ট্রেনের টিকিট থাকে অবিক্রীত: চক্রে স্টেশন মাস্টার থেকে গার্ড সবাই

|

রেল স্টেশনে টিকিট কাউন্টারে গেলে প্রায়ই জানানো হয়, আসন খালি নেই অর্থাৎ টিকিট নেই। অথচ প্রায় প্রতিদিনই একেকটি আন্তঃনগর ট্রেনে ১৫ থেকে ৩৫ শতাংশ টিকিট অবিক্রীত থাকে।

লোকাল ট্রেনে অবিক্রীত থাকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত। আর ট্রেনের ভেতরের নিত্যদিনের চিত্র হচ্ছে- পা ফেলার জায়গা নেই। অথচ দিন দিন লোকসানের ঘানি টানছে রেল, যাত্রীরাও পাচ্ছে না কাঙ্ক্ষিত সেবা।

এ নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করেছে একটি গোয়েন্দা সংস্থা। প্রাথমিক পর্যায়ে বড় কয়েকটি স্টেশনে অনুসন্ধান চালিয়ে সংশ্লিষ্টরা দেখতে পেয়েছে শক্তিশালী চক্র টিকিট কালোবাজারিতে যুক্ত। অবিক্রীত আসনগুলোর তথ্য জানিয়ে দেয়া হয় সংশ্লিষ্ট ট্রেনে থাকা চক্রের সদস্যকে। সে আসনে লোক বসিয়ে টাকা আদায় করেন তারা। পরে ভাগ হয় চক্রের সদস্যদের মধ্যে। এ চক্রে স্টেশন ম্যানেজার থেকে শুরু করে ঝাড়ুদার, রেলপুলিশ ও ট্রেনের পরিচালক থেকে অ্যাটেনডেন্ট পর্যন্ত জড়িত।

সিলেট রেলওয়ে স্টেশনসংক্রান্ত গোয়েন্দা প্রতিবেদন সম্প্রতি জমা পড়েছে রেলপথ মন্ত্রণালয়ে। ১৩ পৃষ্ঠার ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২২২ জন রয়েছেন যারা টিকিট কালোবাজারিসহ বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে রেল কর্তৃপক্ষ। তারা বলছে, অন্য স্টেশনগুলোর প্রতিবেদন এলে পর্যায়ক্রমে সেখানেও ব্যবস্থা নেয়া হবে।

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- ঢাকার কমলাপুর, বিমানবন্দর, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, রংপুর, দিনাজপুর, জয়দেবপুর (গাজীপুর), ঈশ্বরদী (পাবনা), যশোরসহ ছোট-বড় ৩৫৪টি স্টেশনেই টিকিট কালোবাজারিসহ নানা ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতি রয়েছে।

সূত্রমতে, বর্তমানে ৩৫৮টি যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল করছে। এর ৯৬টি আন্তঃনগর। এসব ট্রেনে প্রতিদিন প্রায় ৭৫ হাজার টিকিট বরাদ্দ থাকে। বাকি ট্রেনের মধ্যে রয়েছে কমিউটার, লোকাল ও মেইল।

রেলওয়ে বাণিজ্যিক বিভাগের সূত্র বলছে, মাসের প্রায় ২৫ দিনই আন্তঃনগর ট্রেনের টিকিট ১৫ থেকে ৩৫ শতাংশ অবিক্রীত থাকে। আর লোকাল ও মেইল ট্রেনের ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ টিকিট প্রায়ই অবিক্রীত থেকে যায়। অথচ লোকাল ও মেইল ট্রেনে শুধু কোচের (বগির) ভেতর নয়, ভেতরে জায়গা না পেয়ে ছাদে পর্যন্ত লোকজন ওঠেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অবিক্রীত টিকিটের আসন সংখ্যা ও নম্বর স্টেশনকেন্দ্রিক গড়ে উঠা চক্রের (স্টেশন মাস্টার, স্টেশন ম্যানেজার, বুকিং মাস্টার, বুকিং সহকারী, জিআরপি, আরএনবি, হকার, দালালসহ বিভিন্নজন) সদস্যরা ট্রেনে থাকা টিটিই, গার্ড, জিআরপি সদস্য, আরএনবি সদস্য ও অ্যাটেনডেন্টদের কাছে জানিয়ে দেন। তারা ওইসব আসনে টিকিটের প্রকৃত দামের চেয়ে বেশি টাকা নিয়ে অবৈধভাবে ট্রেনে উঠা যাত্রীদের বসিয়ে দেন।

