তামিম কি দায়মুক্ত?

|

বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি খেলাটা যেন হচ্ছেই না। এর পেছনে একেকজন একেক কারণ দেখছেন। সম্প্রতি আলোচনার কেন্দ্রে বাংলাদেশের সবচেয়ে অভিজ্ঞ ওপেনার তামিম ইকবাল। এক সময় ঝড়ো গতির ব্যাটিংয়ের জন্য যে তামিম প্রাদপ্রদীপের আলোয় এসেছিল সেই তামিম এখন অনেক পরিণত। তুলনামূলক ধীরস্থির ক্রিকেট খেলেন বেশিরভাগ সময়। কিন্তু সেটি কি বর্তমান টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের সাথে মানানসই?

পাকিস্তান সিরিজের প্রথম দুই টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশের ব্যর্থতার পর এ প্রশ্ন আরও বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানদের শরীরী ভাষা পছন্দ হয়নি সমর্থকদের। রান তোলার তাড়ার চেয়ে বরং নিজে ক্রিজে টিকে থাকাতেই বেশি মনোযোগী দেখা গেছে তাদের। অভিযোগের তীর সবচেয়ে বেশি তামিমের দিকেই। বাংলাদেশ প্রথম ম্যাচে রান তুলেছে ১৪১, দ্বিতীয় ম্যাচে ১৩৭। যেখানে প্রথম ম্যাচে তামিম ৩৪ বলে করেন ৩৯ রান, দ্বিতীয় ম্যাচে ৫৩ বলে সংগ্রহ করেন ৬৫ রান। আজকের যমানায় এটা কার্যকরী বলার সুযোগ নেই। অন্তত, একই পিচে যখন পাকিস্তানি ব্যাটস্যমানরা হেসেখেলে ম্যাচ জিতে নেয়।

সবাই অবশ্য নেতিবাচকভাবে দেখছেন না। যেমন অনেকেই বলেছেন, তামিম ছাড়া বাকিরাও তো কার্যকর ইনিংস খেলতে পারতেন। সেটি কেনো হলো না, তামিম তো একপ্রান্ত আগলে থেকে রান তুলেছেন। অন্যরা পারেনি কেনো?

আবার কেউ কেউ কটাক্ষ করে বলছেন, তামিম যতই ধীরে খেলুক না কেন, একদিন ঝড়ো ইনিংস খেললেই সবাই চুপ হয়ে যাবে। আর বাংলাদেশের ক্রিকেটে সিনিয়র ক্রিকেটাররা অনেক প্রভাবশালী।

তবে, ক্রিকেটীয় বিশ্লেষণ থেকে যারা বলার চেষ্টা করছেন তাদের যুক্তি মোটামুটি এরকম, পাওয়ার প্লেতে তামিমের ধীরগতির ব্যাটিং বাংলাদেশকে শুরুতেই পিছিয়ে দিচ্ছে। অপর প্রান্তের ব্যাটসম্যান তো বটেই, ইনিংসের বাকি সময় অন্য ব্যাটসম্যানদের ওপরও দ্রুত রান তোলার চাপ তৈরি করছে। কিন্তু অধিকাংশ সময় সেটা পারছেন না তারা। আর সেরকম পাওয়ার হিটারও বাংলাদেশ টিমে নেই বললেই চলে।

প্রথম ম্যাচে পাওয়ার প্লেতে বাংলাদেশ তোলে ৬ ওভারে ৩৫ এবং দ্বিতীয় ম্যাচে ৩৩। তাতেই বোঝা যাচ্ছে বাংলাদেশ পাওয়ার প্লের সুবিধা মোটেই কাজে লাগাতে পারছে না। সেজন্য, পাকিস্তানের বিপক্ষে দুই ম্যাচে ১০৪ রান করে আপাতদৃষ্টিতে সবচেয়ে সফল ব্যাটসম্যান তামিমের দিকেই আঙ্গুল তুলছেন ক্রিকেট বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, অভিজ্ঞ ও সিনিয়র ক্রিকেটার হিসেবে দায়িত্বটা যেহেতু তামিমের বেশি, দায়টাও তার ওপরই বর্তায়।

