কি দেখে বুঝবেন এখন কেউ আত্মহত্যা করবে


মানসিক সমস্যাগ্রস্তদের মনের খবর জানা অনেক কঠিন কাজ, কিন্তু আমরা তার কথা ও কাজের মাধ্যেমে বুঝতে পারি তার মনের ভিতর কি চলছে, আর এই উপায়ে আমরা জানতে পারি কে আত্মহত্যাপ্রবণ। তা জানাচ্ছেন তালহা বিন জসিম।

সবসময় আত্মহত্যার কথা বলা ও চিন্তা করা

প্রায়ই যদি বলে নিজেকে মেরে ফেলবো,  আর ভালো লাগছে না, আমি আর বাঁচতে চাই না,  এখানে বাঁচার মতো আর কিছু নেই। জীবনটা ফাঁদে আটকে গেছে।এই সব চিন্তার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে নিজের ওপর যত্নহীন হয়ে পড়ে। সেলফ কেয়ার করেনা। সবসময় ক্লান্ত অনুভব করে। তাই যারা এসব কথা বলে তাদের ব্যাপারে সতর্ক থাকা উচিত।

চরম হতাশা অনুভূত হওয়া

নিজেকে খুব দু:খী মনে করে,  কোন কাজে আগ্রহ না থাকা,  ঘুম না হওয়া,  খেতে ইচ্ছে না করা। নিজেকে কষ্ট দেয়া। নিজের ক্ষতি করার চেষ্টা করা। এসব চরম আকার ধারণ করলে আত্মহত্যার ঝুকি বেড়ে যায়।

একাকী থাকা

পরিবার বন্ধুবান্ধব থেকে আলাদা হয়ে একাকী থাকার প্রবণতা বেড়ে যায়,  কারো সাথে না মিশে একা একা বেশি সময় কাটানো। প্রিয় বন্ধু ও পরিবার থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেয়া। সামাজিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ না করা। সামাজিক বন্ধন থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিলে এসব মানসিক আহত ব্যক্তিদের ব্যাপারে সতর্ক থাকা উচিত। যেকোন সময় ঘটিয়ে ফেলতে পারে দুর্ঘটনা।

আগ্রহ কমে যাওয়া

একটা বিষয়ে আগে খুব আগ্রহ ছিল কিন্তু সে বিষয়ে এখন আর আগ্রহ নেই,  তখন বুঝতে তার মধ্যে কিছু একটা ঘটছে। যেসব কাজে আগে আনন্দ পেতো, নিজে ইচ্ছে করেই সেগুলো করতো এখন সেটা আর না করা। কিছু মানুষের নেচার থাকে একটা বিশেষ কাজে আগ্রহ থাকা সেটা না থাকেলই বুঝতে হবে কোন সমস্যা আছে। খুব পছন্দের জিনিস যা দীর্ঘদিন ধরে সংগ্রহ করেছে তা অন্যকে দিয়ে দেয়া। আচার আচরনে পরিবর্তন চলে আসা। খুব জোরে চলাফেরা বা কথা বলা অথবা খুব ধীর গতির হয়ে পড়া। নিজের অস্তিত্বের প্রতি উদাসীন থাকা। এসব দেখলে বুঝতে ব্যক্তি এখন ঝুকিপূর্ন অবস্থায় আছে।

হতাশাবাদী মন্তব্য করা

খুব বেশি পরিমানে অসহায়,  জীবনটা বৃথা,  আমার আপন কেউ নেই  এসব মন্তব্য করা। আমি না থাকলেই সবাই ভালো থাকবে,  আমি না থাকলে আমার পরিবার, বন্ধুরা ভালো থাকবে। এসব ভাবনাকারীরা নিজের বেঁচে থাকাটা উদ্দেশ্যহীন, অর্থহীন মনে করে। চিন্তা করো না আমি আর থাকবো না আর তোমাদের ডিস্টার্ব করবো না। আমি চলে গেলে তোমরা তখন বুঝবা আমি তোমাদের কি ছিলাম,  তোমরা তখন দু:খিত হবে। এসব মন্তব্য করলে তার মধ্যে আত্মহত্যার ঝুকি রয়েছে মনে করা হয়।