আর এসি চেয়ার ও কেবিনে দ্বিগুণ টাকা নিয়ে লোক বসান। লোকাল ট্রেনে টিকিট চেকার, গার্ড, ট্রেনচালক, সহকারী চালক, জিআরপি ও আরএনবি সদস্যরা যার যার মতো টাকা নেন। অভিযোগ রয়েছে, এসব ট্রেনে টিকিট কেটে উঠলেও সিট পেতে সংশ্লিষ্টদের টাকা দিতে হয়। যে কারণে যাত্রীদের বড় অংশ টিকিট না কেটেই ট্রেনে ওঠেন।

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিলেটে স্টেশনের জন্য প্রতিদিন ৪ হাজার ৪৪৫টি টিকিট বরাদ্দ। এর বিপরীতে ১০ থেকে ১২ হাজার যাত্রী যাতায়াত করেন। সিলেট-ঢাকা লাইনে প্রতিদিন ৪টি আন্তঃনগর, সিলেট-চট্টগ্রাম লাইনে ২টি আন্তঃনগর ট্রেন চলে।

এছাড়া এসব লাইনে আরও ৬টি মেইল ও লোকাল ট্রেন চলে। এসব ট্রেনের টিকিট বিক্রয়কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী কালোবাজারি চক্র। এর সঙ্গে সিলেট স্টেশন মাস্টার, স্টেশন ম্যানেজার, বুকিং সহকারী, জিআরপি, আরএনবি থেকে শুরু করে প্রায় সবাই সম্পৃক্ত।

এছাড়া সহকারী স্টেশন মাস্টার ৩ জন, ইয়ার্ড মাস্টার ১, গুডস অ্যাসিস্ট্যান্ট ১, শান্টিং পর্টার ১, টিএনটি ১, পয়েন্টম্যান ৯, গেটম্যান ৯, টিকিট কালেক্টর ৩, বুকিং সহকারী ১০, রেলওয়ে কুক ১, আয়া ২ ও সুইপার ৯ জন রয়েছেন। মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং সেকশনে রয়েছেন ৬৫ জন।

১ জন ইন্সপেক্টরের তত্ত্বাবধানে রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর ৩৪ জন রয়েছেন। রয়েছেন রেলওয়ে গোয়েন্দা শাখার ৪ জন কনস্টেবল ও জিআরপির ১ জন ইন্সপেক্টরসহ ৪০ জন সদস্য। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এদের বড় অংশই চক্রে ও দুর্নীতিতে যুক্ত।

সিলেট রেলওয়ে স্টেশন ম্যানেজার আতাউর রহমান, ভারপ্রাপ্ত ম্যানেজার আফসার উদ্দিনের নামও এসেছে টিকিট কালোবাজারি ও অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের তালিকায়।

তাদের সঙ্গে রয়েছেন- স্টেশনে থাকা এলাহি ফাস্টফুডে (বর্তমানে কথা ফাস্টফুড সেন্টার) কাজ করা কবির মুন্সি ও হকার নূরুল ইসলাম মোল্লা। এছাড়া সিএনএস অপারেটর জহিরুল ইসলাম, তার সহযোগী রোমান আহমদ, প্রধান বুকিং ক্লার্ক জহির আহমেদ, বুকিং ক্লার্ক রেজাউর রহমান রাজা, তার সহযোগী আলমগীর হোসেন, বুকিং ক্লার্ক মাসুদ সরকার, বাবুর্চি আবু তাহের, আরএনবির পোস্টিং হাবিলদার জানে আলম, বুকিং সহকারী খালেদ আহমেদ, বুকিং সহকারী সুজন, বুকিং সহকারী দুলাল, বুকিং সহকারী শান্তি দাশের নাম এসেছে।