প্রথম ম্যাচে ১৩টি এবং দ্বিতীয় ম্যাচে ১৫টি বল ডট দিয়েছেন তামিম। প্রথম ম্যাচে ৩৪ বল অর্থাৎ ৫ ওভার ৪ বলে ৩৯ রান। আরেক ম্যাচে ৮ ওভার ৫ বলে ৬৫ রান করেন তিনি। এই গতিতে রান করে টি-টোয়েন্টি জেতা সম্ভব? ওপেনার এই গতিতে এতগুলো বল খেললে ব্যাটিং লাইনে তো অনেক পাওয়ার হিটার থাকার কথা। কিন্তু বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপে একগাদা ওপেনারই। বিভিন্ন পজিশনে ব্যাট করতে দেখা যাচ্ছে তাদের। এদের কেউই পাওয়ার হিটার নন বরং ক্রিকেটীয় শটে রান তুলতে অভ্যস্ত।

বিশ্লেষক ও কোচ নাজমুল আবেদীন ফাহিমের বিশ্লেষণ, ম্যাচ জেতার জন্য যে স্ট্রাইক রেট প্রয়োজন, সেটার তুলনায় তামিমের স্ট্রাইক রেট কম। সেটিতে সামগ্রিক স্কোরের একটা প্রভাব পড়েই। আমার মনে হয় স্ট্রাইক রেট বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ। ডট বলের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। কমপক্ষে ১৭০-৮০ রান না করলে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে জয় পাওয়া কঠিন।

বাংলাদেশের স্কোয়াডে ওপেনার ৬ জন। সিরিজের প্রথম দুই ম্যাচ মিলে খেলেছেন পাঁচ ওপেনার। তবে দুই ম্যাচেই ওপেন করেছেন তামিম ইকবাল ও মোহাম্মদ নাঈম শেখ। সর্বশেষ বিপিএলে স্ট্রাইক রেট বিচারে শীর্ষ ওপেনারের মধ্যে নাঈম ছয়ে (১১৫.৪৩) তামিম সাতে (১০৯.৩৯)। বাকি তিনজনের মধ্যে কাল দ্বিতীয় ম্যাচে দলের ব্যাটিং অর্ডারে লিটন নেমেছেন চারে, আফিফ পাঁচে ও সৌম্য সরকার সাতে। অথচ বিপিএলে স্ট্রাইক রেটে শীর্ষ ওপেনারদের মধ্যে সৌম্য দুইয়ে (১৪০.২৫), লিটন তিনে (১৩৮.২৬) ও আফিফ পাঁচে (১৩১.৩৮)। বিপিএলে স্ট্রাইক রেটের বিচারে ওপেনারদের মধ্যে যিনি শীর্ষে সেই নাজমুল হোসেন (১৪৫.২৮) দুই ম্যাচের একটিতেও জায়গা পাননি একাদশে।

যারা নতুন বলে ওপনে করে অভ্যস্ত তারা সব পজিশনেই সাফল্য পাবে এটা ধরে নেয়ার কোনো সুযোগ নেই। ফলে তামিম এভাবেই খেলতে থাকলে এবং তার ওপরই আস্থা রাখতে হলে দলের কম্বিনেশন ও গেম প্ল্যান চেঞ্জ করার বিষয়ে ভাবতে হবে টিম ম্যানেজমেন্টকে। অথবা বদলাতে হবে তামিমকে।

আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে ওপেনিং পজিশনে ব্যাট করে এক হাজারের বেশি রান তুলেছেন ১৮ ব্যাটসম্যান। যাদের মধ্যে সবচেয়ে কম স্ট্রাইক রেট (১১৪.৭৪) আহমেদ শেহজাদের। এরপরই আছেন তামিম। তার স্ট্রাইক রেট ১১৬.৮০। আর যদি ব্যাটিং গড়ের কথা বিবেচনা করেন তাহলে এই ১৮ ওপেনারের মধ্য তামিমের গড়ই সবচেয়ে কম (২৩.৮৫)। এই সংক্ষিপ্ত তালিকায় সবচেয়ে বেশি ম্যাচে ওপেন করাদের তালিকায় তামিম আছেন ৫ নম্বরে। পরিসংখ্যানই বলে, যথেষ্ট সুযোগই পেয়েছেন তামিম, অনেক আস্থা তারওপর। সে হিসেবে প্রতিদানের পাল্লাটা খুব ভারি বলার উপায় আছে কী? প্রশ্নটা আরও বেশি উঠে মানুষটা তামিম বলেই।









Leave a reply