খুব বেশি ঘুম আবার নির্ঘুম থাকা

শুধু ঘুমুচ্ছে আর ঘুমুচ্ছে আবার জেগে আছে তো আছে,  কয়েকদিন ধরে টানা ঘুমুচ্ছে আবার জেগে থাকছে। ঘুমের কোন ঠিক ঠিকানা নেই। দিনের স্বাভাবিক রুটিন পরিবর্তন হয়ে যাওয়া। ঘুমের সার্কেলে অসুবিধা হলে মানসিক সমস্যাগ্রস্থদের আত্মহত্যার ঝুকি বাড়ে।

সম্প্রতি কোন দুর্ঘটনা:

সম্প্র্র্রতি কোন দুর্ঘটনা মানসিক সমস্যাগ্রস্ত ব্যক্তিকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেয়,  যেমন- প্রিয় কেউ মারা যাওয়া,  ডিভোর্স হওয়া,  সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া,  চাকরি চলে যাওয়া ও খুব অর্থকষ্টে থাকা।

হঠাৎ করেই খুব খুশি,  হতাশ,  চুপচাপ

যদি হঠাৎ করেই মনে হচ্ছে খুব খুশি খুশি আচরন করছে বা একদম চুপচাপ হয়ে পড়েছে,  খুব দুঃখিত হয়ে পড়ছে। অথবা বলে আমি না থাকলেই তোমাদের জন্য ভালো,  আমি তোমাদের খুব বিরক্ত করছি। হুট করেই যদি চোখে পড়ার মতো মুড পরিবর্তন হয়ে যায়। আবেগ প্রবণ হয়ে খুব আক্রমনাত্মক বা সহিংস আচরন করা। বার বার আবেগ উঠানামা করে তাহলে সতর্ক হওয়া উচিত।

গুডবাই জানানো:

হুট করেই পুরনো বন্ধুদের সাথে দেখা করে বা ফোন করে বলে ভালো থেকে তোমরা, গুডবাই জানায়  অথবা পরিবারের সদস্যদের জড়িয়ে ধরে বিদায় চায়,  এসময় যদি কেঁদে ফেলে তাহলে ঝুকি বেড়ে যায়। সুইসাইডাল নোট লিখে রাখা বা পৃথিবীতে আর থাকবে না এরকম প্রস্তুতি নেয়া। সুইসাইটের জন্য উপকরণ সংগ্রহ করা (ঔষধ,  চাকু ইত্যাদি)। ইমোশনাল পেইন থেকে মুক্তির জন্য মৃত্যুর প্রস্তুতি নেয়া।

খুব উত্তেজিত থাকা:

কোন বিষয় নিয়ে খুব উত্তেজিত থাকা,  এসময় ব্যক্তি বলে- পৃথিবীটা খুব কঠিন জায়গা,  আমি কোনভাবেই আর এসব মেনে নিতে পারবো না। আমি আর কারো ওপর বোঝা হয়ে থাকতে চাই না। কেউ আমাকে বুঝতে পারছে না। আর এখানে আমার করার মতো কিছু নেই যা অন্য কারোর জন্য ভালো হবে,  আমি থাকা মানেই সবার ক্ষতি করে যাওয়া। আমি না থাকেলই তোমরা ভালো করবে বা ভালো থাকবে।

বেশি পরিমানে ড্রাগ ও অ্যালকোহল গ্রহণ:

মানসিক অসুস্থ ব্যক্তি বেশি পরিমানে ড্রাগস ও অ্যালকোহল গ্রহণ করলে আত্মহত্যার ঝুকি বেড়ে যায়।

খুব ওজন কমে ও বেড়ে যাওয়া:

কোন মানসিক সমস্যাগ্রস্থদের হঠাৎ করে খুব ওজন বেড়ে, কমে গেলে তার মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা তৈরী হয়।

