মহানন্দা নদীতে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন, হুমকির মুখে শতাধিক ভবন-বাড়িঘর

|

মনোয়ার হোসেন জুয়েল, চাঁপাইনবাবগঞ্জ:

পরিবেশের তোয়াক্কা না করে মহানন্দা নদীর বুকে ড্রেজার বসিয়ে অবাধে তোলা হচ্ছে বালু। কেটে নেয়া হচ্ছে নদী পাড়ের মাটি। চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকার রাজারামপুর ও নিমগাছীতে এভাবে বালু ও মাটি কাটা হচ্ছে গেল পাঁচ বছর ধরে। এতে মহানন্দা নদীর নাব্যসংকট বেড়েছে। নদীর তলদেশের মাটি সরে কয়েক কিলোমিটার এলাকা ভূমি ধ্বসের শঙ্কায় রয়েছেন এলাকাবাসী।

ভুক্তভোগীরা বলছেন, নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে বালু তোলার পর তা স্তুপ করে রাখা হচ্ছে ফসলি জমিতে। ফলে চাষের অনুপোযোগি হওয়ায় অনাবাদী রয়েছে কয়েকশ একর জমি।

এসব বালু পরিবহনে ট্রাক্টরের পাশপাশি বিশাল পাইপ লাইন বসানো হয়েছে সাধারণ মানুষের বসত বাড়ীঘরের পাশ দিয়ে। এতে বিঘিœত হচ্ছে সাধারণ মানুষের চলাচল আর প্রতিবাদ করলে দেয়া হচ্ছে হুমকি।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, জনপদঘেষা বালুমহাল ইজারা না দিতে বারবার আহ্বান জানানো হলেও তা মানছে না স্থানীয় প্রশাসন। এতে আরও বেপরোয়া বালুখেকোরা। অবাধে বালু তোলার কারণে নদী তীরের জনপদের অনেক ঘরবাড়ি আর ফসলী জমি ইতিমধ্যে বিলীন হয়েছে নদী গর্ভে। জেলা প্রশাসনের মদদে এমন অপকর্ম চললেও বিষয়টি জানা নেই বলে দাবি তাদের।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, নামোরাজারামপুর গুজরঘাট এলাকায় তিনটি পয়েন্টে ড্রেজার মেশিন বসিয়ে তোলা হচ্ছে বালু। এক্সকেভেটর মেশিন দিয়ে নদী পাড়ের বিস্তীর্ণ এলাকার মাটি কেটে ট্রাক্টরে বোঝাই করে নেয়া হচ্ছে বিক্রির জন্য।

এসময় কথা হয় ট্রাক্টর চাল সাইফুল ইসলামের সাথে তিনি জানান, প্রতিগাড়ি ৩’শ টাকা হিসেবে কিনে নিচ্ছি। আর ৪’শ টাকা দিতে হয় ইজারাদারের ম্যানেজার সোনা মিয়াকে, সব মিলিয়ে এক গাড়ির দাম পড়ে সাত’শ টাকা। তিনি জানান, ক্রেতার চাহিদার জন্য মাটি কেটে নিয়ে যাচ্ছি।

এক্সকেভেটর চালক নাজমুল হোদা জানান, ইজারাদার নির্দেশে আমরা মাটি ও বালু কাটছি। তিনি দাবি করেন, মাটি কাটা ভুল হচ্ছে তবে সরকার ইজারা দিয়েছে বলেই আমরা মাটি কাটছি, সরকার ইজারা না দিলে আমরা কাটতাম না।

স্থানীয় বাসিন্দা কৃষক জাহাঙ্গীর আলাম জানান, ইজারার নাম করে বালু মাটি সব কেটে নিয়ে যাচ্ছে। আমাদের গ্রামটা নদীর কাছে তাই গ্রামটি যাতে নদীতে নেমে না যায় সেজন্য তাদের নিষেধ করেছিলাম কিন্তু নিষেধ শুনেনা, জোর করে মাটি আর বালু কেটে নিয়ে চলে যাচ্ছে। সুফিয়া বেগম ও নাজিরা বেগম জানান, পাঁচ বছর ধরে মাটি আর বালু কাটছে। কত অনুনয়-বিনয় করেছি কিন্তু কেউ আমাদের কথা শুনেনা। এখন নদী ভাঙ্গনে আমাদের ঘরবাড়ি নদীতে নেমে যায় তাহলে আমাদের গাছের নিচে আশ্রয় নিতে হবে। আমাদের আর কোন জমি নাই যে অন্য কোথাও আশ্রয় নেব।

