শিশুর টনসিল এবং তদসংলগ্ন এডিনয়েড গ্রন্থি বড়।
* হরমনজনিত রোগ যেমন- এক্রমেগালি এবং হাইপোথাইরয়েডের রোগী।
* যারা মদ্যপ, ধূমপান এবং ঘুমের বড়ি সেবনে অভ্যস্ত।
* যারা রাতের বেলা হাঁচি-কাশিতে আক্রান্ত।
* যারা রাত জেগে থাকে, সময়মতো ঘুমায় না।

সঠিক সময় সঠিক চিকিৎসা না করা হলে দেহে অক্সিজেনের মাত্রার তারতম্য ঘটে। বুক ধড়ফড় অর্থাৎ হার্টবিট বেড়ে যায়। দিনের বেলা রক্তচাপ বাড়ে, রাতের বেলা কমে যায়। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়ে, হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হতে দেখা যায়। কোনো কাজ মনোযোগ সহকারে করতে পারে না। বিষণ্নতায় ভোগে, এ রোগে যারা আক্রান্ত তাদের যান্ত্রিক যান চালানো মোটেই নিরাপদ নয়। বেড পার্টনারের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটান।

চিকিৎসা : চিকিৎসার পূর্বশত রোগ নির্ণয় করা। যারা স্লিপ অ্যাপনিয়াতে ভুগছেন তাদের সারা রাত ধরে ল্যাবরেটরি বা স্লিপ সেন্টারে গিয়ে পরীক্ষা করাতে হবে। পলিসমনোগ্রাফির মাধ্যমে ভাইটাল সাইন যেমন ব্রেইন, হার্ট এবং শ্বাস এ তিনটির কার্যক্ষমতা বিস্তারিতভাবে জানা যায়। আমাদের দেশে এ পরীক্ষা বিশেষ বিশেষ কেন্দ্রে করা হয়ে থাকে।

সিপিএপি-নাকে কন্টিনিউয়াস পজেটিভ এয়ারওয়ে প্রেসার মাস্কের মাধ্যমে দেয়া হয়। যাতে করে রোগী স্বাভাবিক শ্বাস নিতে পারেন এবং বায়ুনালি খোলা থাকে। সঠিক মাত্রার অক্সিজেন রোগী পায়। বিভিন্ন ধরনের নতুন নতুন যন্ত্র তৈরি হয়েছে যা একজন স্লিপ বিশেষজ্ঞ বা বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ নির্বাচন করে দিতে পারেন। এটি যারা মধ্যম এবং তীব্র মাত্রার অ্যাপনিয়াতে ভুগছেন তাদের জন্য সঠিক চিকিৎসা।

বিকল্প চিকিৎসা : মুখের মধ্যে এক ধরনের গার্ড ব্যবহার করতে অনেকের দেয়া হয়। মুখের মধ্যে সফট প্যালেট, ইভুউলা, টনসিল, এডিনয়েড বা জিহ্বার অপারেশন ক্ষেত্রবিশেষে নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞরা করে থাকেন। এটি একটি ব্যয়বহুল এবং জটিল অপারেশন যা নির্দিষ্ট কিছু কেন্দ্রে করা হয়।

যারা মৃদু প্রকৃতির অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়ায় ভুগছেন তাদের জন্য কিছু পরামর্শ। যারা রোগগ্রস্ত মোটা তাদের একজন পুষ্টিবিদের মাধ্যমে আদর্শ ওজনে নিয়ে আসতে হবে; যা একটু স্বাস্থ্যসচেতন হলে খুব অসম্ভব নয়। এ ধরনের রোগীরা ভুলেও চিৎ হয়ে ঘুমাবেন না। ডান বা বাঁদিকে পাশ হয়ে ঘুমাবেন। বিছানা ইটা দিয়ে মাথার দিকে উঁচু করে রাখলে সুফল পাওয়া যায়। বাজারে কার্ডিয়াক বেড পাওয়া যায় সেটি ব্যবহার করলেও উপকার পাওয়া যাবে।

বাজারে অনেক ধরনের নাকের ড্রপ, তৈলাক্ত পদার্থ পাওয়া যায়, যা রাতের বেলা ঘুমানোর আগে ব্যবহার করা হলে নাক ডাকা কমতে পারে তবে অ্যাপনিয়া চিকিৎসায় এদের কোনো ভূমিকা নেই।

অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া যেহেতু বিভিন্ন পৃথক পৃথক রোগের কারণে হয়, কাজেই রোগ নির্ণয়পূর্বক সঠিক চিকিৎসা করাই বুদ্ধিমানের কাজ।

ভাত, রুটি, চিনি, মিষ্টি, আলু সবই খাদ্য তালিকা থেকে বর্জন করতে হবে। এ খাবার খেয়ে একজন রোগী ২ মাসে ১২ কেজি ওজন কমাতে সমর্থ হয়েছে। তার দুগ্ধপোষ্য শিশু আছে- শিশুটি পর্যাপ্ত পরিমাণ বুকের দুধও পাচ্ছে। শিশুর হাসি মায়ের খুশি।

আপনি কি অতিমাত্রায় দিবা নিদ্রায় আক্রান্ত :

নিদ্রা আসে না = ০
নিদ্রার মৃদুপ্রবণতা = ১
নিদ্রার মাঝারিপ্রবণতা = ২
নিদ্রার অতিরিক্তপ্রবণতা = ৩

প্রশ্ন স্কোর

* বসে বই পড়ার সময়
* টিভি দেখার সময়
* সিনেমা/সভায় বসে থাকলে
* গাড়িতে এক ঘণ্টার বিরতিহীন ভ্রমণ
* অপরাহ্নে শুয়ে বিশ্রাম নেয়ার সময়
* বসে কারও সঙ্গে কথা বলার সময়
* দুপুরে আহারের পরে বসে থাকলে
* ট্রাফিক সিগন্যালে কয়েক মিনিট গাড়ি থেমে থাকলে

এ ESS স্কোর ১০-এর বেশি হলে আপনি অতিরিক্ত দিবা নিদ্রায় আক্রান্ত; সে ক্ষেত্রে আপনি একজন স্লিপ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

অতিরিক্ত নাক ডাকার কারণে স্বামী-স্ত্রী অনেক সময় এক বিছানায় তো দূরের কথা এক রুমেও ঘুমাতে পারেন না। বিদেশে বিবাহ বিচ্ছেদের যতগুলো কারণ রয়েছে নাক ডাকা রোগ তার মধ্যে অন্যতম।

পরিমিত সুষম স্বাস্থ্যকর খাবার খেলে, প্রচুর পানি (১২-১৫ গ্লাস প্রতিদিন) পান করলে, লাইফ স্টাইল পরিবর্তন, নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপন এবং ব্যায়ামের মাধ্যমে আমরা অতি সহজে এ রোগের থেকে নিষ্কৃতি পেতে পারি।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ, ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল









Leave a reply