আগে আত্মহত্যার চেষ্টা করলে

সম্প্রতি আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলো কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে,  এদের মধ্যে আবার আত্মহত্যার ঝুকি থেকে থাকে। এসময় খুব এসব ব্যক্তিদের নজরে রাখা উচিত।

উল্লেখ্য এসব নমুনা সাধারনত আত্মহত্যা প্রবণ ব্যক্তিকে চিহ্নিত করে কিন্তু ব্যক্তিভেদে এসব নমুনা প্রযোজ্য নাও হতে পারে।

 

কিভাবে কথা বলবেন আত্মহত্যা প্রবণ ব্যক্তির সাথে

 

কথা আ আচরন করার আগে জেনে নিন কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর। প্রথমেই জেনে নিন তিনটি প্রশ্নের উত্তর:

১. কিভাবে আত্মহত্যা করবে?

২. কখন করবে?

৩. আত্মহত্যার প্লান বাস্তবায়নের জন্য কি পদক্ষেপ নিয়েছে?

 

এরপর জেনে নিন আরো দুটি প্রশ্নের উত্তর

১. কোন ধরণের অ্যালকোহল ও ড্রাগস নিয়েছে কিনা?

২. এর আগে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে কিনা?

 

এরপরের ধাপ:

জিজ্ঞেস করুন তার সাথে আত্মহত্যার কোন উপকরণ আছে কিনা,  কৌশলে সেটা সরিয়ে ফেলুন।

যখন বুঝতে পারবেন,  আপনার সাথের ব্যক্তি আত্মহত্যাপ্রবণ,  ভাবছেন কিভাবে তার সাথে কথা বলবেন। নিচের প্রক্রিয়া প্রয়োগ করতে পারেন।

১. বলুন আপনি তার প্রতি খুব যত্নশীল,  আপনি তাকে সাহায্য করতে চান।

২. তার আবেগ অনুভূতির সাথে একাত্ম হউন,  খুব করে বুঝতে দিন তার অনুভূতি আপনাকেও নাড়িয়ে দিয়েছে।তার প্রতিটি কথা আপনি মনোযোগের সাথে শুনছেন।

৩. কোন একপর্যায়ে বলুন আত্মহত্যার চিন্তার একটি নিরাময়যোগ্য মানসিক সমস্যা, এখান থেকে অবশ্যই বের হয়ে আসা যায়। এক ধরনের আশার আলো দেখাতে হবে।

৪. এমনভাবে বুঝাতে হবে যে আত্মহত্যা চিন্তা একটি সাধারন চিন্তার মতো একটি,  তাই চিন্তা করলেই আত্মহত্যা করতে হবে এর কোন মানে নেই।

৫. কথা বলার সুযোগ দিতে হবে,  যাতে করে ব্যক্তি তার ইমোশন প্রকাশ করতে পারে,  হয়তো সে তার আত্মহত্যার যৌক্তিকতা তুলে ধরবে এবং এ কাজটার মাধ্যেমেই সে নিজেকে মুক্তি দিতে চায়। আর এই কথা বার্তাই তাকে আত্মহত্যা থেকে ফিরিয়ে নিয়ে আসবে এবং সমস্যার সমাধান খুঁজে পাবে। সমস্যা নিয়ে আলোচনা করবেন কিন্তু কখনই নিজে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করবেন না,  তা তার ওপর ছেড়ে দিন।

 

কিভাবে নিরাপত্তা দিবেন তাকে

১. একজন আত্মহত্যা প্রবণ ব্যক্তিকে একা থাকতে দেয়া যাবে না। এমন ব্যবস্থা করে রাখা তার সাথে সবসময় একজন থাকবে। সবসময় তাকে সহযোগিতার মুডে থাকতে হবে কখনই বুঝানো যাবে না তার কাজে আপনি বিরক্ত বা পরিবার অসুবিধায় পড়েছেন, এটা বুঝলে ব্যক্তি আবার অপরাধবোধে ভুগে আত্মহত্যা করে বসতে পারে। এসময় সরাসরি মানসিক চিকিসকের আওতায় নিয়ে আসা।

 

টিবিজেড/

 

 

 









Leave a reply