আব্দুস সাত্তার ও এরফান আলীসহ কয়েকজন জানান, বিশাল বিশাল পাইপ লাইন আমাদের বাড়ির পাশ দিয়ে জোর করে বসিয়েছে। এজন্য আমাদের চলাচলের রাস্তা বন্ধ হয়ে গেছে। বাঁধা দেয়ার কারনে আমাদের হুমকি দিচ্ছে।

তারা জানান, এলাকার কেউ জমিতে ফসল করতে পারছেনা। বালুর আস্তরণ পড়ে যাওয়ায় জমিতে চাষাবাদ করা যাচ্ছেনা। বালু তোলা আর মাটি কাটার ফলে মাটি দেবে যাচ্ছে, যে কোন সময় আমাদের ঘরবাড়ি নদীতে নেমে যেতে পারে। শহরের যেতে হলে ওদের এলাকার উপর দিয়ে আমাদের যেতে হয়। ওদের বাঁধা দিলে আমাদের হুমকি দিচ্ছে, রাস্তায় পেলে আমাদের মারধর করবে। প্রশাসনকে জানিয়ে কোন লাভ নেই। প্রভাবশালী টাকা-পয়সাওয়ালাদের হয়ে প্রশাসন ওদের কথা মতো চলছে।

রাজারামপুর বালু মহালটি ইজারা দেয়া হয় নূর আলম নামে এক ব্যক্তিকে। কিন্তু তিনি মারা যাওয়ার পর জেলা প্রশাসন চুক্তি নবায়ন করে তার স্ত্রী জান্নাতুন ফেরদৌসের নামে। আর নিমগাছী বালুমহলটি অনুমোদন দেয়া হয়েছে মনির হোসেন বকুলকে। নিয়ম না মেনে বালু তোলার কথা স্বীকার করে ইজরাদার মনির হোসেন বকুল জানান, নিময় অনুযায়ী প্রতিবছর ইজারা দেয়ার আগে জরিপ করার কথা। ইজারাকৃত স্থানে বালুর পরিমান সঠিক রয়েছে কিনা? এতে পরিবেশের কোন ক্ষতি হবে কি না তা যাচাই করা হয়। কিন্ত বিগত ৪-৫ বছর থেকে কোন প্রকার জরিপ ছাড়াই জেলা প্রশাসন থেকে ইজারা দেয়া হচ্ছে। এক জায়গাতের দীর্ঘদিন বালু উত্তোলনের ক্ষেত্রে হয়তো ক্ষতি হতে পারে। তাহলে বালু উত্তোলন করছেন কেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, যেহেতু জেলা প্রশাসন আমাদের নিদৃষ্ট স্থানে বালু উত্তোলনের জন্য নির্ধারণ করে দিয়েছে তাই আমরা সেখানে বালু উত্তোলন করছি।

সদর উপজেলা ভূমি কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন জানান, বিষয়টি আমি শুনেছি, কিছু দিন আগেও আমি ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে অভিযানও পরিচালনা করেছি। আপনার কাছে শুনলাম আমি ডিসি মহোয়দের সাথে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মাশরুবা ফেরদৌস যুগান্তরকে জানান, বিষয়টি আমাদের জানা ছিলনা, ঘটনাটি তুলে ধরার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আমরা ক্যালেন্ডার ভূক্ত বালুমহল গুলোকে বিশেষ শর্ত সাপেক্ষে অনুমোদন দিয়ে থাকি। কিছু কিছু ইজারাদার শর্ত লঙ্ঘন করছে। আমরা এখন থেকে সরেজমিনে পরিদর্শণ এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের পরামর্শ অনুযায়ী ইজারা দিব। যাতে পরিবেশের কোন ক্ষতি বা কোন এলাকা নদী ভাঙ্গনের শিকার না হয়। এখন আমরা বালু মহলগুলো নতুন করে রি-সিডিউল করব। আর যেগুলো পরিবেশের ক্ষতি করছে সেগুলা আর ইজারা দেয়া হবেনা।


সম্পর্কিত আরও পড়ুন





Leave a reply