টিকিট কালোবাজারি ও অনিয়ম-দুর্নীতির টাকার একটি অংশ সিলেট রেলওয়ে সংশ্লিষ্ট কতিপয় কর্মকর্তাও পান বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রেলওয়ে মহাপরিচালক শামছুজ্জামান বলেন, যারা টিকিট কালোবাজারি তথা টিকিট বিক্রি না করে আসন সংখ্যা বিক্রিতে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন রেলপথমন্ত্রী। আমরা সে মোতাবেক কাজ শুরু করেছি। দুর্নীতিবাজদের কঠোরভাবে দমন করা হবে।

রেলপথ সচিব মো. মোফাজ্জেল হোসেন বলেন, আমরা দিন-রাত চেষ্টা করছি রেলের অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধ করতে। কিন্তু কিছু অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারী অনিয়ম-দুর্নীতি করেই আসছে। বিশেষ করে টিকিট কালোবাজারির সঙ্গে সম্পৃক্তরা খুব ভয়ানক। গোয়েন্দা রিপোর্ট নিয়ে স্যারের (রেলপথমন্ত্রী) সঙ্গে কথা হয়েছে। রিপোর্ট অনুযায়ী সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দ্রুতই ব্যবস্থা নেয়া শুরু হবে। তিনি বলেন, শুধু সিলেট নয়, সব স্টেশনেই এমন অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে। কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না।

এ বিষয়ে রেলপথমন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজন জানান, মাঠপর্যায়ে গোয়েন্দারা অনুসন্ধান করছেন, দুর্নীতিবাজরা শনাক্ত হচ্ছে। সিলেট রেলওয়ে স্টেশনকেন্দ্রিক অনুসন্ধান রিপোর্ট আমরা পেয়েছি। নির্দেশনা দেয়া হয়েছে, প্রাথমিকভাবে সবাইকে বদলি করা হবে।

টিকিট বিক্রিতে নৈরাজ্য সহ্য করা হবে না জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ট্রেনে পা ফেলার জায়গা থাকে না, অথচ টিকিট অবিক্রীত থাকে! শোভন চেয়ার, এসি চেয়ার ও কেবিনের আসন পর্যন্ত অবিক্রীত থাকে, কিন্তু এসবে লোকজন ঠিকই বসে যাতায়াত করছেন।

চক্রটির সঙ্গে বাস মালিক ও বেসরকারি বিমান এজেন্টদের অদৃশ্য চুক্তি থাকতে পারে। তিনি বলেন, আমরা কঠোর হচ্ছি, অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি বলেন, ইতিমধ্যে দিনাজপুর স্টেশন মাস্টারসহ ৪ জনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

পরে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করাসহ আইনগত ব্যবস্থাও নেয়া হবে। টিকিট বিক্রয়ে অনিয়ম করায় সম্প্রতি দিনাজপুর রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার শংকর কুমার গাঙ্গুলী, ভারপ্রাপ্ত বুকিং সহকারী আবদুল আল মামুন, রেজওয়ার সিদ্দিক ও আবদুল কুদ্দুসকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

ওই স্টেশনে অনুসন্ধানের তিন দিনে ২৯০৮টি টিকিটের বিপরীতে ১ হাজার ৮২১টি টিকিট বিক্রি হয় এবং ১ হাজার ১০৫টি অবিক্রীত থাকে। অথচ কাউন্টারে নোটিশ ঝুলছিল ‘আসন খালি নেই’। তবে এখনও তারা স্টেশনেই দায়িত্ব পালন করছেন। রেল কর্তৃপক্ষ বলছে, লোকবল সংকটের কারণে তাদের দিয়ে আপাতত কাজ করানো হচ্ছে।
সূত্র: যুগান্তর


সম্পর্কিত আরও পড়ুন





Leave a reply